প্রকৌশলী নওশাদুল হক : কোরবানীর ঈদের তিন দিন আগে জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরছি। বাসায় এসে চোখ বুলালাম মসজিদের গেটে গ্রহণকৃত লিফলেটগুলোর দিকে। নয়টি লিফলেটের সবকটিই এতিমখানার জন্য কোরবানীর পশুর চামড়া সংগ্রহের আবেদন সম্বলিত লিফলেট। অর্থাৎ আমাদের দেশের এতিমখানা সমূহের বাৎসরিক আয়ের সিংহভাগই আসে সংগৃহীত কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির খাত হতে। গত কয়েক বছর যাবৎ সরকারি আয়ের প্রধান খাত অর্থাৎ ট্যাক্স, ভ্যাট বা রাজস্ব খাতে আয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও দরিদ্র এতিম বাচ্চাদের প্রধান খাতে আয় দিনে দিনে তলানিতে চলে যাচ্ছে। গতবছর প্রতি বর্গফুট চামড়ার মূল্য ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও এবছর ৪৫-৫০ টাকায় নেমেছে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে চামড়াজাত সামগ্রী অর্থাৎ জুতা, ব্যাগ, বেল্ট প্রভৃতির মূল্য। দুই আড়াই বর্গফুট চামড়া দিয়ে তৈরি হয় এক জোড়া জুতো। যার মূল্যমান চামড়া আকারে ১১০ টাকা আর নামী দামী ব্রান্ডের জুতা আকারে ৭০০০ টাকা। কোমরের বেল্ট কিনতে লাগে ১৫০০ হতে আড়াই হাজার টাকা। একটি চাবির ব্যাগের দাম ৬০০-৭০০ টাকা। অথচ মাঝারি আকারের গরু থেকে পাওয়া যায় ২২-২৫ বর্গফুট চামড়া।
দুঃখের বিষয়, এই ঈদে এরকম সাইজের চামড়া মৌসুমি বিক্রেতাদের কাছে আমি নিজে বিক্রি করেছি ২৭৫ টাকায়। আরও পরিতাপের বিষয়, পাড়া মহল্লা থেকে ক্রয়কৃত চামড়া আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে মৌসুমি বিক্রেতাদের বেহাল দশা। আড়তদাররা হাজারিবাগের আড়তদার তথা দেশের কেন্দ্রীয় আড়তদারদের কাছে চামড়া পৌঁছে দিয়ে বাড়িতে ফেরত এসেছে, না-কি এখনও ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি আছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অথচ প্রক্রিয়াজাত চামড়ার বড় বাজার রাজধানীর বংশালে প্রতি বর্গফুট চামড়ার মূল্য ২০০ টাকার কাছাকাছি। এই হিসেবে মাঝারি সাইজের চামড়ার মূল্য আসে প্রায় ৫০০০ টাকা।
তবে এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে, গরিব এতিম বাচ্চাদের সামনের দিনগুলো মোটেও সুখকর নয়। কারণ, আয়ের মূল খাতের পণ্যের মূল্যমান ক্রমশই নিম্নমুখী। ফলশ্রুতিতে বন্ধ হওয়ার উপক্রম চামড়ার অর্থের দাবিদার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। সাথে সাথে অসহায়ত্বের চরম সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে গরিব অসহায় এতিম মানুষগুলো। এহেন পরিস্থিতির দায়ভার কার? ক্রমে ক্রমে এতিম অসহায় বাচ্চাদের ভাঙ্গা থালা ছিনতাই করছে কে বা কারা? মৌসুমি বিক্রেতা, স্থানীয় আড়তদার, কেন্দ্রীয় আড়তদার, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট না-কি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়? আমি বলবো, এদের কেউই নয়। তাহলে কি ওদের ভাঙ্গা থালা ছিনতাই করছে এদের দুর্ভাগ্য?
লেখক: সভাপতি, ঢাবি সমাজকল্যাণ অ্যালামনাই ফোরাম/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ