প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভুয়া কাজির ছড়াছড়ি, প্রতিরোধ করার জুরুরি

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় থাকেন তৈরি পোশাক কর্মী আশিক মাহমুদ। ২০১৬ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন সহকর্মী রহমানিয়াকে। এই দম্পতির ঘরে এসেছে একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। আশিক মাহমুদের বক্তব্য কাবিননামা চাইতে গেলে কাজি জানান, ‘ভালোবাসার বিয়ে, কাবিননামা লাগবে না।’

আজিমপুরের শিউলি ও সাগর গোপনে বিয়ে করেছেন। কাজি (নিকাহ রেজিস্ট্রার) পরিচয়দানকারী মাওলানা হেদায়েতউল্লাহ ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিয়ে পড়িয়েছিলেন। বিয়ের সময় কাজি বলেছিলেন, একমাস পর কাবিননামা দেয়া হবে। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে কাজি অফিস ছিলো। এরপর আর সেই কাজিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিভাবকরা বিয়ের কাগজপত্র চাইলে দেখাতে পারেননি তারা।

এভাবেই রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে ভুয়া সাইন বোর্ড লাগিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ কাজিরা। তাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা ভুয়া নিকাহনামার ফরম দেখিয়ে নবদম্পতিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। অবৈধ কাজিদের প্রতিরোধ করতে সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। সমকাল

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেক ভাসমান কাজি। যাদের আইনগত বিয়ে পড়ানোর কোনো এখতিয়ার নেই। কাজি হিসেবে নিয়োগ পেতে যেসব যোগ্যতা বা আইনের বিধিবিধান রয়েছে তার কোনোটাই তাদের নেই। ঢাকা জজকোর্ট এলাকায় ভুয়া কাজির সংখ্যা বেশি। কিছু অসাধু আইনজীবী ভুয়া কাজির মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ ওই ভুয়া কাজিদের গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ৭ হাজার ৭২৬ জন কাজি রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় রয়েছেন ২৩১ জন। শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশনে এলাকায় রয়েছেন ১২৯ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকার বাইরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে সব কাজি রয়েছেন তারা অবৈধ। এ সংখ্যা প্রায় তিনশ’। তাদের কোনো নিবন্ধনপত্র নেই। রাজধানীতে কয়েকটি এলাকা বড় হওয়ায় সেখানে একের অধিক কাজি রয়েছেন। ঢাকা জজকোর্ট, রামপুরা, বসুন্ধরা, মগবাজার, মালিবাগ, মহাখালী, উত্তরা, ফার্মগেট, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছেন অগণিত ভাসমান কাজি। তাদের কোনো বৈধ সনদ বা ঠিকানা নেই।

জানা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশে ভুয়া কাজিদের প্রতিপালন করছেন ঢাকার তিন প্রভাবশালী কাজি। তারা হলেন- ঢাকা উত্তর ১১নং ওয়ার্ডের কাজি আব্দুল হাই, ঢাকা দক্ষিণের ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি আবদুস সালাম এবং ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি শফিউল্লাহ। তারা ভুয়া কাজিদের পক্ষে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করে মন্ত্রণালয় থেকে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারদের কাজে বিঘ্ন ঘটান এবং তাদের বিভিন্নভাবে মামলা-মোকদ্দমা করে দূরে সরিয়ে রেখে অসৎভাবে ভুয়া কাজি নিয়োগের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫১, ৫৩ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫ ও ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভুয়া কাজি রয়েছেন। তাদের মধ্যে এইচএ গোলাম কাদের, হেদায়েতুল আলম মুসা, আব্দুল কুদ্দুস ভুইয়া, মোশাররফ হোসাইন, মাইনুল ইসলাম, ছাইফুল মাওলা, আব্দুল মোত্তালিব, মোকাম্মেল হক, মিজানুর রহমান, সানাউল হক, মাহবুবুর রহমান খান, মাশুকুর রহমান, মফিজুর রহমান ও নুর আলমের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তাদের অধিকাংশই

২০১৩ সাল থেকে অবৈধভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় তাদের বেআইনি ঘোষণা করলে সবাই উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন ও পরাজিত হন। তবে পরবর্তী সময়ে চেম্বার আদালতে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করা হয়। বর্তমানে আপিল বিভাগে এসব মামলা বিচারাধীন। আইন সচিব স্বাক্ষরিত ফাইলে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় তাদের কোনো নিয়োগ দেয়নি। গত ৪ এপ্রিল আইন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের বোরহান উদ্দিন লিটন, গাইবান্ধা পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের কাজি মোহাম্মদ আলীর সহকারী এজাহান আলী খান মিঠু, সিরাজগঞ্জের রেজাউল করিম খান, কেরানীগঞ্জ উপজেলার রাজেন্দ্রপুরের কাজি নাজিমদ্দীন, কক্সবাজার শহরের রহিমুল্লাহসহ অনেক কাজির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জমা রয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভুয়া কাজিরা খুবই শক্তিশালী। তারা একটি সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করে। তাদের বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ, ভুয়া বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রিসহ বেআইনিভাবে বিয়ে পড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এর আগেই আদালতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে রিট মামলা দায়ের করেন। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। কর্মকর্তারা জানান, ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকার অনেক কাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত