প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিশুর বেড়ে ওঠায় মায়েদের করণীয়

ড. মিশু তালুকদার : চেম্বারে বা হাসপাতালে প্রায়ই কিছু প্রশ্ন মায়েরা করে থাকেন, স্যার, আমার বাচ্চা কিছুই খায় না! ওকে কী খাওয়াতে পারি? আমার বাচ্চা একদম শুকিয়ে যাচ্ছে! স্যার, ওর তো এখন ৬মাস বয়স, ওকে কি সেরিলাক বা পটের দুধ খাওয়ানো যাবে??

অনেক দিন যাবৎ ভাবছিলাম, শিশুর খাবার নিয়ে একটা কিছু লিখি,

শিশুর খাবার নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা বলতে পারি, চাইলে শিশুর খাবারকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করে নিতে পারি।

১. জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত

২. শিশুর ৬ মাস বয়সের পর

১. জন্মের ৬মাস পর্যন্ত

এসময় শুধু মায়ের দুধ খাওয়ালেই চলে। তবে মায়ের দুধ খাওয়ানোর কিছু নিয়ম অবশ্যই আছে। মা অবশ্যই বসে দুধ খাওয়াবেন। শুয়ে দুধ না খাওয়ানোই ভালো। খাওয়ানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে, বাচ্চা যতোটা সম্ভব মায়ের কাছাকাছি থাকবে এবং অন্ততপক্ষে ১৫-২০ মিনিট ধরে দুধ খাবে। আর দুধ খাওয়ানোর পর পিঠে একটু মালিশ করে বাচ্চার ঢেঁকুড় তুলে নিলে ভালো হবে। এতে বাচ্চার পেটে গ্যাস কম হবে।

কয়েকটা প্রশ্ন মায়েরা এসময় করেই থাকেন, আমি বাচ্চাকে অন্য কিছু খেতে দিতে পারবো কিনা, আমার বাচ্চা তো ঠিকমতো মায়ের দুধ পায় না! এ ব্যাপারে আমি বলি, মায়ের দুধ ছাড়া শিশুকে একফোঁটা পানিও খাওয়াবেন না। আপনার বাচ্চা যদি মায়ের দুধ খেয়ে দৈনিক ৬বার প্রস্রাব করে তা হলে বুঝবেন ও ঠিকমত মায়ের দুধ পাচ্ছে।

তবে এই মুহূর্তে চাকরিজীবী মায়েদের নিয়ে আমরা সমস্যার মুখোমুখি হই বেশি! কারণ তাদের দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে থাকতে হয়! সেক্ষেত্রেও মায়ের দুধ খাওয়ানোর ওপর জোর দিতে বলি। আপনি চাকরিতে যাবার আগে শিশুকে দুধ খাইয়ে যাবেন, যতোটুকু সম্ভব ওর জন্য দুধ রেখে যাবেন। রেখে যাওয়া মায়ের দুধ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাল থাকতে পারে! ভালো রাখার জন্য কোনো ফ্রিজে রাখা লাগে না বা সেদ্ধ করারও প্রয়োজন নেই। চাকরি থেকে ফিওে আসার পর বাচ্চাকে আবার বেশি বেশি করে মায়ের দুধ খাওয়ান। তবে বাচ্চাকে দৈনিক ৮-১০ বারের বেশি দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ঐ সমীকরণটা মনে রাখলেই হবে,

পর্যাপ্ত মায়ের দুধ = দৈনিক ৬বার প্রস্রাব।

যদি দেখেন ৬ বার প্রস্রাব করা সত্ত্বেও বাচ্চার ওজন ঠিকমতো বাড়ছে না অথবা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে, তা হলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তারপরেও বাচ্চাকে ফরমুলা দুধ ধরিয়ে দেবেন না!

২. শিশুর ৬মাস বয়সের পর

বাচ্চাকে ৬মাস বয়সের পর মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দিতে হয়। আসলে ৬মাস পর মায়ের দুধ শিশুর খাদ্যচাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। তাই বাড়তি খাবার দেয়া লাগে। বাড়তি খাবার বলতে অনেক মা ফরমুলা দুধ বা সেরিলাক দুধকে বোঝেন, কিন্তু বাড়তি খাবার বলতে ঘরের খাবারকেই বোঝানো হয়।

অনেকেই সন্দিহান থাকেন, শিশুকে এইসময় কী খাওয়াবেন? আমরা বাংলাদেশি, তাই বাংলাদেশি মায়েদেরকে শিশুর প্রথম বাড়তি খাবার ভাত আর ডাল দিয়ে শুরু করতে বলি। মায়ের দুধ খাওয়ার সাথে সাথে সাথে শিশু দৈনিক আরো ৫-৬ বার খাবে। ৫-৬ বার খাবারের মধ্যে দিনে ২-৩ বেলা ভাত আর ডাল মিশিয়ে খাবে, সাথে তিনবেলা কলা, ডিম বা আলুসেদ্ধ করে করে খাওয়াতে পারেন। ভাত রান্না করতে চাইলে যে কোনো চাল হতে পারে, ডালের জন্যও যে কোনো ডালই হতে পারে। প্রথমে ভাত আর ডাল কচ্লে শিশুকে খেতে দিন, কোনোভাবেই ব্লেন্ড করে খেতে দেবেন না। মনে রাখবেন, আপনার শিশু কিন্তু প্রথমবার শক্ত খাবার মুখে নিচ্ছে।

তাই সে বুঝতে পারবে না, খাবারগুলো সে মুখের ভেতরে নিয়ে যাবে, নাকি বাইওে বের করে নিয়ে আসবে? মাকে বুঝতে হবে, খাবারটুকু জিহ্বায় লাগাতে পারলেই হলো। এভাবে ভাত আর ডাল কচলে শিশুকে ৫-৭  দিন খেতে দিন। এভাবে ও যখন অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তখন সেই ভাত আর ডালের সাথে মাঝে মাঝে সবজি, মাছ ও মাংস মিশিয়ে খাওয়াবেন। সবজির মধ্যে মিষ্টি কুমড়ো, আলু, বরবটি যে কোনোটি হতে পারে। আর যখন সে প্রত্যেক খাবারের সাথে পরিচিতি হয়ে যাবে, তখন তাকে খিচুড়ি বানিয়ে খেতে দেবেন। খিচুড়ি বানানোর ২ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে খাওয়াতে হয়, কখনও বাসি খিচুড়ি বাচ্চাকে খেতে দেয়া উচিত নয়।

এই খিচুড়ি বানানোর প্রক্রিয়াটি করতে একমাস, দুমাস, তিনমাসও লাগতে পারে। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।  খেয়াল রাখতে হবে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বাচ্চাকে বাড়তি খাবার দেয়া যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। খিচুড়ি খাওয়ানোর সাথে শিশুকে আপনি মাঝে-মধ্যে আলুসেদ্ধ বা ডিমসেদ্ধ করেও খাওয়াতে পারেন। তবে প্রথমে ডিমের কুসুম, তারপর সাদা অংশ খাওয়াবেন। তাকে কলাও খাওয়াতে পারেন। সেদ্ধ করে বা পাকা কলা দুভাবেই বাচ্চাকে দিতে পারবেন। আরেকটু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাকে নুডুলস খাওয়াতে পারেন। নুডুলসে পর্যাপ্ত তেল আর ডিম মেশাতে পাররেন, তবে অবশ্যই মশলা। সে-ক্ষেত্রে ঘরের মশলা হলেই ভালো। এখন প্রশ্ন আসবে, খিচুড়ি কতোটুকু খাবে? খিচুড়ি খাবে ঘরে মেহমানদারি করার জন্য আমরা যে মিষ্টির বাটি ব্যবহার করি, তার অর্ধেকটা (মানে আধপোয়া)। আস্তে আস্তে পরিমাণটা বাড়াতে থাকবেন। একটি ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে, এসময় শিশুকে পানি খাওয়াতে হবে। পানি অবশ্যই চামচ দিয়ে খাওয়াবেন বা টিউব দিয়েও খাওয়াতে পারেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ফিডার দিয়ে নয়। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশু যখন গ্লাস ধরতে পারবে, তখন সে তাতেই নিজে নিজেই পান করতে পারবে।  ফলমূলের মধ্যে যেকোনো ফলমূলই খাওয়ানো যাবে। তবে কলা, পেঁপে ও আমÑএই তিনটি ফলের আসলে কোনো জুড়ি নেই। আপেল, কমলা, আঙুর না খাওয়ানোই ভালো। কারণ এসবে প্রায়ই বাচ্চাদেও পেটখারাপ হয়।

এবার আসি কোন্  কোন্ খাবার বাচ্চাকে এই সময় একদমই দেয়া উচিত নয়। সেগুলো হচ্ছে, গরুর দুধ, সুজি, সাগু, বার্লি, চালের গুঁড়ো, ফরমুলা দুধ, সেরিলাক, হাঁসের ডিম ও সাগর কলা। আপনি মুরগির ডিম বা কোয়েল পাখির ডিম দিতে পারবেন কিন্তু হাসের ডিম দেবেন না। বাংলা কলা দিতে পারবেন কিন্তু সাগর কলা না দেয়াই উত্তম।

মায়েদের মধ্যে গরুর দুধ খাওয়ানোর জন্য একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। পায়েস করে, সুজির সাথে মিশিয়ে তারা মনের মাধুরি মিশিয়ে গরুর দুধ খাওয়াতে পছন্দ করেন। এখন পর্যন্ত খুব কম শিশুকে দেখেছি, যারা গরুর দুধ খায় আর অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে আসে না!

সবসময় ঘরের হাঁড়ির খাবারে প্রাধান্য দেবেন বেশি। যেই আপনি বাইরের খাবারের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, দেখবেন, শিশুদের নিয়ে আপনাকে দোজখখানায় (ডাক্তারের চেম্বার) যেতে হচ্ছে!

সবশেষে কিছু টিপস্

১. বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় কখনো জোর করবেন না।

২. পরিবারের সকলে যখন খেতে বসবেন, তখন শিশুকে সবার সাথে বসিয়ে খাওয়াবেন।

৩. টিভি দেখিয়ে, মোবাইলে ভিডিও দেখিয়ে শিশুকে খাওয়াবেন না।

৪. কখনোই একই প্লেট বা বাটিতে করে বাচ্চাকে খাওয়াবেন না। তা হলে কয়েকদিন পরই দেখবেন বাচ্চা পেটে আর গ্যাস হলেই দৌড়াচ্ছে আর পরিবারের সকলে তার পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে!

৫. সবসময় একই খাবার, একই সময়ে দেবেন না। মনে করেন, আজকে সকালে ওকে একটা কলা খাওয়ালেন, তারপরের দিন সকালে ওকে একটি ডিম সেদ্ধ করে খাওয়ান। দেখবেন ওর মুখের রুচি নষ্ট হচ্ছে না।

শিশুকে খাওয়ানো আসলেই কঠিন ব্যাপার। কিন্তু এই কঠিন ব্যাপারটিকে আমরা আরো কঠিন কওে ফেলি, যখন শিশুর খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আমরা এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করি। আসলে আমাদের মায়েরা এক একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিনিয়ত তারা সংগ্রাম করেন তাদের শিশুর সুস্বাস্থের জন্য। সবসময় ঘরের খাবারকে প্রাধান্য দিন। দেখবেন শিশুকে খাওয়ানোটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। [সংগৃহীত]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ