সংবাদ রিপোর্ট: আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দু’মেয়াদে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুবিধা বেড়েছে দফায় দফায়। পদ না থাকা সত্ত্বেও বারবার গণপদোন্নতি, বেতনভাতা বৃদ্ধি, উপ-সচিবদের গাড়ি ও গাড়ি ক্রয়ে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা, আবাসন, মোবাইল ফোন ক্রয়, দাফতরিক ও অন্যান্য সুবিধা বেড়েছে। এছাড়া প্রশিক্ষণের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতাও বেড়েছে।
তবে প্রশাসন ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারে এসব সুবিধা সে অনুপাতে বাড়েনি। অন্যান্য বিসিএস ক্যাডারে শূন্যপদের নিরিখেই পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। নিয়মিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার অনেক অভিযোগ রয়েছে। এতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনে একাধিকবার অনুশাসন দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে বিসিএস ২৬ ক্যাডারে অসন্তোষ রয়েছে।
আরো পড়ুন : শেখ হাসিনাতেই আস্থা বিশ্বনেতাদের
জানা গেছে, বর্তমানে গাড়ি কিনতে উপসচিব ও তদুর্ধ্ব কর্মকর্তাদের (যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব) প্রায় ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিচ্ছে সরকার। গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে তারা প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। অথচ সমন্বিত মেধা তালিকায় চাকরিতে প্রবেশ করে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপ-সচিবদের গাড়ি সুবিধা
প্রথমবারের মতো এবার সার্বক্ষণিক গাড়ির সুবিধা পেয়েছেন উপসচিব স্তরের কর্মকর্তারা। কিন্তু উপসচিব সমমানের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন না। তবে সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেয়া হয়েছে, যা নিয়ে তাদের অধীন কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। গাড়ির পাশাপাশি উপ-সচিবরা বাড়ি করার জন্য সুদবিহীন ব্যাংক ঋণও পাচ্ছেন।
আরো পড়ুন : কিছুই চূড়ান্ত হয়নি, তবুও বাজারে ‘নৌকার’ ভুয়া তালিকা!
অতীতে শূন্যপদের বিপরীতে সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া হতো। এই রেওয়াজ ভেঙে বিগত মহাজোট সরকারের আমলে গণপদোন্নতির প্রচলন শুরু হয়। এতে মাঠ প্রশাসনে সেবার পরিধি বৃদ্ধি ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিকতর গতিশীল হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
সরকারের একজন সাবেক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, পদোন্নতির পর কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, গাড়ি ও আবাসন, দাফতরিকসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। এতে সরকারের আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নিচের পদে চাকরি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কর্মকর্তারাও। পদস্বল্পতার কারণে অনেক কর্মকর্তাকেই নিচের পদে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। নিচের পদে চাকরি করেও তারা ফের পদোন্নতি পাচ্ছেন।
জানা গেছে, সরকার গত বছরের জুনে উপ-সচিবদের গাড়ির প্রাধিকার দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। এতে উপ-সচিবদের সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার প্রদান করা হয়। এরপর গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা-২০১৭ (সংশোধিত)’ জারি করে সরকার। এই নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারের সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম-সচিবদের মতো উপ-সচিবরাও গাড়ি সুবিধা পাচ্ছেন।
আরো পড়ুন : খালেদা জিয়াকে জোর করে আনার অভিযোগ মির্জা ফখরুলের
চাহিদা অনুযায়ী কোন কর্মকর্তা গাড়ি সুবিধা না পেলে তিনি গাড়ি কিনতে সরকারের কাছে সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করেন। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি কিনতে ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হয়। পাশাপাশি গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি খরচ, চালকদের বেতনসহ অন্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা হারে বিশেষ ভাতা পাচ্ছেন উপ-সচিবরা।
বর্তমানে (১ সেপ্টেম্বরের হিসেবে) সরকারের উপ-সচিবের নিয়মিত (ডিউটি) এক হাজার ৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত উপ-সচিব আছেন এক হাজার ৭৫৫ জন। যুগ্ম-সচিবের স্থায়ী পদ ৪১১টি, যার বিপরীতে কর্মরত যুগ্ম-সচিব আছেন ৬১৫ জন। আর অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদ ১২১টি, যার বিপরীতে কর্মকর্তা আছেন ৬৩২ জন।
সুবিধা প্রদানের শীর্ষে আওয়ামী লীগ
আরো পড়ুন : যত দিন ইচ্ছা সাজা দিন, বিচারককে খালেদা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়ী হয়। এরপর সরকার গঠনের পর থেকেই সুযোগ-সুবিধা বাড়তে থাকে সরকারি কর্মীদের। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
নিচের স্তরে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে শুরু করে উপরের স্তরে দফায় দফায় উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন কর্মকর্তারা। এছাড়াও উপরের স্তরে ‘বিশেষ’ ‘সিনিয়র সচিব’ পদ সৃষ্টি করা হয়।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে গত ১৯ জুন বেতন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা তো হতেই পারে। কারণ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দিয়ে সব কাজ করানো যায়। তাদের কোয়ালিটি ভেরি ডিফারেন্ট।’
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গত ১০ বছরে পদোন্নতি নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই পদোন্নতি দেয়া হয়।’ অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে বিসিএস ২৬টি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
আরো পড়ুন : দূর্ভোগে সাধারণ মানুষ, বেকার কয়েক হাজার পরিবহন শ্রমিক
মোবাইল ফোন সুবিধা
মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি এবার সরকারের সচিব, অতিরিক্ত, যুগ্ম-সচিব ও উপ-সচিবদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুবিধাও বৃদ্ধি করেছে সরকার।
গত ২১ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সরকারি টেলিফোন, সেলুলার, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট নীতিমালা ২০১৮’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়।
এতে সচিবদের জন্য সরকারি খরচে মোবাইল ফোনসেট কেনার অর্থের পরিমাণ পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা করা হয়। এই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ এবং কথা বলার আনলিমিটেড মাসিক বিলও পরিশোধ করা হবে সরকারি কোষাগার থেকে।
এর আগের নীতিমালা অনুযায়ী, সচিবদের মোবাইল ফোন কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম-সচিবরা মাসে তিন হাজার ৮০০ টাকা ফোন ভাতা পাচ্ছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৫০০ টাকা মোবাইল ফোনের বিল। অবশিষ্ট দুই হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে তিনি বাসার ও অফিসের বিল পরিশোধ করবেন।
আরো পড়ুন : সংবিধানে কোথাও নেই, জেলে বিশেষ আদালত বসানো যাবে না: কাদের
উপ-সচিবরা দুই হাজার টাকার টেলিফোন বিল পাচ্ছেন। এর মধ্যে এক হাজার ২০০ টাকা মোবাইল ফোনের বিল। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে তিনি বাসা ও অফিসের টেলিফোন বিল পরিশোধ করবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরাও তাদের মর্যাদা অনুযায়ী টেলিফোন ও ইন্টারনেটের বিল পাচ্ছেন। বর্তমানে সরকারি টেলিফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিল কর্মকর্তাদের বেতনের সঙ্গে পরিশোধ করা হচ্ছে।
আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনে
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত
সম্প্রতি বিসিএস সমন্বয় কমিটি’র (২৬ ক্যাডার) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করা হচ্ছে। এ বৈষম্য নিরসনের পরিবর্তে দিন দিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপসচিব ও তদুর্ধ্ব পদে অব্যাহতভাবে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায় সুদমুক্ত ঋণ প্রদান ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বৈষম্য আরো বাড়ানো হয়েছে।
আরো পড়ুন : ২৪০ আসনে আ. লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত, বাকী আসন জোটের জন্য
সমন্বয় কমিটি মনে করে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ২৬ ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ প্রত্যক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এর সুফল হিসেবে নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছে। এসব ক্যাডার ও সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকতাগণ বিশেষ কোন সুবিধা পান না, অথচ উপ-সচিব পর্যায়ের ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাও গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ ও গাড়ি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। এটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সার্ভিস (রিঅর্গানাইজেশন অ্যান্ড কন্ডিশন) অ্যাক্ট ১৯৭৫-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
সমন্বয় কমিটির নেতারা বলেন, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনের অংশ হিসেবে পঞ্চম গ্রেড ও তদুর্ধ্ব পর্যায়ের সকল ক্যাডার ও সার্ভিসের কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। উপ-সচিব ও তদুর্ধ্ব পর্যায়ে মতো সকল ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন। এ বিষয়ে কার্যকর উপায় বের করতে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামকে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করে দেয়া হয়। কমিটির জন্য তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করার দায়িত্ব প্রদান করা হলেও সুপার নিউমারারি পদোন্নতির বিষয়ে কোন কাজ হয়নি বলে অভিযোগ বিসিএস ২৬ ক্যাডারের নেতাদের।
আরো পড়ুন : নির্বাচনে থাকার কৌশল নিতে হবে বিএনপিকে: নাঈমুল ইসলাম খান
তারা বলেন, ২০১৫ সালে বেতন স্কেল নিয়ে সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সে সময়ের মুখ্যসচিব, জনপ্রশাসন সচিব, অর্থসচিব ও শিক্ষাসচিব প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির সাথে বৈঠক করে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে সকল ক্যাডারের পদসোপান সুষমকরণের মাধ্যমে পদোন্নতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন। সে বিষয়টিও আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে আটকে দেয়া হয়।
সর্বশেষ গত বছরের ২ জুলাই অনুষ্ঠিত সচিব সভায় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনে প্রধানমন্ত্রী পুনরায় নির্দেশনা দেয়া হলেও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে দাবি করেন বিসিএস সমন্বয় কমিটির নেতারা।
-দৈনিক সংবাদ থেকে সংগৃহীত।