প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বাস্থ্যে দুদক আতঙ্ক

সমকাল :  দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অভিযানে স্বাস্থ্য খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালকসহ মাঠ পর্যায়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আতঙ্কে। এসব কর্মকর্তা একশ্রেণির ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেনাকাটার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জোরালো লবিং-তদবির করছেন। উচ্চ পর্যায়ের চাপে কয়েকজনের ফাইল ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি কয়েকজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, অফিস সহকারী ও ড্রাইভারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ অবস্থার মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ১১টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে তুলে দেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতি রোধে সংস্থাটির ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছিল দুদক। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ কর্মকর্তাকে বদলি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (পার-২) এ কে এম ফজলুল হক খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, আগামী ৭ দিনের মধ্যে তারা বদলি কর্মস্থলে যোগ না দিলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবেন।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, সাবেক লাইন ডিরেক্টর (হাসপাতাল) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর আলম, চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমানসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে তলব করেছে দুদক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্ধারিত দিনে হাজির না হয়ে সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। এর পরই দুদকের হাত থেকে বাঁচতে উচ্চ পর্যায়ে লবিং-তদবির শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তারাও আতঙ্কে রয়েছেন।

বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দের মধ্যে অন্যতম হলো স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে দুর্নীতিও কম হয় না। কয়েক বছর ধরে এ খাতের অনেক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান এর আগে লক্ষ্য করা যায়নি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন খাতে দুদকের অভিযান শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতেও অভিযান শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে লুটপাটের চিত্র :বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালে এমআরআই মেশিন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়। ওই মেশিন ক্রয়বাবদ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ৩০ জুন ১৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়। অথচ হাসপাতালে কোনো এমআরআই মেশিন সরবরাহ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিল তুলে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই সময় ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক ডা. এসএম ইকবাল হোসেন। তিনি স্বীকার করেন, ওই সময় কোনো এমআরআই মেশিন সরবরাহ করা হয়নি।

ওই একই অর্থবছরে গোপালগঞ্জ আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে সাত কোটি ৯০ লাখ টাকা, আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট মৌলভীবাজার হাসপাতালে সাড়ে তিন কোটি, পাঁচশ’ শয্যাবিশিষ্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতালে এক কোটি ২৮ লাখ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঁচ কোটি ৯০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়। এখানেও মানসম্পন্ন মালপত্র সরবরাহ করা হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে রংপুর, দিনাজপুর, মুগদা ও কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়বাবদ প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। নতুন কোনো বিল দেওয়া হয়নি। বকেয়া বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েক বছর আগে এসব হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতির বিষয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্ত করেই বকেয়া বিল দেওয়া হয়েছিল।

তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অগ্রাহ্য করেই বিল ছাড় করা হয়। দুদক এসব প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি সরবরাহ-সংক্রান্ত অনিয়ম এখনও তদন্ত করছে। দুদকের কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিল ছাড় করা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এরও আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে রংপুর মেডিকেল কলেজে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ডেন্টাল চেয়ার ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সরবরাহ করা হয়। পাঁচটি ডেন্টাল চেয়ার সরবরাহ করে পৌনে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া যায়। এ নিয়ে একটি মামলাও দায়ের করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যন্ত্রপাতি মেরামত না করেই টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে একই হাসপাতালে সাড়ে সাত হাজার টাকার বেবি স্ক্যানার মেশিন মেরামতের জন্য চার লাখ ১১ হাজার ৯০০ টাকা এবং পাঁচ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় ক্রয় করা কার্ডিয়াক তিনটি মনিটরের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন দেখিয়ে ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। একইভাবে ছয় লাখ ৫৯ হাজার টাকায় ক্রয় করা ফটোথেরাপি মেশিনের দুটি পার্টস বদল করতে ছয় লাখ ৪০০ টাকা খরচ দেখানো হয়। সংশ্নিষ্টরা জানান, যন্ত্রপাতি মেরামত না করেই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটটি বিল তুলে নেয়। দুদকের সহকারী পরিচালক আমিরুল ইসলাম তদন্ত করে এ ঘটনার সত্যতা পান এবং তিনি মামলা করার সুপারিশ করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আর অগ্রসর হয়নি।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে রংপুর সিভিল সার্জন অফিসের অধীনে সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কিউসোর্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২৯ মে কার্যাদেশ পাওয়ার পরদিনই জার্মানি, ব্রাজিল, কোরিয়া, ইউএসএ, তাইওয়ান, পোল্যান্ড, চীন এবং জাপানের তৈরি বিভিন্ন আইটেমের ২৪ কোটি ৮৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯৯০ টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়। একই দরপত্রে আরও ১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার ৩০০ টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়।

হাসপাতাল-সংশ্নিষ্টরা জানান, বড় বড় দেশের নামের স্টিকার লাগিয়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক আমিরুল ইসলাম তদন্ত করে প্রায় ৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পান। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদকের একটি দল ওইসব হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখতে পায়, প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাকরি থেকে অবসরে থাকা আমিরুল ইসলাম কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এর আগে ২০১৬ সালে আটটি হাসপাতালের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নামে দুদক। এসব হাসপাতালের মধ্যে মুগদা ৫০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহে তিন বছরের জন্য ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডারের কাগজপত্র, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ-সংক্রান্ত বিল-ভাউচার, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫০০ কোটি টাকার নথি, গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ৪০ কোটি টাকার কাগজপত্র, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩০ কোটি টাকার কেনাকাটা-সংক্রান্ত তথ্য, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য চাওয়া হয়। এ ছাড়া যন্ত্রাংশ সরবরাহ না করেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে ২৭ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার বিবরণও চাওয়া হয়। এ কার্যক্রম শেষ না হলেও হাসপাতালগুলোতে একের পর এক বিল ছাড় করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনার সঙ্গে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুসহ বিতর্কিত ঠিকাদার গ্রুপের সংশ্নিষ্টতা পায় দুদক। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ-সংক্রান্ত টেন্ডারের কাগজপত্রসহ যাবতীয় নথি তলব করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য খাতে তার ছিল একক রাজত্ব :গত ১০ বছর স্বাস্থ্য খাতে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে মিঠু ও তার সিন্ডিকেট। স্বাস্থ্য খাতে অধিকাংশ দুর্নীতির সঙ্গে তার জড়িত থাকার অনেক প্রমাণ রয়েছে দুদকের কাছে।  স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান ও সাবেক অন্তত ১০ জন পরিচালকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছে। তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলে প্রথমেই আসবে আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর নাম। বিগত মহাজোট সরকারের আমলে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে স্বাস্থ্য খাতে তিনি একচেটিয়া রাজত্ব করেন। ওই পাঁচ বছর স্বাস্থ্য খাতের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের জড়িত থাকার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। ওই সময় লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ এবং লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেড নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া লেংকিন মার্চেন্ডাইল, সিআর মার্চেন্ডাইজ ও এলআর এভিয়েশন, জিইএফ অ্যান্ড ট্রেডিং, ট্রেড হাউস, মেহেরবা ইন্টারন্যাশনাল, ক্রিয়েটিভ ট্রেড, ফিউচার ট্রেড, লেক্সিকোন আইটি (প্রা.) লি., টেকনো ট্রেড, বিলিয়ার এভিয়েশন, সিএসই অ্যান্ড ট্রেডিং, হ্যাভ ইন্টারন্যাশনাল, লেসিকোন হসপিটালেট, নর্থ ট্রেড নামের ঠিকাদারি ফার্মের নামে এসব হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, অফিস সহকারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন মিঠু। যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মহাজোট সরকারের শেষ বছরে কোনো কোনো হাসপাতালে একসঙ্গে তিন বছরের টেন্ডার করে রাখা হয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ নাসিম দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম তিন বছর ওই ঠিকাদার সিন্ডিকেটই যন্ত্রপাতি কেনাকাটার বরাদ্দ পায়। সম্প্রতি ওই চক্রটি স্বাস্থ্য খাতের ৮৫ কোটি টাকা লোপাটের আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু মোহাম্মদ নাসিমের হস্তক্ষেপে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে এক উপসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়।  এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের এক উপপরিচালককে সম্প্রতি ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক  বলেন, তদারকি ও নজরদারির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই তার প্রধান লক্ষ্য। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন। যিনি অনিয়ম-দুর্নীতি করবেন, সেই দায়ভার তার ওপরই বর্তাবে। এ জন্য আইন অনুযায়ী তার শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

মিঠু সিন্ডিকেটের কর্মকর্তারা :স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হকের সঙ্গে সখ্যের কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা মিঠুর সুনজরে আসার চেষ্টা করেন। কারণ মিঠুর সুনজরে আসতে পারলেই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন মিলবে- এই ধারণা থেকে বড় বড় কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। মিঠুর পছন্দ অনুযায়ী অধিদপ্তরের হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট শাখার লাইন ডিরেক্টর এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন শাখার পরিচালক, পরিচালক (অর্থ)সহ বড় বড় হাসপাতালের পরিচালক ও উপপরিচালক পদে চিকিৎসকরা পদায়ন পেতেন। বিষয়টি স্বাস্থ্য খাতে ওপেন সিক্রেট। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট শাখার লাইন ডিরেক্টর এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন শাখার পরিচালক, পরিচালক (অর্থ) এবং মুগদা, রংপুর, দিনাজপুরসহ সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালক, উপপরিচালক ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা সবাই মিঠুর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তী পাঁচ বছর এসব পদে দায়িত্ব পালনকারীরাও মিঠুর লোভনীয় অফারের বাইরে যেতে পারেননি। এসব কর্মকর্তা ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকার কমিশন-বাণিজ্য করেছেন। তাদের অনেকের দেশ ও বিদেশে বাড়ি রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, মিঠুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যেসব হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলোর যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত চেয়ে ২০১৬ সালে দুদক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট শাখার তৎকালীন লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক শামিউল ইসলামের কাছে চিঠি দেন। প্রথম দফায় চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ না করায় ওই বছরই দ্বিতীয় দফায় আবারও চিঠি দেয় সংস্থাটি। দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক স্বাক্ষরিত ওই চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই তদন্ত আর এগোয়নি। গত রোববার এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল হক  বলেন, তিনি এখন ওই শাখায় নেই। তাই পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি অবহিত নন।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে দুদক থেকে স্বাস্থ্য খাতের কয়েকজন কর্মকর্তার নথি চাওয়া হয়। তারা হলেন- উপসচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব আবদুল মালেক, অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক আবজাল হোসেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল কাফী ও সুলতান মাহমুদ। তাদের মধ্যে শুধু আবজালের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। মিঠুর সিন্ডিকেটে থাকা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল কাফী ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকেরই দেশ-বিদেশে একাধিক বাড়ি রয়েছে। একই সঙ্গে তারা নামে-বেনামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলে স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক শামসুল আলম  জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান করে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর তদন্ত শুরু হয়েছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই বলা যাবে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে গত কয়েক দিন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকেও পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তিনি অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে মহাপরিচালক কোথায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, সে সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও মুখ খুলতে চাননি।

ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক  বলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে তার সখ্যের বিষয়টি বিরোধীদের অপপ্রচার। দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে কিছু পায়নি। এর পরও একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত বলে জানান তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত