প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্থপাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বাংলাদেশ

কালের কন্ঠ : আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গত ১১ বছরে (২০০৫ থেকে ২০১৫) বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হয়েছে আট হাজার ১৭৫ কোটি ডলার, যা টাকার হিসাবে (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা) ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। ২০১৫ সালে অবৈধ অর্থপাচার হয় ৫৯০ কোটি ডলার, যা টাকার হিসাবে ৪৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। অবৈধ অর্থপাচারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত।

গত সোমবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সরকারি নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, অর্থপাচার রোধে নজরদারি বাড়ানোর ফলে পাচার কমছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থপাচার কমছে এটা ভালো ইঙ্গিত। তবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনক, যা এ দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বিনিয়োগবান্ধব সরকারি নীতি সহায়তা দেওয়া হলে অর্থপাচার কমবে। বর্তমান সরকার সে পথেই হাঁটছে। একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের অর্থপাচার বন্ধে আইনি শাসন প্রয়োজন।

এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এনবিআর থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর সুফল হিসেবে অর্থপাচার কমছে।’

জিএফআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি প্রক্রিয়ায় এই অর্থপাচার হয়েছে। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম দামে পণ্য কিনে বেশি দাম দেখিয়ে অর্থপাচার করছে। রপ্তানিতেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থপাচার করছে। এ বিষয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরো নজরদারি বাড়াতে হবে।’

প্রসঙ্গত, জিএফআই হল ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা মুদ্রা পাচার নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে থাকে। সংস্থাটি প্রতিবছর অর্থপাচার নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ৫৯০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (৮৪ টাকা প্রতি ডলার হিসাবে) এই অর্থের পরিমাণ ৪৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়। বর্তমান বাজার দরে যা ৭৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে অর্থপাচার কমেছে ২৭ হাজার কোটি টাকা।

এবারের জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে ১৪৮টি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থপাচারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয় চীন থেকে। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

২০১৫ সালে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে অবৈধ পন্থায় ২৮০ কোটি ডলার এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ডলার, পরের বছর ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে পাচারের পরিমাণ ৬৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালে ৫১০ কোটি ডলার। ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার ও ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ডলার অর্থপাচার হয়।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থ দেশে রাখতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সহায়তা দিতে হবে। সরকার আগের চেয়ে নীতি সহায়তা বাড়িয়েছে। এটা অর্থপাচার কমে যাওয়ার বড় একটি কারণ। তবে এ বিষয়ে আরো উদার হতে হবে।’

জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ১৪৮টি দেশ থেকে মোট ৫৯ হাজার ৯২২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৮.৮ শতাংশ অর্থই পাচার হয়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চীন থেকে সবচেয়ে বেশি ২২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেক্সিকো থেকে চার হাজার ২৯২ কোটি ডলার ও তৃতীয় স্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে তিন হাজার ৩৩৭ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার কোটি ডলারের বেশি পাচার হয়েছে এমন দেশের তালিকায় আছে রাশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া। ভারত থেকে ৯৭৯ কোটি ডলার পাচার হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত