প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণতন্ত্রের মলাটে গোয়েবলস

কাকলী সাহা, কলকাতা: গত ২৬শে মে ২০১৮ মোদী সরকার চার বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনের জন্য তাদের অভিমুখ ‘শুদ্ধ মানসিকতা, সঠিক উন্নতি’। ২০১৪ সালে তাদের যেমন শ্লোগান ছিলো ‘আবকে বার মোদী সরকার’; একইভাবে ২০১৯-এ তাদের নতুন শ্লোগান দেয়া হচ্ছে ‘২০১৯-এ আবার মোদী সরকার’।

তিন বছরের মাথায় গোটা থেকে আসা দলের মুখপাত্রদের ক্লাস নিয়ে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছিলেন, ২০১৯ সালেও সফল হতে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সরকারের তিন বছরের সাফল্যের প্রচার করুন। তাঁর দাওয়াই, মোদী সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে বিরোধীদের হল্লার জবাবে বেশি আক্রমণাত্মক হওয়ার দরকার নেই, সহজ জবাব হলো পরিসংখ্যান। অতীতে কংগ্রেস সরকার যা করেনি, মোদী সরকার তা করেছে, এই প্রৃচারই যথেষ্ট। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে সরকারের সাফল্যও তুলে ধরা যাবে এবং বিরোধীদেরও মোকাবেলা করা যাবে।

ইতোমধ্যে ‘আচ্ছে দিন’-এর চার বছর পার হয়ে গেছে মোদী সরকারের। সম্প্রতি রাইট-টু-ইনফরমেশন (জঞও) আইনে পাঠানো চিঠি এবং মুম্বাইয়ের সমাজকর্মী অনিল গলগলি কেন্দ্রীয় ব্যুরো অব আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন (ইঙঈ)-এর কাছে যে চিঠি দিয়েছেন, তার উত্তরে জানা গেছে, এই চার বছরে বিজ্ঞাপন ও প্রচারের পেছনে ৪,৩৪৩.২৬ কোটি টাকা খরচ করেছে কেন্দ্র। যদিও ‘পেড নিউজ বিতর্ক এবং দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ২০১৭ সালে বিজ্ঞাপনে ও প্রচারে তারা খরচ করেছে মাত্র ৩০৮ কোটি টাকা। বিওসি-র চিঠি অনুযায়ী মোদী সরকার ২০১৪-এর জুন থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের পেছনে খরচ করেছে ৯৫৩ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়ায় ৪২৬.৮৫ কোটি টাকা ও ইলেকট্রনিক মিডিায় ৪২৪.৮৫ কোটি টাকা। আর জনগণের কাছে সরাসরি গিয়ে প্রচারে খরচ হয়েছে ৭৯.৭২ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট খরচ হয়েছিলো ১,১৭১ কাটি ১১ লক্ষ টাকা, যার সিংহভাগই

গিয়েছিলো ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। তার পরিমাণ ৫৪১.৯৯ কোটি টাকা; আর প্রিন্ট মিডিয়ায় ৫১০.৬৯ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ সালে প্রিন্ট মিডিয়ার খরচ সামান্য কমে ৪৬৩.৩৮ কোটি টাকা কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বরাদ্দ বেড়ে হয়েছিলো ৬১৩.৭৮ কোটি এবং সরাসরি প্রচারে ১৮৫.৯৯ কোটি টাকা অর্থাৎ খরচ পৌঁছায় ১,২৬৩ কোটি ১৫ লক্ষ টাকায়।

এই পরিসংখ্যান কি আমাদের ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য করে না? কোথাও কি মিল খুঁজে পাওয়া যায় না প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির সঙ্গে? সেই বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই পরাশক্তিগুলো প্রপাগান্ডার এই গূঢ় রহস্যের কথা টের পেয়ে গিয়েছিলো। সাম্রাজ্যবাদের পতন তখনো শুরু হয়নি, কিন্তু সিংহাসনে আসীন রাজা-বাদশারা ঠিকই টের পাচ্ছিলেন, সামনে এমন দিন আসছে যখন বন্দুকের নল দিয়ে মানুষকে শোষণ করা যাবে না, তাদেরকে সকাল-বিকাল আনুগত্যের বড়ি গিলিয়ে শান্ত রাখতে হবে।

তখন থেকেই ব্রিটেনসহ প্রভাবশালী শক্তিগুলো প্রচারযন্ত্র নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে। সেটা তিরিশের দশকের ইউরোপে, ততোদিনে হিটলারের উত্থান হয়ে গেছে, তার নেতৃত্বে নাৎসী পার্টি বসেছে ক্ষমতায়। ধীরে ধীরে বহির্বিশ্বে প্রভাব খাটাতে শুরু করেছে জার্মানি। ঠিক এমন একটা সময় ১৯৩৩ সালে প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে হিটলারের মন্ত্রীসভায় যোগ দেন জোসেফ গোয়েবলস। এই প্রপাগান্ডা বিভাগের দায়িত্ব ছিলো প্রধানত দু’রকম। এক. দেশের ভেতরে হিটলারের কট্টর নাৎসীবাদের প্রতিষ্ঠা। দুই. দেশের বাইরে এই নাৎসীবাদকে খুব মহান আদর্শের মোড়কে মুড়িয়ে তা প্রচার করা।

দুটো দায়িত্বই তিনি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন। তবে প্রথম দায়িত্বটা, অর্থাৎ দেশের ভেতরে নাৎসীবাদের প্রসার করতে গিয়ে তিনি যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সেটা যেমন হিটলারকে ‘ভগবান’ বানাতে সক্ষম হয়েছিলো, তেমনই আজও প্রপাগান্ডা থিওরির গুরু ও একমাত্র পথিকৃৎ ‘গোয়েবলস’ই।

যদিও হিটলারের নাৎসীপার্টি বিপুল জনসমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় আসে কিন্তু তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মতো স্থায়ী কোনো ম্যান্ডেট ছিল না। আর বিরোধী পক্ষের অবস্থান ছিলো বেশ পোক্ত। হিটলার এসব খুব ভালো করেই জানতেন। তাই প্রথমেই যেটা করা হলো, বন্ধ করে দেয়া হলো বিরোধী দলের সমস্ত প্রচার-প্রকাশনা। এরপর নাৎসীবাদী পত্রিকাগুলো রেখে একে একে বন্ধ করে দেয়া হয় বাদবাকি পত্রিকাগুলোও। পুড়িয়ে দেয়া হয় ইহুদী কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সমস্ত অ-নাৎসীবাদী বই, শিল্পকর্ম ও নানা কীর্তি। আর সেই খালি জায়গায় নাৎসীবাদে উদ্বুদ্ধ কবি-সাহিত্যিকরা নতুন উদ্যমে লিখতে শুরু করেন কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস। এমনকি বাচ্চাদের জন্য মজার কমিকসও ছাপা হতে শুরু করে। আর সব কিছুতেই নাৎসীব্যবস্থাকে স্বর্গরাজ্য ও হিটলারকে ভগবান করে দেখানোর প্রচেষ্টা হয় অতি সূক্ষ্মভাবে। তাঁর নীতিটা ছিলো খুবই স্পষ্ট, খুবই সিম্পল। দেশের জনগণের খুব বড় একটা অংশ, যাদের রাজনীতি নিয়ে তেমন মাথাব্যাথা নেই, তারা পত্র-পত্রিকা পড়েন, নিজেদেরকে রাজনীতির নোংরা খেলার বাইরে বলে মনে করেন ও প্রচার করেন, অথচ দেশ ও রাজনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন, ভোটটাও দেন, আর সবচেয়ে বেশি যেটা করেন তা হলো, বিরাট অংশের জনগণকে নানাভাবে প্রভাবিত করেন। সেই বড় অংশটাকে ধরতেই তাঁদের যতো প্রচেষ্টা। আর সেটা করতে বেশি বেগ পেতেও হয় না।

এছাড়া গেস্টাপো নামে একটি পুলিশবাহিনী গড়া হলো, যাদের কাজ সক্রিয় নাৎসীবিরোধী অংশকে খুঁজে বের করা। এবং তাদেরকে বন্দি করা, গুপ্তহত্যা করা, নানা অজুহাতে চরম শাস্তি দেয়া অথবা মানুষের চোখে নানা ভাবে হেয় করা। নতুবা ইহুদি পরিবারের সদস্য বলে, নয়তো ইহুদি তোষণকারী আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর নৃশংস অত্যাচার করা; যাতে নাৎসীবিরোধিতার কেউ দুঃসাহস দেখাতে না পারে।

গোয়েবলসের সবচেয়ে ‘মহান’ কীর্তি, দেশের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ অংশকে তাদের বশে রাখতে বাজারে আনা হলো সাধারণ রেডিও। আর তাতেই নিয়মিত হাজির হতে শুরু করলেন জার্মানির নয়নের মণি ‘ফুয়েরার’ তথা মহামান্য হিটলার। তখনো রেডিও দেশের সকল মানুষের নাগালের বাইরে হওয়ায় একটা সমাধান দেয়া হলো, রাস্তার মোড়ে মোড়ে রেডিও ফিট করা হলো, আর সব রেস্টুরেন্ট, বার আর পাবলিক প্লেসে রেডিও বাজিয়ে ফুয়েরার-এর ভাষণ শোনানো হতে লাগলো। তবে গোয়েবেলস এতেও সম্পূর্ণ তুষ্ট নন। তিনি জার্মানির বড় রেডিও নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান আর বিজ্ঞানীদের সাথে ঘন্টাখানেক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ঘোষণা করে দিলেন, জার্মানি এমন এক রেডিও নির্মাণ করতে যাচ্ছে, যেটা সর্বসাধারণের ক্রয়যোগ্য। তার নাম দেয়া হলো, ‘চবড়ঢ়ষবং জবপবরাবৎ’। ১৯৩৩ সালের শেষের দিকেই তা বাজারে আসে, যার দাম ছিলো ৪০ মার্ক। রেডিওটির মডেল নাম্বার দেয়া ছিলো ৩০১; অর্থাৎ ৩০শে জানুয়ারী নাৎসী পার্টির ক্ষমতায় আসার দিন। অন্য সাধারণ রেডিওতে যেমন লংওয়েভ, শর্ট ওয়েভ ধরার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু এই পিপলস রিসিভারে তা ছিলো না, এখানে শুধুমাত্র লংওয়েভ ধরার নভ ছিল। আর ডায়ালে কেবল জার্মানির স্টেশনগুলো মার্ক করা ছিলো। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই রেডিও জার্মানিকে গ্রাস করে। আর বাইরের জগতের সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তাধারা, মুক্তচিন্তা, সঙ্গীত সবকিছু বাদ দিয়ে মানুষ বাধ্য হলো শুধু ‘ফুয়েরার’ ভাষণ শুনতে। জার্মানির নাগরিকরা পরিণত হতে থাকলো চোখ-কানঅলা অন্ধ-কালা-বোবা জাতিতে। গোয়েবলসের নাৎসী বিপ্লবের বাতাস ধরে রাখার অন্যতম উল্লেখযোগ্য থিওরি ছিল, একটা মিথ্যা দশবার বলা হলে সেটা সত্যের মতো শোনায়।

হিটলারের ক্ষমতা ধরে রাখতে হেন কোনো পদ্ধতি নেই, হেন কোনো প্রযুক্তি নেই, যা হিটলার বা গোয়েবলস জার্মানির জনগনের ওপর প্রয়োগ করেননি। কিন্তু তবু শেষরক্ষা হয়নি। হিটলারের পতন হয়েছে, নাৎসীবাদ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সারা পৃথিবীতে। তবে গোয়েবেলসের উদ্ভাবিত প্রপাগান্ডানীতি অনুসৃত হচ্ছে আজও। আধুনিক প্রিন্ট মিডিয়া বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিঃসন্দেহে পিপলস রিসিভারের তুলনায় বহুগুণ বেশি উন্নত, শক্তিশালী ও সুকৌশলী। অবশ্য স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ধরে রাখতে তাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি নেই। সন্দেহ নেই, ২০১৪ সালে মোদী সরকার গঠনের স্বার্থে তৈরি শ্লোগানটি স্বাধীন ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে যুগান্ত সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে গিয়ে এই গোয়েবেলসীয় কৌশল কি আবারো কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠবে? নাকি হলুদ সাংবাদিকতা, পেইড নিউজ, প্রপাগান্ডা, মোদী ম্যাজিক, ‘ফুয়েরার’ ভাষণ তথা ‘মন কি বাত’ সবকিছুকে ছাপিয়ে মুক্তচিন্তার ঝড় উঠবে ২০১৯ সালে? প্রপাগান্ডার দাসত্বমুক্ত হতে পারবে কি ভারতীয় গণতন্ত্র, নাকি প্রায় শতবর্ষ পরেও গোয়েবলসের থিওরিই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের ধ্বজা বহন করবে? এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ