অ্যাডভোকেট মো. রিয়াজুল হক
একটি মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বিচারককে ওই মামলা চলাকালীন আদালতে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণাদির ওপর নির্ভর করতে হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণাদি ছাড়া কোনো মামলাই নিষ্পত্তি করা হয় না। তথ্যপ্রমাণ আইনের প্রধান নিয়মই হলো জনরবভিত্তিক সাক্ষ্য প্রমাণ প্রহণযোগ্য নয়। এভিডেন্স আ্যাক্ট-১৮৭২ এর ৬০ নম্বর অনুযায়ী, মৌখিক প্রমাণ সরাসরি হতে হবে। সরাসরি প্রমাণ যেখানে প্রত্যাখ্যান করা হয়, সেটাকেই জনশ্রুতি বলা হয়ে থাকে। তবে এই আইনের ৩২ (১) ধারা জনশ্রুতি নিয়মের ব্যতিক্রম। এই ধারায় বলা হয়েছে, আদালতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মৃত্যু শয্যায় দেয়া জবানবন্দিটি জনশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত হবে। মৃত্যু শয্যায় দেয়া বিবৃতি হচ্ছে সেই কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর অব্যবহিত আগে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে বর্ণনা করালিখিত বা মৌখিক বিবৃতি।
নুসরাত জানাহ রাফি মারা গেলো; ধরে নেয়া যায় যে, তার মৃত্যু শয্যায় দেয়া বিবৃতিটি সত্য। তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর ১০৮ ঘণ্টা তিনি জীবিত ছিলেন। এই সময়টা, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে ১০ এপ্রিল রাত ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তার মৃত্যু শয্যাকালীন এভিডেন্স অ্যাক্টের ৩২ (১) ধারাতেও এই কথাটি বলা হয়েছে। যখন সে মৃত্যুর প্রহর গুনছে, তখন সে যে বিবৃতি দেবে সেটি আদালত গ্রহণ করবে।
এই ক্ষেত্রে নির্যাতিত নুসরাত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে বিচার ও বৈধ পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছিলো। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। উল্টা নুসরাত জাহান থানাতেই পুলিশের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছে। অথচ পুলিশের তাকে রক্ষা করার কথা। তারপরও সে থেমে থাকেনি বরং মামলা দায়ের করেছে। কিন্তু তার অভিযোগ আদালত গ্রহণ করেনি।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, দাখিল পরীক্ষার আগে সাহাদাত হোসাইন শামীম তার চোখে চুন নিক্ষেপ করেছিলো। তখন ধর্ষণ প্রচেষ্টার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো এবং পরে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে। সে এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি এবং অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের মূল হোতা। চুন নিক্ষেপের পর, লোকজন তাকে এক নির্যাতিতা মেয়ে হিসেবে চিহ্নিত করে কিন্তু অপরাধীকে কেউ চেনে না। কারণ কিছু স্থানীয় গণমাধ্যম তার নাম, বাবা-মার নাম, বাসার ঠিকানাসহ সবকিছু প্রকাশ করেছিলো। তারা জানিয়েছিলো, মেয়েটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে কিন্তু আসামি শাহাদত হোসাইন শামীমের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা যাবে না। তখন থেকেই আসলে সে ন্যায়বিচার চেয়ে আসছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আলিম পরীক্ষায় বসেছিলো তিনি আর তখন থেকেই তিনি জানতেন যে, তার প্রাণহানি হতে পারে। তাই নুসরাত যখন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন এই বিষয়কেও মৃত ঘোষণার ৩২ (১) ধারার আওতায় নেয়া উচিত।
মৃত্যু শয্যায় দেয়া বিবৃতিকে আদালতে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নিয়ম রয়েছে। এটিকে মৌখিক ও লিখিত হতে হবে, যাতে লোকজন তা শুনতে পায়। এমন বিবৃতি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন এটি সবাই শুনতে পারবে, বুঝতে পারবে এবং আদালতে উপস্থাপন করতে পারবে। ঘোষণাকারীর মৃত্যুর আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক, তিনি এই বিবৃতি দিতে পারবেন। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইন ও মানবাধিকার বিভাগের সহকারী শিক্ষক। মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত