প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আয়বৈষম্য কি বাড়তেই থাকবে?

আবু তাহের খান : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুবাদে বাংলাদেশ কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশে (জনপ্রিয় আলোচনায় যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ) রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টি এ সময়ের একটি বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ। এ দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১৬১০ মার্কিন ডলার, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৩৬,৮৫০ টাকা, মাসপ্রতি ১১,৪০৪ টাকা। অবশ্য এসবই গড় হিসাব, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত দেশের শীর্ষ উপার্জনকারীদের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ আমাদের জানা নেই। আর আয়কর বিভাগের কাছে পেশকৃত রিটার্নে উল্লিখিত আয়ের পরিমাণই তাদের প্রকৃত আয় কিনা সেটাও আমরা নিশ্চিত নই। তবে নিম্নবিত্ত শ্রেণির বহু মানুষের আয় সম্পর্কেই আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। আর ঘোষণা অনুযায়ী কৃষির পরে দেশের বৃহত্তম শ্রমখাত তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি হচ্ছে ৫৩০০ টাকা, যদিও বহু শ্রমিক বাস্তবে এরচেয়েও অনেক কম পান। চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬৫৬ টাকা; আর এই শ্রমিকদের মধ্যকার ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির অস্থায়ী শ্রমিকদের মজুরি আরো কম এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। প্রায় একই অবস্থা মোটামুটি অন্যান্য খাতেও। পোশাককর্মী বা চা শ্রমিকের কথা পরিস্থিতি বোঝাবার জন্য এখানে উদাহরণ হিসেবে আনা হলো মাত্র।

উপরোক্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের চেয়ে অনেক কম। আর এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের যে ধারা, সেটিও জাতীয় আয়ের পরিবর্তনের ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৫৮৫ মার্কিন ডলার এবং একই সময়ে পোশাকখাতের শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ছিল ৩৮ মার্কিন ডলার। এক দশকের ব্যবধানে জনগণের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি পেলেও পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে দ্বিগুণেরও কম। অন্যান্য খাতে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির হার আরো কম। শ্রমিক ব্যতীত অন্যান্য নিম্ন আয়গোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি মোটামুটি একই রূপ।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির এ শ্রুতিতৃপ্ত অঙ্ক তাহলে কী অর্থ বহন করছে? স্পষ্টতই তা এ বাস্তবতাকেই নির্দেশ করছে যে, আয় বৃদ্ধির এ ঘটনাটি ঘটেছে মূলত উচ্চ আয়গোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রে যারা সংখ্যায় খুবই সীমিত। কিন্তু সংখ্যায় সীমিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের আয়ের স্ফীতি এতোটাই বিশাল যে, এই সীমিত সংখ্যকের আয়ের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্ন আয়ের মানুষের আয় গড় করার পরও তা মধ্যম আয়ের দেশের স্তরে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে এ তথ্য সম্পদের দুই বিপরীতমুখী মেরুকরণকেও নির্দেশ করছে বৈকি, যার আওতায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির মন্থর গতির বিপরীতে বিত্তবান শ্রেণির সম্পদের দ্রুত প্রসার ঘটছে। আর এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সমাজে সম্পদ-বৈষম্য দিনে দিনে আরো বাড়তেই থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সম্পদের উপরোক্ত মেরুকরণের পেছনে মূলত কাজ করছে এক ধরনের শ্রমশোষণ।

শ্রমশোষণের প্রসঙ্গ ওঠতেই সহজ উদাহরণ হিসেবে আমরা পোশাকখাত নিয়ে আলোচনা করি। অর্থনীতির বৃহত্তম শ্রমঘন খাত হিসেবে পোশাকখাতের মজুরি নিয়ে সর্বাগ্রে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে যে, শ্রমশোষণ শুধু পোশাকখাতের নয়, অন্যান্য খাতেও রয়েছে এবং এসবের মধ্যকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এরচেয়েও খারাপ। আর এসবের মধ্যে সর্বাধিক মানবেতর পরিস্থিতি বিরাজ করছে চা বাগান ও চা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, চালকল, রাবার শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প ও জাহাজভাঙ্গা শিল্পে। অবাক হবার মতো তথ্য এই যে, এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের গড় মাসিক মজুরি দু’হাজার টাকারও কম মাথাপিছু মাসিক জাতীয় গড় আয়ের এক-পঞ্চমাংশেরও নিচে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে আয় বৃদ্ধির এ বৈষম্যমূলক ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

শেষোক্ত প্রশ্নের জবাব খুঁজতে প্রথমেই সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির উপর উল্লিখিত বৈষম্যমূলক আয় বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়াসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এর ফলে : ১) অস্বচ্ছ পন্থায় রাতারাতি অর্থ উপার্জনকারীদের মধ্যে যুক্তিহীন, অর্থনৈতিক ও লোকদেখানো ভোগের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে এবং এর পারিপার্শ্বিক প্রভাবে মধ্য বা নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যেও এইরূপ ভোগের প্রবণতা দৃষ্টিকটুরকমভাবে জেকে বসেছে সে ভোগের জন্য তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ না থাকা সত্ত্বেও। আর এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্য ও নিম্নবিত্তের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের বিশেষত তরুণদের মধ্যেও পরিশ্রম না করে সংক্ষিপ্ত পন্থায় রাতারাতি বিত্তবান হবার মানসিকতা প্রবল হয়ে ওঠছে। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও অনেকাংশে রাতারাতি বিত্তবান হয়ে ওঠার আকাক্সক্ষা থেকে উৎসারিত বৈকি!

এটা এখন সর্বজনবিদিত তথ্য যে, পুঁজির একচ্ছত্র শাসনে সিংহভাগ বিশ্বসম্পদের মালকানা যেমনি মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে, তেমনি এই বাংলাদেশেও অতি স্বল্পসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রের সিংহভাগ সম্পদকে কুক্ষিগত করে নিয়েছেন। এবং অভিযোগ রয়েছে যে, কুক্ষিগত এই বিশাল সম্পদের একটি বড় অংশই অনৈতিক পন্থায় উপার্জিত। আর অনৈতিক পন্থায় যারা উপার্জন করেন, অর্থাৎ ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা নৈতিক পথ ধরে এগুবেন এমনটি আশা করা অবান্তর। এবং বাস্তবে তা ঘটছেও না। ফলে নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত পন্থায় সম্পদ আহরণকারীরা সমাজে নতুন করে নানাবিধ অনৈতিক অনুষঙ্গের জন্ম দিচ্ছেন এবং এর ফলশ্রুতিতে সমাজের সামগ্রিক গুণগত মানও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সমাজ থেকে সাধারণ মানবিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদী সত্ত্বা, নিরাপোষকামীতা, ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, পরোপকারিতা ইত্যাদি হারিয়ে যাবার পেছনে এই নৈতিকতা বর্জিত সম্পদশালীদের যথেচ্ছ জীবনাচরণ বহুলাংশে দায়ী বৈকি!

এক সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতেন শিক্ষিত, মেধাবী ও সজ্জনেরা। আয় বৃদ্ধির সুবাদে (আয় বৃদ্ধিকে দোষ দেয়া হচ্ছে না) সে নেতৃত্ব এখন যথেচ্ছ পন্থায় সম্পদ আহরণকারীদের হাতে। জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার পরিষদ, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী ও গোত্র সর্বত্রই নেতৃত্ব এখন বিত্তবানদের হাতে তা সে বিত্ত বৈধ বা অবৈধ যেকোনো পন্থাতেই আসুক না কেন। রাজনৈতিক দলগুলোও এখন বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে সম্পদশালীদের কাছে জিম্মি। জাতীয় বা অন্য যেকোনো নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সম্পদশালী হওয়া। ১৯৫৪ সনে তৎকালীন আইন পরিষদে ব্যবসায়ী সদস্যের সংখ্যা ছিল ৪ শতাংশ। এখন তা ৬৩ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এই ৬৩ শতাংশের অধিক সংখ্যক সদস্য মিলে যখন সংসদে কোনো আইন করেন বা কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা বিত্তহীনদের বা নিম্নবিত্তের পক্ষে যাবে এমনটি ভাবা সত্যি কঠিন।
সমাজ থেকে আয় বৈষম্য রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে রাষ্ট্রের আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালাকে এমনভাবে সাজানো যাতে তার ফলশ্রুতিতে নিম্নআয়ের মানুষ বাড়তি সুবিধা পায় এবং বিত্তবান তার আয়ের একাংশ রাষ্ট্রকে রাজস্ব বা অনবিধ পন্থায় পরিশোধে বাধ্য হয়। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই কি ঘটছে না? সমাজের বিভিন্ন বিত্তশালী গোষ্ঠী বাজেটের আগে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে নিজেদের সকল আর্থিক সুবিধা অগ্রিম আদায় করে নেন, জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতা যার আলঙ্করিক ঘোষণা মাত্র। কিন্তু অসংগঠিত কৃষক, দুর্বল শ্রমিক শ্রেণি, নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষ বাজেটে এদের স্বার্থ তুলে ধরার কেউ নেই। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। বাজার অর্থনীতির কথা বলে কৃষিখাতের ভর্তুকি ক্রমাগত ওঠে গেলেও বিত্তবান শ্রেণির স্বার্থের পাহারাদার রাষ্ট্র নানাখাতে নগদ ভর্তুকি দিয়েই চলেছে এবং কোনো কোনো খাতে ফি বছর আবার তা বাড়ছেও।

আয়বৈষম্য বৃদ্ধির দুর্ভাগ্যজনক যে অর্থনৈতিক প্রবণতা বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে, তা থেকে বেরুনো সত্যি কঠিন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য যে, তা থেকে বেরুতে না পারলে সামাজিক ক্লেদ ও অনাচার দিনে দিনে আরো বাড়বে বৈ কমবে না। তা আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজে কষ্ট, ক্লেদ, দুর্ভোগ, অনাচারই যদি বাড়ে, তাহলে বর্তমানের নিম্নমধ্যম বা ২০২১ সালের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কী অর্থ খুঁজে পাবে? লেখক : পরিচালক, ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট সেন্টার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। সম্পাদনা : রেজাউল আহসান