প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাইকিয়াট্রিস্টের জার্নাল : নুসরাত,আ্যাসাঞ্জ ও কৃষ্ণ গহ্বর

ডা. মো.তাজুল ইসলাম : ‘অবিচার দেখে ও তার প্রতিবাদ না করতে করতে, আমরা নিজেদের চেতনাকে সেই অবিচারের প্রতি অসার হয়ে উঠার প্রশিক্ষণ দেই এবং ধীরে ধীরে নিজেদের ও আপনজনদের রক্ষা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।’ জনগণের গোয়েন্দা, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান আ্যাসাঞ্জের এই উক্তি, আমাদের সমাজের জন্য পুরোপুরি সত্য। প্রতিদিন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক নানা রকমের অন্যায়, অবিচার হতে আমরা দেখি। আমরা কতোজন সেগুলোর প্রতিবাদ করি? রাস্তা-ঘাটে, বাস-ট্রেনে শত শত অবিচার ঘটে যায়।

আমরা ‘ভদ্রলোকরা’ মান-সম্মানের ভয়ে বা ‘কী হবে প্রতিবাদ করে’ মনে করে বা ‘এটি দেখার দায়িত্ব আমার নয়’ মনে করে চোখ বুজে সেগুলো উপেক্ষা করে যাই। এভাবে অন্যায়-অবিচারের প্রতি আমাদের চেতনাবোধ অসার হয়ে পড়েছে। এসব এখন গা-সয়া হয়ে গেছে। এজন্য অপশক্তি আরও বেপরোয়াভাবে, প্রকাশ্যে নিজেদের অপকর্ম করার উৎসাহ পাচ্ছে। আমাদের সমাজ আপসকামিতা, তোষামোদি, সমঝোতা, অন্ধ আনুগত্য, সুবিধাবাদিতাকে গ্রহণযোগ্য, উচ্চ ‘সামাজিক গুণ’ মনে করে পুরস্কৃত করে। শুধু তাই নয় একে ‘বুদ্ধিমানের কৌশল’ বলে অন্যদের এ রকম হতে উৎসাহিত করে। আর যারা এ রকম বিরূপ পরিস্থিতিতেও সাহস করে প্রতিবাদ করে, তাদের গোঁয়ার, নির্বোধ, বেখাপ্পা, অসামাজিক ইত্যাদি ভাষায় অভিহিত করে। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। নুসরাত সে ব্যতিক্রম।

সে ও তার পরিবার আপস করলে, তথাকথিত সমঝোতা করলে বা কৌশলী হয়ে অনুগত থাকলে তাকে এভাবে পুড়ে মরতে হতো না। বরং হুজুরের বদান্যতায় প্রশ্নপত্র পেয়ে ভালো রেজাল্ট করতো, ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উপহার পেতো। নুসরাত ও অ্যাসাঞ্জের মধ্যে মিলটি হচ্ছে তারা ব্যক্তি হিসেবে নগণ্য, ক্ষুদ্র হলেও প্রতিবাদ করেছে শক্তিমানদের বিরুদ্ধে। এ রকম করতে গিয়ে তারা নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থের কথা একবারও ভাবেনি। চেতনায় অসার সমাজে নুসরাত বাংলাদেশের মালালা, আরেক বিপ্লবী প্রীতিলতা। আমাদের দেশ এককেন্দ্রিক শাসিত। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এমনকি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে আমরা একেকটি ‘মোঘল সা¤্রাজ্য’ তৈরি করে রেখেছি। এখানে একেকটি গোষ্ঠী স্থানীয় সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। স্থানীয় রাজনীবিদ, সমাজ-নেতা, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য শক্তি মিলে একটি নিজস্ব ‘বলয়’ তৈরি করে রাখে।

এই ক্ষমতা বলয়ের চারপাশে ঘিরে থাকে, একদল সুবিধাভোগী মাস্তান চক্র। নুর উদ্দীন, শামিমরা হচ্ছে সেই লাঠিয়াল বাহিনী। অন্যদিকে বাকি সব আমজনতা ‘ভয়ে বা লোভে’ এই বলয়ের অন্ধ আনুগত্য করে, তোষামোদি বা চামচামি করে থাকে। যেসব শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী অধ্যক্ষ রক্ষায় মিছিল ও আন্দোলন করেছে, এরা হচ্ছে সেই তোষামোদকারী, অন্ধ অনুগত বাহিনী। এই চিত্র শুধু সোনাগাজীর নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র। ভালো মানুষ, সৎ, মানবিক, মেধাবী মানুষদের এখন কোনো সামাজিক কদর, সম্মান নেই।

বিভিন্ন স্তরে বিরাজমান সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়, ওই রকম গোষ্ঠীগত অপশক্তি দ্বারা। সেখানে মেধাবী, মানবিক মানুষেরা থাকে অপাঙক্তেয় হয়ে। তাদের কোণঠাসা করে, হেয়, নিচ করে রাখা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করবে দূরে থাক, তাদের করুণা করে, তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে। প্রতিটি হত্যা, ধর্ষণের আলাদা আলাদা কার্যকারণ থাকে। তবে এদের মধ্যে কমন কিছু ফ্যাক্টরও থাকে। নুসরাতকে যৌন হেনস্তা করা ও পরবর্তীতে প্রতিশোধ হিসেবে আগুনে পুড়িয়ে মারার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রথমত. পূর্বে বর্ণিত সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, পুলিশি ছত্রছায়ায় যে শক্তির নেক্সাস তৈরি হয়ে রয়েছে সে ক্ষমতা বলয়ের কারো অপকর্ম, অনাচারকে অবনত মস্তকে মেনে না নিয়ে তাকে-তাদের চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিবাদ করার অনিবার্য খেসারত হচ্ছে এ রকম পরিণতি।

ওই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আপস না করে ‘সম্মানিত হুজুরকে’ কারাগারে নেয়াকে ওই অধ্যক্ষের অন্ধ অনুগত দাসগুলো ‘অমার্জনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছে। তারা আরও মনে করেছে এর মাধ্যমে সমগ্র আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে। তাই নুসরাতকে সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে। অন্যদিকে ওই মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী, যাদের রয়েছে ক্ষমতাবান হুজুরের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও দায়, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ‘পরম শ্রদ্ধেয়’ হুজুরের অসম্মানে ও তাদের গর্বের, গৌরবের প্রতিষ্ঠানের (মাদ্রাসার) ‘ভাবমূর্তি ’ ক্ষুণœ হওয়ার কারণে। এই ব্যক্তি পূজা ও প্রতিষ্ঠান পূজার উদাহরণ কিন্তু সর্বত্র। সম্প্রতি কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের চাপে ও মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার কারণে ভার্সিটির কর্তৃপক্ষ তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে কর্তৃপক্ষ এবং তাদের কিছু সহকর্মী তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ‘ভাবমূর্তি’ রক্ষায় নানা রকমের ছলচাতুরী, বাহানার আশ্রয়ও নিয়ে থাকে। তাদের কাছেও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এ রকম অপকর্মই যে ভাবমূর্তি হারানোর মূল কারণ এবং এর যথাযথ শাস্তি প্রদানই যে, সে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ, এই উচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলোও সেটি ভুলে যায়।

দ্বিতীয়ত. শামীম নামক ছেলেটি নুসরাতকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। অথচ সে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী। নুরউদ্দীন, শামীমরা হচ্ছে ওই অধ্যক্ষের লাঠিয়াল বাহিনী। এর আগেও প্রত্যাখ্যানের জন্য নুসরাতকে অপদস্ত করা হয়েছিলো। তাকে চুনকালি মেখে আহত করে। এতে তাকে হাসপাতালে পর্যন্তও ভর্তি হতে হয়। ওইসব অপরাধ করে ও তারা ওই খুঁটির জোরে পার পেয়ে যায়। অপরাধের শাস্তি না হওয়াতে এরা আরও ঔদ্ধত্য, বেপরোয়া হয়ে উঠে। শামীম এবার তার প্রেম প্রত্যাখ্যানের শোধ নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। গোপন মিটিংয়ে নুসরাতকে কীভাবে মারবে তার পথ বাতলাতে শামীমই প্রস্তাব করে, আগুনে পুড়িয়ে মারার কথা। জিঘাংসা কতো নির্মম, কুৎসিত হলে মানুষ এতো জঘন্য প্রস্তাব করতে পারে?

তৃতীয়ত. ওই হুজুরের বিরুদ্ধে আগেও এ রকম অনেক অনৈতিক, অপরাধের অভিযোগ ছিলো। যারা প্রতিবাদ করেছে বরং তাদের সে শোকজ নোটিশ পাঠায়। স্থানীয় পর্ষদ, পুলিশ কেউ ওইসব অপরাধের বিচারে ভূমিকা নেয়নি। এভাবে বিচারহীনতার কারণে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। হুজুরও নিজেকে সবকিছুর ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করেছে। তা না হলে সে এতো ঔদ্ধত্য হয়ে নুরউদ্দীনকে বলতো না তোরা আমার জন্য কী করলি?। এর মাধ্যমে সে তার মাস্তান বাহিনীকে অ্যাকশনে যেতে ইঙ্গিত দেয়। এর পরিণতি কী হবে তা ভাবেনি। বরং ভেবেছে আগের মতোই সব ম্যানেজ করে ফেলবে।

৪র্থ বিষয়টি হচ্ছে সব অপরাধের মূল কারণ। মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

১. ব্যক্তিত্বের আদিম স্তর ‘ইদ’কে (রফ) নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে। সকল লোভ, লালসা, কামনা, বাসনা তাৎক্ষণিক ও যেকোনো উপায়ে চরিতার্থ করতে চায় ইদ। ইদের চাহিদা যাদের বেশি, তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সহজে। ছোটকালে পরিবার থেকে সুশিক্ষা পেলে ইদের লাগামহীন চাহিদার মাত্রা কম থাকে। কিন্তু ক’টি পরিবারে সে সংযম, ধৈর্য শিক্ষার পরিবেশ রয়েছে ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তি মেটানোর দাবিকে অগ্রাহ্য করার শিক্ষা দেয়া হয়? ২. ইগো-যদি দুর্বল হয় তাহলেও মানুষ অপরাধপ্রবণ হবে।

ইগোর কাজ হচ্ছে ইদের অনৈতিক চাহিদাকে বাস্তবসম্মত করা বা নিয়ন্ত্রণে রাখা। ইগো দুর্বল হলে তাই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। ইগো নিয়ন্ত্রণে থাকে আইনের ভয়ে, সমাজের ভয়ে বা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে। কিন্তু আইনের শাসন, সুবিচার কিংবা সামাজিক ন্যায্যতা কী আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি?।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত