প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষক মানে কী এবং এমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক স্যার

কামরুল হাসান মামুন : গত দুইদিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক স্যারের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার বেশ কয়েকবার দেখা হয়ে গেছে এবং আরো দেখবো বলে আশা রাখি। একজন শিক্ষক মানে কি, কেমন করে কথা বলেন, কেমন তার চিন্তাভাবনা সেগুলোর একটু ধারণা পাওয়া যায় এই ভিডিওটি দেখলে। অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক এডওয়ার্ড কলেজে ২৬তম হয়েছিলেন। সেই সময় সেই কলেজে একজন শিক্ষক ছিলেন যার নাম মাখন লাল চক্রবর্তী, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই যুগে প্রথম শ্রেণি পাওয়া। সেই মাখন লাল চক্রবর্তীই আজকের অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিশ্চয় আরো অনেকের মাঝে এরকম আলো সেই সময় জাগিয়েছিলেন। সেই অরুণ কুমার বসাক স্যারও অনেক বছর যাবৎ অনেকের মাঝে আলো জ্বালিয়েছেন। এটাই হলো একজন ভালো শিক্ষক নিয়োগের সুফল। একজন মানুষ বহু মানুষ তৈরি করতে পারেন। আবার শিক্ষকের নামে অশিক্ষক নিয়োগ দিলে ঠিক তদ্রুপভাবে একজন খারাপ হাজার খারাপ বানাবে। এটাকে বলে ক্যাসকেডিং ইফেক্ট। তাই যারা খারাপ শিক্ষক নিয়োগ দেয়, তারা দেশ ও সমাজের শত্রু। এদের মুখে থুথু দিতে হবে।

যাহোক ফিরে আসি অরুণ কুমার বসাক স্যারের কথায়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো স্যারকে কাছ থেকে দেখার। আমি তখন সদ্য ইতালি থেকে কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সে ডিপ্লোমা করে দেশে ফিরেছি। এসেই দেখি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে বিজ্ঞপ্তি। যখন এখানে যোগ দিই অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক স্যার ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। দেখেছি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। সকাল ৭.৩০ থেকে ৮.০০ এর মধ্যেই উনি বিভাগে এসে পড়তেন আর ন্যূনতম সন্ধ্যা নতুবা বেশ রাতে বাসায় ফিরতেন। সকালে এসে নিজেই নিজের অফিস ঝাড়ু দিতেন। তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা মাত্র শুরু। উনাকে রাজশাহী থেকে আনাই হয়েছিলো বিভাগটাকে গড়ার জন্য। বসাক স্যারের গুনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অনেক দিক থেকে উনি অনন্য। হাঁটা, চলা, বাচনভঙ্গি, ব্যবহার সবকিছুতেই স্বকীয়তা। কারো সাথে মিলে না।

বসাক স্যারের চরিত্রের একটা দিক হলো কারো কোনো দিক পছন্দ না হলে সরাসরি কিছু বলতেন না। কিন্তু কোনো না কোনো পথ উনি বের করতেন এবং ধরিয়ে দিতেন যে ওটা ঠিক না। যেমন ওখানে শিক্ষকদের জন্য কমোডওয়ালা আলাদা একটা টয়লেট ছিলো। প্রায়ই দেখা যেতো কমোডে যার ওপর সবাই বসে সেখানে বড় বড় জুতার ছাপ। বিষয়টা প্রায়ই আমরা দুইয়েকজন স্যারের অফিসে আলাপ করেছি। ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনকও বটে। স্যার বিষয়টা নিয়ে আমাদের দুইয়েকজনের সাথে মজা করতেন। কিন্তু শিক্ষক বলে কথা। কারো দিকে অঙ্গুলি প্রদর্শন করা যাবে না। কাউকে এই বিষয়ে উপদেশও দেওয়া যাবে না। কারণ তাতে তিনি অফেন্ডেড ফিল করতে পারেন। শিক্ষক হলে আবার এই ফিলিংসটা টনটনে হয়ে যায়। তাই উনি ঠিক করলেন ছাত্রদের ল্যাবে এই বিষয়ে বলবেন কারণ ল্যাবে শিক্ষকরাও থাকেন। ঞযব ঃরঃষব ড়ভ যরং ষবপঃঁৎব ধিং: ঐড়ি ঃড় ঁংব নধঃযৎড়ড়স পড়সসড়ফব! এই বিষয়ে বোর্ডে ছবি একে বিশাল এক বক্তৃতা দিলেন। এরপর থেকে টয়লেটের কমোডে আর পায়ের ছাপ দেখিনি। উনার ক্লাস যারা করেছে তারা জানে কি ইউনিক ব্যক্তিত্ব! কি ইউনিক শিক্ষক! উনার সাথে পৃথিবীর অন্য কোনো শিক্ষকের লেকচারের স্টাইলের তুলনা চলে না। উনার মতো শিক্ষক এবং উনার গাইডেন্সের কারণে ওখানকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একটি সুনাম হয়েছিলো। তার প্রমাণ বর্তমান প্রজন্মের দুইতিনজন সেরা পদার্থবিদের নাম নিলে আমাদের তখনকার ছাত্র মাসুদুল হকের নাম অবশ্যই আসবে। সত্যি বলতে কি “ংঃৎড়হমষু পড়ৎৎবষধঃবফ ংুংঃবস” নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশি পদার্থবিদদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সেরা।

অবসরে গিয়েছেন অনেক দিন। ফিরে গেছেন নিজ বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহীতে। কিন্তু কাজ থেকে অবসর নেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগও উনাকে মূল্যায়ন করতে কার্পণ্য করেনি। তাইতো উনাকে প্রফেসর এমেরিটাস বানিয়ে সম্মানে রেখে দিয়েছেন। শুনেছি এখনো উনি পুরোনো অভ্যাস বজায় রেখে সকাল থেকে রাত অব্দি বিভাগেই থাকেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ আছে। আমাদেরও অনেক বাঘা বাঘা স্কলার ছিলেন এবং এখনো আছেন। আজ পর্যন্ত আমরা কাউকে সম্মান দিয়ে প্রফেসর এমিরেটাস বানাতে পারিনি। ওই ভিডিওতে বসাক স্যারের মুখেই শুনলাম পদার্থবিজ্ঞানে তিনিই একমাত্র এমেরিটাস অধ্যাপক। এতে প্রমাণিত হয় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধে উঠতে পারিনি। আমি নিজে দেখেছি যখনি এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তখনই শিক্ষকরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে। শুরু হয়ে যায় অমুককে করলে তমুককে করতে হবে ইত্যাদি রকম নোংরা তর্ক। অথচ একজন ভালো শিক্ষক ফবংবৎাব করে এবং না দেওয়া মানে হলো বঞ্চিত করা। এইদিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এটাই প্রমাণ করে ওখানে ভালো মানুষ এবং ভালো শিক্ষক আছে। সত্যিই তাই।

আমি আমার ক্লাসে বা ল্যাব ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের সব সময় বলি যে পড়া শেষে তারা যেন ফিরে তাকায় এবং নিজেকে প্রশ্ন করে : কি শিখলাম? পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিটা শব্দের একটা মেন্টাল পিকচার আছে। পড়তে হবে এমন ভাবে, শিখতে হবে এমন ভাবে যেন ফিরে তাকালে শব্দগুলোর মেন্টাল ইমেজ দিয়ে একটি মুভি হয়। ভিডিওতে দেখলাম অধ্যাপক মাখন লাল চক্রবর্তী ঠিক এমন কথাই স্যারকে বলেছিলেন। ইনফ্যাক্ট তার চেয়ে সুন্দর কথা বলেছিলেন। অধ্যাপক মাখন লাল চক্রবর্তী ‘দিন শেষে আমরা যেন কোনো একটি নীরব জায়গায় যেমন নদীর ধারে কিংবা পার্কে যাই এবং দিনভর যা শিখলাম সেগুলো যেন ফিরে দেখি’! এই জন্যই পৃথিবীর সকল ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো পরিবেশটাই পার্কের মতো। যেমন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। ওখানে আবার নদীও আছে। কি সুন্দর ংবৎবহব এবং ঃৎধহয়ঁরষ পরিবেশ তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। শুনেছি ভারতের ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স-এর পরিবেশও এইরকম মনোরম। আবার ভাবুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। আজ থেকে ৩০ বছর আগে অতো খারাপ ছিলো না। দিন যতো যাচ্ছে এটা একটি ইটের বস্তির মতো হয়ে যাচ্ছে। যে যেখানে পারে বিল্ডিং বানাচ্ছে। যে যখন ইচ্ছে উচ্চ ভলিউমে মিউজিক বাজিয়ে নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছে। বসাক স্যারের ওই ছোট সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে, বোঝার আছে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত