প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চাঁদের উদ্দেশ্যে ইসরাইলের মহাকাশযান

ভজন সরকার : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে চাঁদে অবতরণের জন্য ইসরাইলের একটি মহাকাশযান (ল্যান্ডার) উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এই উৎক্ষেপণটি অনেকগুলো কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, যদি এই মহাকাশযানটি বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা মতো আগামী এপ্রিলের ১১ তারিখে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করতে পারে, তবে ইসরাইল হবে চতুর্থ রাষ্ট্র যাদের মহাকাশযান চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করলো। এর আগে আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের মহাকাশযান অবতরণ করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি চীনের একটি মহাকাশযান চাঁদের অন্ধকারপৃষ্ঠে ( পৃথিবী থেকে দেখা যায় না এমন পৃষ্ঠে) সফলভাবে অবতরণ করেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রথমবার সম্পূর্ণ বেসরকারি খরচে ( প্রায় একশো মিলিয়ন আমেরিকান ডলার) এ মহাকাশযানটি প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগের সমস্ত অভিযানে প্রেরণকারী দেশসমূহ রাষ্ট্রীয়ভাবে খরচ বহন করেছে। এবার ইসরাইলের দু’টো সংস্থা ( স্পেসিল ও ইসরাইল এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ) প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে মহাকাশযানটি প্রেরণ করেছে। তৃতীয়ত, এবার মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের সময় আরও দু’টো স্যাটেলাইটস একইসাথে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। প্রযুক্তি -ধনকুবের ইলোন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেট (যা বাংলাদেশে স্যাটেলাই বঙ্গবন্ধু-১ ও উৎক্ষেপণ করেছিলো) প্রথম একইসাথে তিনটি এ রকম মহাকাশযান (ইসরাইলের ল্যান্ডার, ইন্দোনেশিয়ার একটি যোগাযোগ স্যাটেলাইট ও আমেরিকার বিমানবাহিনীর একটি স্যাটেলাইট) আকাশে উৎক্ষেপণ করলো।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইসরাইলের মহাকাশযান বা ল্যান্ডারটি এ পর্যন্ত চাঁদে অবতরণের জন্য পাঠানো সমস্ত মহাকাশযানের মধ্যে ক্ষুদ্রতম, যা একটি ডিসওয়াশারের সমান আয়তন ও ওজনের। একইসাথে অনেকগুলো মহাকাশযান উৎক্ষেপণের বিষয়টি ‘শেয়াররাইডিং’ বা একই যানবাহনে একাধিক যাত্রী পরিবহন করে যার যার নির্দিষ্ট গন্তব্যে নামিয়ে দেয়ার মতোই। এতে উৎক্ষেপণের খরচ যেমন কমে যায়, তেমনি বেড়ে যায় মহাকাশ অভিযানের সম্ভাবনাও।
ইসরাইল তাদের মহাকাশযানের নাম দিয়েছে ‘বেরেসিট’ যার হিব্রু ভাষার অর্থ হলো, ‘আরম্ভ’। যদি ইসরাইলের এই মহাকাশযান প্রেরণ অভিযানের আরম্ভটি সফল হয়, তবে ইহুদি রাষ্ট্রটি মহাকাশ অভিযানে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলেই অনেকের ধারণা। ফ্যালকন-৯ রকেটটি যখন ‘বেরেসিট’ মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিক্ষেপ করবে তখন তার গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ৩৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। আরও প্রায় ৯ ঘণ্টা চলে ৬০ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীর কক্ষপথ-সীমানায় যখন পৌঁছবে তখন পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ টানের জন্য এর গতিবেগ কমে আসবে এবং মহাকাশযানটি আবার পৃথিবীর দিকে নেমে আসবে। কিন্তু পৃথিবী ছোঁয়ার আগেই আবার এর গতিবেগ বেড়ে পৃথিবীর কক্ষপথে আরও ওপরে উঠে যাবে। একবার পৃথিবীর কক্ষপথ আবর্তন করতে সময় লাগবে ১৯ ঘণ্টার মতো।
এভাবে বেশ ক’বার পৃথিবীর কক্ষপথ ঘুরে ঘুরে মহাকাশযানটি এর গতিবেগ বাড়াবে এবং পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চন্দ্রের অরবিট বা কক্ষপথে প্রবেশ করবে। ব্যাপারটি অনেকটা একটি দড়ির মাথায় কোনো বস্তু বেঁধে চক্রাকারে ঘুরিয়ে বস্তুটির গতিবেগ বাড়িয়ে আরও দূরে নিক্ষেপ করার মতোই।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা খুব সুক্ষ্মভাবে এর হিসেব করেছেন। প্রথমবার ঘুর্ণনে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার কিলোমিটার অর্বিট উচ্চতায় মহাকাশযানটি উঠবে, দ্বিতীয়বার উঠবে প্রায় দুই লাখ সত্তর কিলোমিটার এবং তৃতীয়বার উঠবে প্রায় চার লাখ কিলোমিটার উচ্চতা। যখন চন্দ্রের কক্ষপথ পৃথিবীর নিকটতম হবে ঠিক সেসময়েই মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চন্দ্রের কক্ষপথে প্রবেশ করবে এবং চন্দ্রের বায়ুম-লে আবর্তন করবে। যেকোনো মহাকাশযানের জন্য এক কক্ষপথ অতিক্রম করে অন্য কক্ষপথে প্রবেশের সময়টি খুব ঝুঁকি এবং গুরুত্বপূর্ণ।
সব কিছু ঠিক থাকলে মহাকাশযানটি চাঁদের বায়ুম-লে প্রবেশ করে দশ হাজার কিলোমিটার থেকে দুইশো পঞ্চাশ কিলোমিটার উচ্চতায় বেশ অনেকবার চন্দ্রকে আবর্তণ করে এর গতিবেগ ঘণ্টায় ছয় হাজার কিলোমিটার থেকে শূন্যে নামিয়ে আনবে। এর পরে চাঁদের মধ্যাকর্ষণ টানে নামতে থাকবে। চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণটি সহজ ও ঝাঁকুনিহীন করার বিষয়টি পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো চন্দ্রের অত্যন্ত বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এই ক্ষুদ্র মহাকাশযানটি মাত্র দুই কিংবা তিন দিন ( পৃথিবীর দিন) টিকে থাকতে সক্ষম হবে। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই ইসরাইলের এই মহাকাশযানটি অনেকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পৃথিবীতে তথ্য-উপাত্ত পাঠাবে। পাঠাবে অনেক ছবিও।
ইসরাইলের পাঠানো মহাকাশযানটির অবস্থান স্বল্প সময়ের হলেও মহাকাশ অভিযানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগ এক ইতিবাচক অধ্যায়। আশার কথা যে, ইসরাইলের এই মহাকাশযানটি চন্দ্রপৃষ্ঠে থাকার সময়েই অর্থ্যাৎ ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসেই ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা চন্দ্রে অবতরণের জন্য ‘চন্দ্রনারায়ণ-২’ মহাকাশযান প্রেরণ করবে, যাতে যান্ত্রিক শকট বা রোভার এবং ল্যান্ডার দু’ধরনের ব্যবস্থাই থাকবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০৮ সালে ভারত চন্দ্রের কক্ষপথে ‘চন্দ্রনারায়ণ-১’ সফলভাবে প্রেরণ করেছিলো এবং যা এক বছরের অধিক সময় চন্দ্রের বায়ুম-লে অবস্থান করেছিলো।
লেখক : বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, কবি ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত