শিরোনাম
◈ ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির মামলায় ৯৯ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন ◈ ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ দুই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে বার্সেলোনা শিবিরে জোড়া ধাক্কা ◈ সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রায়ের কপি পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ, জানালেন শামা ওবায়েদ ◈ কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে দেশের সব উপজেলায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ◈ টাইগার শ্রফকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩, আরও যে তথ্য সামনে এসেছে ◈ ফ্রান্সে স্কুলের আন্দোলন যেভাবে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হলো ◈ সমস্যাটা তো হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, গুলি কেন খেলেন ইশরাক ভাই: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ◈ বিরোধিতার নামে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা জুলাই শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা: তারেক রহমান ◈ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, ইশরাকের বিষয়ে আরও যা বললেন আইনমন্ত্রী

প্রকাশিত : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ০৯:৪৯ সকাল
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ০৯:৪৯ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই মাদকসেবীদের

কালের কন্ঠ :  ১৪ বছরের কিশোর নূর নবীর চোখে-মুখে ঘুম, আর ক্লান্তির ছাপ। মুখে নেই দুরন্তপনা বা শিশুসুলভ চাহনি। বড় কয়েকটা জখমের দাগও সেখানে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রেললাইনের পাশে ঘুমায় নূর নবী। সেখানে সম্প্রতি সে অকপটে জানায়, উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে যা আয় হয় তার বেশির ভাগ খরচ করে চাক্কি (ঘুমের ওষুধ), গাঁজা, ইয়াবা সেবনে। প্রশ্নের জবাবে সে বলে, ‘কয়েকজন স্যার একবার হাসপাতালে নিয়ে গেছিল। পরে আর কী করমু? সবাই খায়। আমিও খাই! কেউ তো বালা কইরা দেয় না। রাস্তায় না নামলে খামু কী?’

নূর নবী জানায়, গাবতলীর একটি বস্তিতে থাকে তার মা-বাবা। তিন ভাই ও এক বোন আছে তার। সংসারের অভাব-অনটন থেকে কাজের সন্ধানে বের হয়ে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে গাঁজা সেবন শুরু করে সে। একে একে অন্য মাদকও। ফুটপাতের বন্ধুরা তাকে শিখিয়েছে, ‘নেশা খেয়ে ঘুমিয়ে থাকলে ক্ষুধা লাগবে না, ঠাণ্ডা লাগবে না।’ একবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে যাওয়ার পর এখন নূর নবী বুঝতে পারছে, সে দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে। সে সুস্থ হয়ে স্কুলে যেতে চায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়মিত গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করেন আব্দুল মালেক (৩৮)। বাসা লালবাগের শহীদনগরে। চার মাস আগে একবার অনেকের সঙ্গে তাঁকে আটক করা হয়। কারাগার থেকে দুই মাস পর তিনি ছাড়া পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জেলেও মাদক আছে। আমার জীবনে অনেক সমস্যা। কিছুই ঠিক নাই। আর কে আমারে চিকিৎসা দিবে।’

নূর নবী ও মালেকের মতোই লাখো মাদকসেবী এভাবেই চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতার বাইরে অন্ধকার জীবনে তলিয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গেলেও স্বল্পকালীন চিকিৎসায় সুস্থ হয়নি। অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু মুক্তি মেলেনি মাদক থেকে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ছিন্নমূল বা দরিদ্র মাদকসেবীদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়েও নেই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। মাদকসহ আটকের কারণে মাদকাসক্তদের আইনগত প্রক্রিয়ায় কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে সেই কারাগারে নেই মাদকাসক্তি

নিরাময়ের চিকিৎসা। দেশের কারাগারে এখন মোট বন্দির অর্ধেক মাদকাসক্ত। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও মাদকসেবীদের পুনর্বাসনের দিকে নজর নেই। বিশেষ অভিযানেও গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মাদকসেবী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকাসক্তি অপরাধ নয়, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত রোগ। এর দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। বর্তমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পাওয়ার অধিকার থাকলেও মাদকসেবীদের অপরাধীর চোখেই দেখা হচ্ছে। মাদকাসক্তরাই মাদকের চাহিদা তৈরি করে। একজনের মাধ্যমে আরো কয়েকজন মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে।

কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা কত এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই কারো কাছে। বেসরকারি সংস্থার বরাত দিয়ে অনেক স্থানে বলা হয়, ৭০ লাখের বেশি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, “আমেরিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুসারে ‘মাদকাসক্তি দীর্ঘ মেয়াদি পুনঃপতনশীল মস্তিষ্কের রোগ’, যার জন্য চিকিৎসাসেবা একান্ত প্রয়োজন। দেশের ৭০ লাখ মাদকাসক্তকে সেবা দিয়ে মূল ধারায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য যা করা দরকার সে পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসা পাওয়া মাদকাসক্তদের চাহিদা ও অধিকার। এদের চিকিৎসার মাধ্যমে পুনর্বাসন দরকার। আটকে রাখলে লাভ নেই। আর কারবারিদের মধ্যে যাদের কম দণ্ড হবে তাদের বিচারের সঙ্গে পুনর্বাসনও করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, জার্মানিতে মাদকে জড়িতদের আটক করার পরে জানতে চাওয়া হয় জেলে যাবে, নাকি চিকিৎসা কেন্দ্রে। সে অনুযায়ী প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়।’

কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেন, মাদকাসক্তি একটি রোগ, এর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি অন্য অপরাধেও জড়িত থাকতে পারে। ফলে কারাগার বা হেফাজতেও তার চিকিৎসা দেওয়া উচিত। কারণ মাদকসেবী স্বাভাবিক জীবনে না ফিরলে আশপাশের অন্যদেরও সে মাদকাসক্ত করে তুলবে।

অভিযানে ধরা মাদকসেবীরাই

গত বছর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা দেন। এরপর ৪ মে থেকে শুরু হওয়া অভিযানে প্রায় সোয়া লাখ মামলায় দেড় লাখ মাদক কারবারি ও মাদকসেবী গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযানে তিন শতাধিক মাদক কারবারি নিহত হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারকৃতদের অর্ধেকই মাদকসেবী।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৪ মে থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার হাজার ৮৫২টি অভিযানে আট হাজার ২৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ সময়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত এক হাজার ৩৫৩টি অভিযানে ১০ হাজার ৩১৯ জনকে সাজা দিয়েছেন। এদের মধ্যে আট হাজার ৮২৭ জন মাদকসেবী। মাত্র এক হাজার ৪৯২ জন কারবারি। ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড দেওয়া হয় আট হাজার ৮২৭ জনকে, ৪৯২ জনকে দেওয়া হয় অর্থদণ্ড। এই হিসাবে দেখা গেছে, র‌্যাবের হাতে মোট গ্রেপ্তার ১৮ হাজার ৫৬৪ জনের মধ্যে শতকরা ৪৭.৫৪ ভাগ মাদকসেবী। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডিতদের মধ্যে ৮৫.৫৪ শতাংশই মাদকসেবী।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে মাদকসহ গড়ে ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের কাছে বিপুল পরিমাণ মাদক কমই মেলে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, টহল অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের বেশির ভাগই মাদকসেবী।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘মাদকাসক্তরা আসলে রোগী। তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। এ জন্য সাধারণ মামলায় দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে না ফেলে আমরা মোবাইল কোর্টে এদের সাজা দিচ্ছি। সেখানে স্বল্প মেয়াদে সাজার মাধ্যমে কারেকশনের সুযোগ থাকে। তবে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে আমরা খুবই জরুরি মনে করছি। আমরা দেখি সামাজিক কারণে মাদকাসক্তদের পরিবারও আড়াল করতে চায়। সবাই তাদের অপরাধীর চোখেই দেখে।’

কারাগার থেকে ফিরে আবার মাদকে

কারওয়ান বাজারের মাদক কারবারি সেলিম এখন মিরপুরের গাঢাকা দিয়ে আছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে আমি মাদক সেবন করতাম। একবার পুলিশের হাতে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাস জেলে ছিলাম। তখন দুজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তাদের সঙ্গে মিলে গাঁজা আর ফেনসিডিল বিক্রি শুরু করি। প্রথম দিকে পরিবার একবার নিরাময় কেন্দ্রে নিছিল। ১৫ দিন ছিলাম। টাকা দিতে পারে নাই, তাই চিকিৎসাও হয় নাই!’

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের এক বৃদ্ধা জানান, মাদকাসক্ত ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনিই ছেলেকে পুলিশে দেন। এরপর মামলা দিয়ে জেলে পাঠান। এ জন্য ১০ হাজার টাকা খরচ হয় তাঁর। সাত মাস পরে ছেলেকে আবার ছাড়িয়ে আনেন। তখন দেখেন আগের চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা।

কয়েকজন মাদকসেবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারাগারে টাকার বিনিময়ে সব ধরনের মাদকদ্রব্যই পাওয়া যায়। সেখানে চিকিৎসাকেন্দ্রে মাদকাসà¦