প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসামের বাঙালিদের ব্যাপারে আমরা নিশ্চুপ কেন?

অসীম সাহা : ফেব্রুয়ারি। আমাদের ভাষার মাস। আর কদিন বাদেই একুশে ফেব্রুয়ারি। শহিদ দিবস ও একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমরা এইদিনে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালন করবো। আমাদের মনে পড়বে, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাস্তায় নেমে এলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান রফিক, বরকত, সালাম জব্বার, শফিউর প্রমুখ কয়েকটি তরুণ-তাজা প্রাণ। সেই থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শহিদ দিবস।

১৯৫২ থেকে ১৯৬১। মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে ভারতের আসামের শিলচরে বাংলা ভাষাকে রক্ষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে জীবন দিয়েছিলো ১১জন বাঙালি নারী ও পুরুষ। দাবি একই। শুধু রাষ্ট্র ও এলাকা ভিন্ন। তবে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিলো, এই অঞ্চলের সকলেই ছিলেন বাঙালি। কিন্তু আসামের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শত শত বছর ধরে বাঙালিরা আসামে বসবাস করে এলেও অসমিয়ারা কখনো বাঙালিকে মেনে নেয়নি। নেবেও না। উপরন্তু এখন অসমিয়ারা বাঙালি খেদাও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের বাঙালিরা যেমন; তেমনি আসামের বাঙালিরাও মাতৃভাষা বাংলার জন্যেই জীবনদানের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেখানে আমরা কেন অমমিয়া-বাঙালিদের ব্যাপারে নিশ্চুপ হয়ে আছি? বাঙালি-বিতাড়নের যে নীলনকশা অসমিয়া সরকার এবং উগ্রপন্থি আসমিয়া জঙ্গি সংগঠনগুলো গ্রহণ করেছে এবং তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে দিল্লির মোদী সরকারের গেরুয়াবাহিনী, তাতে শত শত বছর ধরে আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে শিলচর অঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ বাঙালি শুধু অত্যাচারিত নয়, তাদের ওপর অমানিশার অন্ধকার নেমে এসেছে। হত্যা করা হচ্ছে নিরীহ বাঙালিদের। জোর করে ‘বাস’ থেকে নামিয়ে অসমিয়া তরুণরা লাঞ্ছিত করছে বাঙালি তরুণ-তরুণীদের। বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটে চলেছে। ৪০ লাখ বাঙালিকে আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ আমরা প্রতিবেশী হিশেবে আমাদের সেই বাঙালি ভাইদের প্রতি ন্যূনতম নৈতিক সমর্থন কিংবা সমবেদনা জানাতেও ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা কি ভুলে গেছি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের জন্য আসামের বাঙালিদেরও একটি বিশাল ভূমিকা ছিলো? তা হলে তাদের বিপদে আমরা কেন তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারছি না? এটা আমাদের দিক থেকে ইতিহাসের দায়। সেই দায় এড়ালে আমরা আমাদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে যাবো। একদিন পাহাড়ী অঞ্চলে চাষাবাদের প্রয়োজনে যে অসমিয়ারা বাঙালি কৃষকদের তাদের ভূমিতে স্বাগত জানিয়েছিলো, তারাই আজ নাগরিকপঞ্জির নামে বাঙালি বিতাড়নের খেলায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে। এটা শুধু জাতিগত অপরাধ নয়, মানবিক অপরাধ। এই অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে রুখে দাঁড়াতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের বাঙালিদেরও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আমাদের কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কারণে-অকারণে রাজপথে নামতে পারেন, উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। তা হলে আমাদের জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা আমাদের পাশেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছে, নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে আতংকে দিন কাটাচ্ছে, আমরা কেন তাদের জন্য সমবেদনার হাত বাড়িয়ে দিতে পারছি না? এসময় যদি আমরা তাদের দিকে আমাদের সমর্থনের হাত বাড়িয়ে অন্তত প্রতিবাদটুকুও না করি, তা হলে তার পরিণাম জাতি হিশেবে আমাদের জন্য শুভ নাও হতে পারে! ব্যাপারটা কি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে পারি না?

আমি এ-ব্যাপারে আমাদের মানিনীয় প্রধানমন্ত্রী ও মানবতার জননী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো, আপনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁকে অসমিয়া-বাঙালিদের ওপর এই অমানবিক অত্যাচার এবং তাদের নাগরিকত্ব-হরণের অপপ্রয়াস বন্ধ করতে বলুন। ইতিহাসের গর্বিত জাতি হিশেবে এই সংকটময় মূহূর্তে অসমিয়া-বাঙালিদের পাশে দাঁড়ালে আপনি যে বিশ্বনেত্রী, সেটি আরেকবার প্রমাণিত হবে। মহান-হৃদয় বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিশেবে এটুকু প্রত্যাশা অন্তত আমরা আপনার কাছে করতেই পারি।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত