প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ঠাকুরগাঁওয়ে ৩শ’ টাকা ধানের মণ, তবুও ক্রেতা নেই!

সাদ্দাম হো‌সেন, ঠাকুরগাঁও : এ বছর ঠাকুরগাঁওয়ে বোরো ধানের ন্যাযমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় দিন পার করছেন কৃষক। ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা আসল টাকাও তুলতে পারছেন না এমন অভিযোগ তাদের। ঈদ ঘনিয়ে আসলেও সেই আনন্দ নেই কৃষক পরিবারের । বাজারে ধানের চাহিদা না থাকায় কাঁচা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। ধান চাষ করে খরচ না ওঠায় নীরবে কাঁদছেন কৃষক। কেউ কেউ বলছেন এমন জানলে ধান চাষ করতাম না। কারণ ৮ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২ হাজার ৩৬০ হেক্টর। আর অর্জিত হয়েছে ৬২ হাজার ৩৫০ হেক্টর। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, উৎপাদন গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর প্রতি হেক্টরে চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩ দশমিক ৮ টন আর এবার বৃদ্ধি পেয়ে ৪ টন হচ্ছে।

তবে আশানুরূপ ফলন হলেও ধান উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সব উপাদানের দাম বেশি থাকায় লোকশানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। আমন মৌসুমের ধান ব্যবসায়ীদের ঘরে জমে থাকায় ধান ক্রয়ে তেমন আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের। তাই বাজারে ধানের চাহিদা না থাকায় দাম কমেছে ধানের। এ অবস্থায় ক্ষতির মুখে কৃষক।

জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের ১ হাজার ৬শ’ ৯০টি হাসকিং মিল ও ১৭টি অটোরাইস মিলের মাধ্যমে ৩০ হাজার ৬শ’ ১৯ টন চাল ও ১ হাজার ৮ শ’ ৫৭ টন ধান ক্রয় করবে সরকার, যা উৎপাদনের তুলনায় সামান্য।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন এর জন্য তিনি সাবেক খাদ্য মন্ত্রী অ্যাড. কামরুল ইসলামকে দায়ী করেছেন । আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতা সাংবাদিকদের বলেন, থাইল্যান্ড, ভারতসহ বিভিন্নদেশ থেকে প্রচুর পরিমান চাল আমদানী করায় সরকারও বেকায়দায় পড়েছেন। সরকারের সদিচ্ছা আছে কিন্তু জায়গার অভাবে ধান-চাল কেনা সম্ভব হচেছ না।

তবে কৃষক নেতা মাহাবুব আলম রুবেল অভিযোগ করে বলেন, সরকার মিলারদের স্বার্থ গুরুত্ব দিচেছ। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে হাওড় অঞ্চলে অকাল বন্যা ও উত্তরাঞ্চলে ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়ায় ধানের আবাদ যায়। এই অজুহাতে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেট করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে। চুক্তিবদ্ধ মিল মালিকরা সরকারকে চাল দেয়নি ওই বছর। অথচ এই মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচেছ না।

সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কশাল বাড়ি গ্রামের লুৎফর রহমান বলেন, বর্তমানে জেলার হাট-বাজারগুলোতে প্রতি মণ ধান ৩০০-৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৬০০-৬৫০ টাকা। এভাবে ধানের দাম প্রতিবার কম পাওয়ায় আমরা লোকসানে পড়ি। বর্তমানে ৮ টাকা কেজি দরে ৩ হাজার ২শ টাকা ধানের মণ বিক্রি করতে হয় আমাদের। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আর ধান চাষ করব না।বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বেউরঝাড়ী গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন সামনে ঈদ। কেনাকাটার জন্য লাহিড়ী হাটে ধান বিক্রি করতে নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করতে পারিনি। একই দুখের কথা জানালেন পাশের গ্রামের আব্দুল মান্নান ।

ঠাকুরগাঁও জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান রাজু বলেন, বিদেশ থেকে চাল আমদানি না করে প্রকৃত মিলারদের নির্বাচিত করলে বাজারে প্রতিযোগীতা বাড়বে । এতে কৃষক তার ধানের ন্যায্য দাম পাবেন। তিনি বলেন ভিজিডি, জিআর, কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র ও দু:স্থদের জন্য বরাদ্দ কৃত চাল কিনে ডিও ব্যবসায়ীরা সর্টার করে এলএসডিতে দিচেছ। এই অনিয়ম বন্ধ করা উচিৎ। তা হলে কিছুটা হলেও কৃষকের দু:খ লাঘব হবে।

তিনি আরও বলেন, বিগত দিনের চেয়ে এ বছর ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আমন মৌসুমের ধান এখনো মিলারদের কাছে মজুত থাকায় ধান কেনার আগ্রহ নেই মিলারদের। মিলাররা যে পরিমাণ বরাদ্দ পেয়েছে তাতে গত মৌসুমের ধান শেষ হবে না। তবে সরকার যদি আরও বরাদ্দ দেয় তাহলে ধানের দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফতাব হোসেন বলেন, ধান উৎপাদনের জন্য কৃষি উপাদন সময় মতো পাওয়ায় ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে চাষিদের ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমান বাজারে ধানের যে দাম তাতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে পরে লাভবান হতে পারে কৃষকরা।

এছাড়া সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ধান চাষীদের তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ে ধান-চাল কেনা শুরু হবে। ব্যবসায়ীরা ধান কেনা শুরু করলে বাজার স্থিতিশীল হতে পারে বলেও জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই উপ-পরিচালক।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. বাবুল হোসেন ঠাকুরগাঁওয়ে ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে চাল সংগহ শুরু করা হবে। তবে বৈরী আবহাওয়া এ কর্মসূচিকে বাধা গ্রস্থ করছে ।

ধানের মণ ৩শ টাকা হওয়ার প্রতিবাদ ও কৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে কৃষক সংগঠনগুলো কর্মসূচি পালন করছে।

ঠাকুরগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ করে ধান ছিটিয়ে বিক্ষোভ করেছে কৃষক ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ। শনিবার (২৫ মে) দুপুর ১২টার দিকে ঠাকুরগাঁও-ঢাকা মহাসড়কের খোঁচাবাড়ি এলাকায় ধান ছিটিয়ে এ বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। এ সময় ঠাকুরগাঁও-ঢাকা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

আন্দোলনকারীরা বলেন, ধানের বিক্রয় মূল্য উৎপাদন খরচের থেকে কম হওয়ায় কৃষকরা মারাত্মক সঙ্কট ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গায় কৃষক নিজের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। আজ কৃষক পথে নেমেছেন। তাই সরকারকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করে কৃষককে বাঁচাতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত