Skip to main content

শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রার্থীর করণীয়

Article Highlights

ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো ব্যক্তি যতবড় অপরাধীই হোক না কেন, কিন্তু তার প্রতি এমন দোষারোপ করা কখনোই জায়েজ নয় যা সত্য বা মিথ্যা হওয়ার তদন্ত করা হয় নি। কিন্তু নির্বাচনী সভা-সমাবেশের এমন কোনো ভাষণ-বক্তৃতা সম্ভবত এমন নেই যার মধ্যে তদন্ত করা ছাড়াই দোষারোপ করা হয় না। আর এমন দোষারোপ করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আবার কতক সময় এই দোষারোপের ক্ষেত্রে এমন নিম্নমানের বাজারি শব্দ ব্যবহার করা হয় যা অপবাদের গন্ডিকেও অতিক্রম করে ফেলে।

একজন নির্বাচন প্রার্থী একটি এলাকার প্রতিনিধি। সে এলাকার ভাগ্য নির্ধারণী কাজ করবেন তিনি। একজন প্রার্থীর জন্য যা করণীয় তা শরিয়তে বলে দেয়া হয়েছে। তা হলো : এক. নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার কারণে আমাদের সমাজে যে গুনাহ ও অন্যায়কর্ম বিস্তার লাভ করেছে সেগুলোর মৌল ভিত্তি হলো ক্ষমতার লিপ্সা এবং পদ লাভের অপ্রতিরোধ্য মোহ। এর বৈধতা অনুসন্ধান করার জন্য কোনো কোনো সময় দেশ ও জাতির কল্যাণকামনার নিষ্পাপ অভিব্যক্তি ব্যক্ত করা হয়।

অথচ রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ করার ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা হলো, এটা ফুলের কোনো তোড়া নয়, যা লাভ করার জন্য একে অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। বরং এটা দুনিয়া ও আখেরাতের ওই জুয়াল যা নিজের স্কন্ধে রাখার পূর্বে মানুষের কম্পিত হওয়া উচিত এবং অত্যধিক অপারগ না হলে নিজেকে এই পরীক্ষায় না ফেলা উচিত।
এ কারণেই হযরত উমর রা. কে যখন তার স্থলাভিষিক্ত খলিফা হিসাবে নিজের সন্তান হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর নাম উল্লেখ করতে অনুরোধ করা হয় তখন তিনি এর একটি জবাব এও দিয়েছিলেন, ‘রাষ্ট্রক্ষমতার শৃঙ্খল খাত্তাব পরিবারের মধ্যে কেবল এক ব্যক্তির (হযরত উমর রা.) গলায়ই পরানো হয়েছে। আর এটাই যথেষ্ট। আমি আমার সন্তানের ঘাড়ে এই দায়ভার চাপিয়ে দিতে চাই না।

যদি কোনো ব্যক্তির অন্তরে এই গুরুভারের জিম্মাদারির যথার্থ অনুভব থাকে তা হলে নিঃসন্দেহে বৈধ উপায়-উপকরণের মাধ্যমে তার নেতৃত্বের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা থেকেই হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সে দায়িত্বও অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। আর এর পরিণামে কখনো সেসব অন্যায়-অপরাধ ও গোনাহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে না যেগুলোর বিষাক্ত প্রভাব রাজনীতির ময়দানকে কলুষিত করে ফেলেছে। কিন্তু ক্ষমতাকে যখন স্বার্থের বাহন ও পেশা বানানো হবে এবং বস্তুস্বার্থের উপায় হিসাবে নির্ধারণ করা হবে এবং একে লাভ করার জন্য তনুমনের সমস্ত শক্তি ব্যয় করা হবে তখন সেটা হবে ক্ষমতালাভের ওই লোভ যার জঠর থেকে কল্যাণ ও মঙ্গল বের হতে পারে না।

দুই. অকল্যাণ ও বিপর্যয়ের একটি দিক এই যে, আমাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর প্রতি দোষারোপ করে থাকে এবং একে অন্যের প্রতি অপবাদ আরোপ করাকে বৈধ মনে করে।প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে জয়মাল্য ছিনিয়ে আনার জন্য তার প্রতি কোনোরূপ যাচাই বাছাই এবং তদন্ত করা ছাড়াই অপবাদ আরোপ করাকে বৈধ মনে করে থাকে। বরং এটা রাজনৈতিক যুদ্ধের ওই অপরিহার্য অনুষঙ্গ যার ছাড়া রাজনৈতিক সফলতাকে অসম্ভব মনে করা হয়।

ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো ব্যক্তি যতবড় অপরাধীই হোক না কেন, কিন্তু তার প্রতি এমন দোষারোপ করা কখনোই জায়েজ নয় যা সত্য বা মিথ্যা হওয়ার তদন্ত করা হয় নি। কিন্তু নির্বাচনী সভা-সমাবেশের এমন কোনো ভাষণ-বক্তৃতা সম্ভবত এমন নেই যার মধ্যে তদন্ত করা ছাড়াই দোষারোপ করা হয় না। আর এমন দোষারোপ করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আবার কতক সময় এই দোষারোপের ক্ষেত্রে এমন নিম্নমানের বাজারি শব্দ ব্যবহার করা হয় যা অপবাদের গন্ডিকেও অতিক্রম করে ফেলে। এক হাদিসে এসেছে, মহানবি সা. কোনো মুসলমানের জান-মাল, ইজ্জত ও আব্রুকে বাইতুল্লাহর চেয়েও অধিক পবিত্র এবং নিষ্কলুষ বলে অভিহিত করেছেন। এর মর্ম এটাই, কোনো মুসলমানের জান, মাল এবং ইজ্জত ও আব্রুতে হামলা করা বাইতুল্লাহকে ধ্বংস করার চেয়েও গুরুতর অপরাধ! কিন্তু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় জোশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ইজ্জতকে প্রতিনিয়ত দলিত মথিত করা হয়! আর পত্র-পত্রিকার পাতা থেকে নিয়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ ও মিছিল মিটিং পর্যন্ত কোনো স্থান এমন থাকে না যা দোষারোপ ও কালিমা লেপনের কলঙ্কে কলঙ্কিত হয় না।

তিন. যেহেতু নির্বাচনের বিষয়টাই এমন হয়ে থাকে যে, কোনো প্রার্থীর পরিচয় এবং এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত জনসম্মুখে আনার প্রয়োজন দেখা দেয়; যাতে জনসাধারণকে ধোকা ও প্রতারণা থেকে বাঁচানো যায় তাই এর জন্য প্রথমে এ বিষয়টি জরুরি যে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো কথা বলা হবে না এবং দিয়ানতদারি ও ইনসাফের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে কাজ নেওয়া হবে।

চার. অন্যদের প্রতি দোষারোপ করা এবং তাদের নিন্দা-মন্দ বর্ণনা করা ছাড়াও নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য একে জরুরি মনে করা হয় যে, প্রার্থী নিজেই নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায় এবং উন্নয়নের অলীক ফিরিিিস্ত জনসম্মুখে দাঁড় করায়। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা উচিত, আত্মপ্রশংসা করা ও নিজের যশ-খ্যাতিকে লোকসম্মুখে বলে বেড়ানো ধর্মীয়ভাবে ও নৈতিক দৃষ্টিকোণে গুনাহ; যদি গুনাহ নাও হয় তা হলেও তা মন্দ হবার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।কন্তু আমাদের নির্বাচনী আচরণবিধিতে একে কোনো নিয়ম-নীতির অনুগামী করা হয়নি।

পাঁচ. জনসাধারণকে ভোট দিতে উৎসাহিত করার জন্য এটাও জরুরি মনে করা হয় যে, তাদেরকে কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতির বাণী শোনাতে হবে। অঙ্গীকার করার সময় এ বিষয়ে কোনো কথা বলা হয় না যে, অঙ্গীকার কোন পন্থায় পূরণ করা হবে এবং ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করার পর সেসব অঙ্গীকার কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?

ছয়. সভা-সমাবেশ এবং প্রচার-প্রচারণাও নির্বাচনী কর্মতৎপরতার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যদি এসব সভা-সমাবেশ নৈতিকতা ও সভ্যতার গ-িতে আবদ্ধ থাকতো তা হলে সেগুলো বৈধও হতো।

সাত. কোনো কোনো সময় নির্বাচনী সভা-সমাবেশের আয়োজন লোক চলাচলের এমন ব্যস্ততম রাস্তায় করা হয় যার ফলে জনবসতিপূর্ণ শহরের নাগরিকদের চলাফেরা স্থবির হয়ে পড়ে এবং ট্রাফিকের এমন সমস্যা সৃষ্টি হয় যা লোকদেরকে অবর্ণনীয় কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন করে দেয়।

আট. দেওয়ালসমূহকে নির্বাচনী শ্লোগানে শ্লোগানে কালো করে ফেলা এবং ব্যক্তিগত ও সরকারি ইমারতসমূহকে পোষ্টার, ফেস্টুন ও প্লেকার্ডে প্লেকার্ডে চটচটে করে ফেলা নির্বাচনী কর্ম তৎপরতার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর ফলে শহরে অধিকাংশ দেওয়াল ও ইমারত বিপরীতমুখী শ্লোগান প্রচারপত্রে ছেয়ে যেতে দেখা যায়। আল্লাহর কোনো বান্দার এই খেয়ালও আসে না যে, অন্য কারো দেওয়াল বা ইমারতকে তার সম্মতি ছাড়া ব্যবহার করে এর আকৃতি বিকৃত করে দেওয়া প্রকৃতপক্ষে চুরি ও ডাকাতির নামান্তর। মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সা. বলেছেন, অন্য কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন জিনিস তার সম্মতি ব্যতীত ব্যবহার করা হালাল নয়। এসব ইমারত ও দেওয়াল কারো না কারো মালিকানাধীনই হয়ে থাকে। অতএব, এগুলোকে মালিকের অনুমতি ছাড়া নিজের প্রচার-প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা হারাম।

নয়. ভোট ক্রয়-বিক্রয় করা এবং এই উদ্দেশ্যে লোকদের ঘুষ দেওয়া, যেসব লোকের অধীনে ভোট ব্যাংক তাদের না জায়েয কাজ করে দেওয়া কিংবা এর ওয়াদা করা একটি স্বতন্ত্র অপরাধ, যা আল্লাহ ও আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন প্রার্থীদের মধ্যে অধিক পরিমাণে প্রচলিত রয়েছে।এ জাতীয় অপরাধ সমাজকে আখলাক ও নৈতিকতা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।

দশ. এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, নির্বাচনী কর্মতৎপরতা পরিচালিত করার জন্য এবং এর ব্যয়ভার বহন করার জন্য প্রতিটি দলের লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। আর এ মোটা অংকের টাকা যোগান দেওয়ার জন্য যে পথ ও পন্থা অবলম্বন করা হয় সেগুলোর মধ্যে বৈদেশিক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে তাদের বলে দেওয়া এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এমন এক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে যা দেশ ও জাতিকে উইপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে।

আর যে সব লোক বিদেশ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে না কিংবা করতে পারে না তারা দেশীয় বড় বড় পুঁজিপতির কাছ থেকে নিজ দলের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে।অনেক সময় এই চাঁদা মূলত ওই বিষয়ের ঘুষ হয়ে থাকে যে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর চাঁদাপ্রদানকারীদেরকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। যদি এসব ব্যক্তি চাঁদা দিতে অস্বীকার করে তা হলে তাদেরকে নানাভাবে নাজেহাল করা হয়।রাজনৈতিক যে দল অধিক শক্তিশালী হয় এবং তার ক্ষমতায় আসার যতটুকু সম্ভাবনা থাকে তার চাঁদাদাবির আবেদন বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে।