শেখ মিরাজুল ইসলাম : আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্রতম অংশ দর্শনের দোলকে সঞ্চারিত। মুখরিত আবেগের প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার গভীরে দর্শন তত্ত্বের ব্যবহারিক উপরি রূপ দৃশ্যমান। মানব মস্তিষ্কের স্নায়ু প্রতিনিয়ত উদ্দীপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত হয় নানামুখী ঘটনার আবহে। তার প্রতিক্রিয়া হৃদয় নামের সংবেদনশীল মাংসপেশীর ভিতর প্রাণ রসায়নে জারিত হয় মানব শরীর। নশ্বর-অবিনশ্বরতার সীমারেখা এই বেঁচে থাকার উপর নির্ভরশীল। দর্শন শাস্ত্রের মর্মকথার প্রবাহ নালিকা তদ্রুপ অভিজ্ঞতার শরীর বেয়ে ব্যক্তি ও সমাজের জীবন প্রণালীতে স্পর্শ করে। প্রতি মুহূর্তে আমরা যা বিনির্মাণ করি, অর্জন করি, একে অপরকে ভালোবাসি, চুম্বন সুখে স্নাত হই, কাব্য-ললিতকলায় বুঁদ হয়ে থাকি, উৎপাদন-অর্থনীতি-বাণিজ্য প্রসূত ব্যাংক-স্বর্ণ-মূল্যবান খনিজ পদার্থ ইত্যাদি সবকিছু, যা আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন, এই সমস্ত কিছু অলক্ষ্যে সাজিয়ে দেয় দর্শন শাস্ত্রের অধীত বিদ্যার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার ক্ষেত্র সমূহ।
দর্শনের এই আপাত দুরূহ প্রকাশভঙ্গি সুবোধ্য করার পেছনে যারা কাজ করে গেছেন তাদের অনেককেই আমরা এক নামে চিনি। সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল থেকে শুরু করে ইবনে খলদুন-রুমী-আল কিন্দি হয়ে হালের রুশো-নীটশে-ফ্রয়েড-হেগেল নামগুলো চিনতে বেগ পেতে হয় না। তারা পথ দেখিয়ে প্রমাণ করে গেছেন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার সঙ্গে মানব ধারণার সম্মিলন যিনি ঘটান সেই গবেষকও বিবেচিত হন দার্শনিক হিসেবে। একইভাবে সমাজ বিজ্ঞানের আওতায় রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামাল দিয়ে একজন গণপ্রতিনিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যখন প্রাগুক্ত সকল দার্শনিক অনু ভাবনায় বছরের পর বছর জারিত হয়ে নিজেকে শাণিত করে নতুন ধারা উদ্ভাবন করে থাকেন, তখন তিনিও হয়ে উঠেন দার্শনিক। সেই সূত্রে একজন সফল রাজনীতিবিদকে দার্শনিক কাঠামোর উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করলে অত্যুক্তি হবে না।
মোদ্দা কথা, খুব গভীর থেকে কাউকে বিচার করার তাগিদ অনুভব করলে অবশ্যম্ভাবীরূপে ‘দার্শনিক’ উপমার চশমা পড়ানো এখন যুগের দাবি। এটা প্রতিষ্ঠিত করাই আগামী দিনের স্বপ্ন। সৃষ্টিশীল উদ্ভাবন ও সেই উদ্ভাবিত সত্যকে প্রমাণ করবার অন্তর্গত তাগিদ ও বেদনা একজন নিবেদিতপ্রাণ দার্শনিকের মতো মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি ত্যাগী পোড় খাওয়া মন্ত্রীগণ অনেক বেশি অনুভব করে থাকেন। ইদানিংকালে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি মুখের কথা, ঠোঁটের হাসি বাঙালি মানব মনের সহজাত আকুতির স্বতস্ফুর্ত অনুভূতিকে এমনভাবে স্পর্শ করেছে যা অভূতপূর্ব। তার ফলে অনেকেই হয়ে উঠছেন একাধারে কবি ও সাহিত্যিক। সম্ভবত এই ধারণার আলোকে নোবেল পুরস্কার কমিটি সব সময় সাহিত্য বিভাগের আওতাতেই দার্শনিকদের মূল্যায়ণ করে এসেছেন। আমাদের মনে আছে ১৯৫০ সালে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল সাহিত্যের ক্যাটাগরিতে নোবেল অর্জন করেছিলেন, যিনি একইসঙ্গে ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ।
মূলত এমনতর বিবেচনায় দার্শনিক ঘরনায় আমরা সড়ক, নৌ, অর্থ ইত্যাদি ক্ষেত্রের দুর্যোগকালীন মন্ত্রীদের জনগণের পূর্ণকালীন সেবক হিসেবে তাদের ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ অবলোকন করে আসছি। তারা প্রত্যেকেই মহান। তারা এখন পূর্বসূরিদের দেখানো পথকে মিথ্যা প্রমাণ করে পুরোনো ধারায় জনগণকে বারবার তারা আর ধোঁকা দেন না। শহর-জনপদের হিজিবিজি রাস্তাঘাটে চলমান বাতিল আইনের সূত্র সন্ধানে যারা সমালোচনামূলক ও নিন্দামূলক মতামত দিচ্ছেন তারা মহান দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনের ভাষা দর্শনের অনুসারী বর্তমান সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী কিংবা নৌ-মন্ত্রীর নিজস্ব দর্শন অনুধাবনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। মূল দোষ তো জনগণের! তারাই নিয়মের বেড়াজাল ডিঙ্গাতে চান। ট্রাফিক আইন অমান্য করে নিজেরাই আত্ম হননের পথ বেছে নিচ্ছেন যেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কি করণীয়? সড়কপথে নীরব মৃত্যুর মিছিল যেন একধরনের শ্রেণি সংগ্রামের রূপকতা। নিহত-আহত দুর্ভাগারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার জন্য আত্মত্যাগী জনগণের প্রতিনিধি। তাদের মৃত্যু নিয়ে শোক প্রকাশ করা যায়, কিন্তু এর বাইরে আর কিছু নয়। প্রতিবাদ উত্থাপন যেকোনো বিবেচনায় নব্য রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইতিমধ্যে অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে এক ঢিলে অজ¯্র পাখি শিকার করা গুজবপ্রিয় বিরোধী দলের মদতপুষ্ট দেশদ্রোহী বিপথগামী ছাত্র-জনতা অচিরেই সড়ক দুর্ঘটনা নিরোধে নানামুখী আলাপ-প্রলাপের অসারতা অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন। এখন পারস্পরিক ভাব-দর্শন বিনিময়ের পরিস্থিতি অনুকূল ও স্বাভাবিক। সবাই যথারীতি নতুন জ্ঞানের আলোকে হাস্যরস বর্জিত সুশীল বিবৃতি দিয়ে ধন্য হচ্ছেন। গুজব প্রচারের দায়ে নতুন করে কাউকে আর শ্রীঘর পরিদর্শন করতে হচ্ছে না।
আশা রাখি, এভাবে আগামীতে নিবেদিতপ্রাণ পোষ্য ছাত্র-শিক্ষক-শিল্পী-শ্রমিক সমাজ তাদের সদ্য লব্ধপ্রাপ্ত দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটাবেন। কারণ জীবনযুদ্ধের ক্লান্ত অভিজ্ঞতায় সবাই বোঝে গেছেন, আর যাই হোক নীরবতার দর্শন ছাড়া এই জাতির মুক্তি নেই, উন্নয়ন নেই, শান্তি নেই। আর কে না জানে, বোবার কোনো শত্রু নেই।
লেখক: চিকিৎসক ও লেখক