প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জানুয়ারিতে নির্বাচন!

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের রাজনীতিতে বইছে এখন পরিবর্তনের হাওয়া! বরফ গলতে শুরু করেছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে ক্ষমতাসীনরা বেশ নমনীয়। গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক ভূমিকার বদলে সিনেমার এক্সট্রাদের মতো অন্যের নেক-নজরের জন্য মুখিয়ে থাকলেও মাঠের বিরোধী দলগুলো এখন মিটিং, সভা-সমাবেশ করছে।

দেশি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি রাখায় সব মহলই চাচ্ছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অপরিহার্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেমন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে; তেমনি মাঠের বিরোধী দল বিএনপিও ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন’ দাবি থেকে সরে এসে ‘নিরপেক্ষ সরকারের’ দাবী করছে। আবার দশম সংসদের ২২তম অধিবেশনের মধ্যদিয়ে ‘অধিবেশন’ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটা সংক্ষিপ্ত করে ২১ অক্টোবর ২৩তম অধিবেশনের দিন ধার্য করে রাখা হয়েছে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বৈঠক কক্ষে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়কমন্ত্রী জেরেমি হান্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সেখানে বলেছেন, আমরা চাই অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। একাদশ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ অবস্থায় কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টে যাবে রাজনীতির দৃশ্যপট। বর্তমান সংসদের ২১ অক্টোবর আহুত ২৩তম অধিবেশন থেকে আসতে পারে নুতন বার্তা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর দশম সংসদের এমপিরা শপথ গ্রহণ করেন ৯ জানুয়ারি। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২৮ জানুয়ারী। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। নির্বাচন কমিশন জানুয়ারি মাসেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। সংসদ সচিবালয় সুত্রে জানা গেছে ২১ অক্টোবর সংসদের অধিবেশন শুরু হয়ে চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। আরপিও অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন চলার সময় নির্বাচনকালীণ সরকার গঠন এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা কোনোটাই সম্ভব নয়। ফলে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে নভেম্বরে। গতকাল দিনাজপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচন করতে হবে ৩১ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে। এরমধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২৭ ডিসেম্বর তারিখে নির্বাচনের যে কথা বলা হয়েছে তা একজন সিনিয়র মন্ত্রী (অর্থমন্ত্রী) বলেছেন। উনি বয়স্ক মানুষ ও সিনিয়র মানুষ বলেই বলে ফেলেছেন। তার এটা বলা উচিত হয়নি; আপনারাও ভুলে যান। জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সংসদের ২৩তম অধিবেশন খুবই তৎপর্যপূর্ণ। ওই সময় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল মাঠে আন্দোলনে থাকবে। বি. চৌধুরী-ড. কামাল হোসেন-মির্জা ফখরুলের যৌথ নেতৃত্বের আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের নজরে আসবে। তখন জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। সংসদে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের রয়েছে। দেশবাসীকে যেমন অবাক করে দেয়া হয়েছিল ২২ বছর আগে সংবিধানের ত্রায়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।

জানা যায়, ২২তম অধিবেশনের মাধ্যমে দশম সংসদের ‘অধিবেশন শেষ’ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ২৩তম অধিবেশনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং ২১ অক্টোবর অধিবেশন শুরুর তারিখ চূড়ান্ত হয়। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের উদাহরণ দেখিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওই অধিবেশনে যেমন সব মহলকে অবাক করে দিয়ে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বিল পাস করা হয়; তেমিন আসন্ন অধিবেশনে হয়তো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। কারণ শেখ হাসিনা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রজ্ঞাবান নেত্রী। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁর নেতৃত্বের খ্যাতি রয়েছে। তিনি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেন ক্ষমতার জন্য নয়। মানুষের ভোটের অধিকার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য তিনি লড়াই করেছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রশংসা পেয়েছেন তা সত্যিই অবাক করার মতো। পররাষ্ট্র নীতিতে সাফল্য দেখিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে একই সঙ্গে তিনি ভারত আর চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে বহু ক্ষেত্রে তিনি এখন উদাহরণ। এ জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি তার পক্ষ্যে অসম্ভব নয়।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে কী দেখি? বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা বক্তব্য, বিবৃতিতে যেসব যুদ্ধংদেহী কথা বলছেন; প্রতিপক্ষকে আক্রমন করে শব্দ চয়ন করছেন; তার সঙ্গে কী ১৯৯৬ পূর্ববর্তী সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্যের তেমন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়? তখন ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলতেন; এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও সেই ভাষা প্রয়োগ করছেন। এতে আবার বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগী বামদলের মন্ত্রীরা কয়েক ডিগ্রী এগিয়ে। ওই সময়ের (১৯৯৬) বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানের মাঠের বিরোধী দল বিএনপির নেতাদের কথাবার্তায় অভিন্ন সুর। আওয়ামী লীগের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ দাবী নাকচ করে দিয়ে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংবিধানের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে বলেছিলেন ‘শিশু আর পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতারা একই সুরে এখন বলছেন ‘সংবিধানের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়’। প্রশ্ন হলো ’৯০ আন্দোলনে তিন জোটের রুপরেখা এবং প্রধান বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয়া এবং পরবর্তীতে তাঁর প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাওয়া কী সংবিধানে ছিল?

২২ বছর আগের ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে আমরা কী দেখি? বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি পায় ২৭৮টি আসন। নির্বাচিত সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হয় ১৯ মার্চ। অধিবেশন স্থায়ী ছিল মাত্র ৪ কার্যদিবস তথা ২৫ মার্চ ১৯৯৬ পর্যন্ত। নির্বাচনের দেড় মাসের মাথায় ৩০ মার্চ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ১২ দিন। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবী, আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা এবং গণতন্ত্র-দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ওই সংসদে সংবিধান সংশোধন করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি’ বিল পাস করা হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী নামে পরিচিত ওই বিলটি পাস করা হয় ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ। সংবিধান সংশোধনের নিরপেক্ষ-নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার। ঐতিহাসিক বিলটি ২৬৮-০ ভোটি পাস হয়। প্রেসিডেন্টের অনুমোদন পায় ২৮ মার্চ।

ওই রাতের সংসদ অধিবেশনে ‘হাউজের চিত্র’ জানালেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির এমপি শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ত্রায়োদশ সংশোধনী তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিল পাস নিয়ে সারারাত এমপিদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও যুক্তিতর্ক হয়। ফজরের সময় বিলটি কন্ঠভোটে পাস হয়। পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস’। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া একাকার হওয়ায় সরকার চাপের মুখে পড়েছে। আগে ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানালেও এখন বি. চৌধুরী-ড. কামাল হোসেনকে তুলোধূঁনো করছে। সরকারের অবস্থা কার্যথ টালমাটাল। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য যদি ব্যপক পরিসরে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নামে; তাহলে সরকার আরো আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে যাবে। তখন সংসদের শেষ অধিবেশনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে’। একজন প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, শেখ হাসিনার পক্ষ্যে অসম্ভব কিছু নেই। তাঁর রাজনীতি এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ এবং দেশের আপামর জনগণের স্বার্থে এবং ইতিহাসে যায়গা করে নিতে সংসদের আসন্ন অধিবেশেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে তিনি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সূত্র : ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত