প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জামায়াতের দুর্গ ভাঙতে চায় আওয়ামী লীগ সরেজমিন-সাতক্ষীরা

আমাদের সময় :  সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা জেলায় নির্বাচনী প্রচারের দৌড়ে আওয়ামী লীগ অনেক এগিয়ে। জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ জেলার মানুষ এবার জাতীয় নির্বাচনে ‘জামায়াতি’ বদনাম ঘোচাতে চান। তাই ভোটের মাঠে আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। প্রতিদিন জেলার চারটি আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মিছিল-মিটিং করছেন। সভা-সমাবেশও চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে। ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শহর থেকে গ্রামান্তরে ছুটে যাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে নির্বাচনী এলাকায় দেখা যাচ্ছে না ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে জামায়াত-বিএনপির তেমন কোনো প্রচার। সভা-সমাবেশ দূরের কথা, চোখে পড়ছে না ধানের শীষের কোনো পোস্টার বা মাইকিং। নেই দৃশ্যমান কোনো গণসংযোগ বা চায়ের টেবিলের তর্কালাপ। গণসংযোগ চলছে অনেকটা গোপনে। নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের চিত্র ছিল এমনই। কেন জামায়াতের ঘাঁটিতে এ চিত্র? জবাবে বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটাররা বলেছেনÑনিজেদের এলাকাকে তারা আর জামায়াতের দুর্গ হিসেবে দেখতে চান না বলেই স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের মদদদাতাদের সামাজিকভাবে বয়কটের প্রক্রিয়া এ বিজয়ের মাস থেকেই শুরু করেছেন। আর প্রবীণরা বলছেনÑগত কয়েক বছরের উন্নয়ন দেখেছেন তারা। এর ধারাবাহিকতা তারা রক্ষা করতে চান।
এ জেলায় নির্বাচনী বাস্তবতা হলোÑঐক্যফ্রন্ট মনোনীত জামায়াতের দুই প্রার্থী রয়েছেন কারাগারে। বিএনপির দুজনের একজন এলাকা ছেড়েছেন। আরেক প্রার্থী মাঠে থাকলেও একাই চলতে হচ্ছে তাকে।
সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণে সুন্দরবন, উত্তরে যশোর জেলা, পশ্চিমে ভারত ও পূর্বে খুলনা জেলার অবস্থান। সাত উপজেলা ও দ্ইু পৌরসভা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরার সংসদীয় আসন চারটি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ চারটি আসনে ১৫ লাখ ৬০ হাজার ২৬১ ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে সাত লাখ ৮১ হাজার ৫৪০ পুরুষ ও সাত লাখ ৭৮ হাজার ৭১৫ নারী ভোটার রয়েছেন। ভোটকেন্দ্র ৫৯৭টি। চারটি আসনে ২২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।  সাতক্ষীরা-১
তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য বর্তমান সাংসদ মুস্তফা লুৎফুল্লাহ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব। বিরোধী দলে থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে তার বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রার্থী হলেও তিনি এলাকাছাড়া। হাবিবের অভিযোগÑকলারোয়া এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ মিলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, গত ১৪ ডিসেম্বর নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ শুরু করলে তাদের মারধর করা হয়। এর পর থেকে তিনি এলাকায় থাকতে পারছেন না। ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে তার পোস্টারও।
সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে ছোটখাটো কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এসবের বেশিরভাগই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়েছে। যিনি বঙ্গবন্ধুকন্যার গাড়িবহরে গুলি করতে পারেন, তার পক্ষে অনেক কিছু বলা বা করা সম্ভব। এ নেতা আরও বলেন, কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ছাড়া অন্য প্রার্থীরা মাঠে আছেন। যেখানে নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছে, পুলিশ সেখানে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ আসনে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এসএম মুজিবুর রহমান সিংহ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তিনি দশম সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠ থেকে সরে গেলে তার সুফল পাবেন নৌকার প্রার্থী। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এ আসন থেকে ৯২ হাজার ৯২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এই এসএম মুজিবুর রহমান। তিনি পান ২৩ হাজার ৮৯৭ ভোট পান।
আগের নির্বাচনগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাতক্ষীরা-১ আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী শেখ আনছার আলী, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ কামাল বখ্ত সাকী, ২০০১ সালের নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের বর্তমান প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবর রহমান নির্বাচিত হন।
কোনো প্রার্থী এখানে পরপর দুবার নির্বাচিত হতে পারেননি। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক নিয়ে সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখ্ত মাঠে রয়েছেন। হেভিওয়েট তিন প্রার্থী থাকায় ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ আসনে ভোটার চার লাখ ২৩ হাজার ৩৩ জন।
সাতক্ষীরা ২
জেলা সদরের আসন এটি। এখানে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মীর মোস্তাক আহমেদ রবি ও ধানের শীষ নিয়ে জেলা জামায়াতের আমির মুহাদ্দিস আবদুল খালেক নির্বাচন করছেন। জামায়াত নেতা জুন থেকে কারাগারে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মীর মোস্তাক ৩৩ হাজার ৫১৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছাইফুল করিম সাবু, পেয়েছিলেন ১৬ হাজার ১৫৭ ভোট। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা কাজী সামসুর রহমান, ২০০১-এ জামায়াতের আবদুল খালেক ম-ল, ২০০৮ সালে মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টির আবদুল জব্বার নির্বাচিত হন। এ আসনে ইতোপূর্বে জামায়াত যে নারকীয় তা-ব চালিয়েছে, এবারের নির্বাচনে ভোটাররা সে কথাও তুলে আনছেন। তারা বলছেনÑবিজয়ের মাসে জামায়াতের দুর্গ ভেঙে আরেকটি বিজয় আনতে চাই। বিগত রেকর্ড বলেÑএখানে ইতিপূর্বে জামায়াতের লড়াই হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে।
সাতক্ষীরা-৩
আশাশুনি, দেবহাটা ও কালীগঞ্জের চার ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে তিন প্রার্থী থাকলেও লড়াই হতে পারে নৌকা প্রতীকের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এবং ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শহিদুল আলমের মধ্যে। মন্ত্রী থাকাকালে রুহুল হক এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছেন। আবার কাছের মানুষের কারণে বদনামের দায়ও নিতে হয়েছে। বিএনপি নেতা শহিদুল আলমের ক্লিন ইমেজও একটি ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন ভোটাররা। বর্তমানে তিনি মাঠে থাকলেও একা হয়ে পড়েছেন। ব্যক্তি ইমেজের কারণে এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা রিয়াছাত আলী, ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগের মোখলেছুর রহমান, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আ ফ ম রুহুল হক নির্বাচিত হন।
সাতক্ষীরা-৪
সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ উপজেলার আট  ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে নৌকা প্রতীকে এসএম জগলুল হায়দার, ধানের শীষে সাবেক এমপি জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম নির্বাচন করছেন। এ আসনে গত নির্বাচনে জগলুল হায়দার নির্বাচিত হন।
এ আসনে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ফজলুল হক, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে গাজী নজরুল ইসলাম, ২০০৮ সালে ১৪-দলীয় প্রার্থী এইচএম গোলাম রেজা নির্বাচিত হন। গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রার্থী অবহেলিত এই জনপদে যে উন্নয়ন করেছেন, ভোটাররা তাতে সন্তুষ্ট। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবারও নৌকার পালে হাওয়া লাগার সম্ভাবনা বেশি বলে মন্তব্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতৃবৃন্দের।
সাতক্ষীরা গণজাগরণ মঞ্চের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান মাসুম বলেন, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক রীতি। তবে অবশ্যই তা স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে নিয়ে নয়। এদের দূরে রাখতে ও জেলার ‘জামায়াতি’ বদনাম ঘোচাতে এবার আমজনতা একাট্টা। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার এমএ মজিদ জোর দিয়ে বলেন, আমরা আরেকটি বিজয় ছিনিয়ে আনব ইনশাল্লাহ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত