প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতির উর্ধ্বে মেসির ফুটবল

শেখ মিরাজুল ইসলাম: ইসরাইলে প্রীতি ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে মেসির ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও এটি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত। কিন্তু মেসির বৈশ্বিক পরিচিতি ও ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে পুরো ব্যাপারটায় আলোচনা ও প্রপাগা-ার মূল আলো ছিল মেসির উপর। যেন তার ইসরাইলে খেলতে যাওয়া না যাওয়ার উপর ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য নির্ভর করছে। ৯ জুনের ম্যাচটি বাতিল হওয়াতে সবাই এখন মেসিকেই বাহবা দিচ্ছেন। এ যেন বিশ্বকাপ পাওয়ার আগেই আরেক ধরনের জটিল বৈশ্বিক রাজনীতিতে মেসির অরাজনৈতিক বিশ্বকাপ জেতা।

গত সপ্তাহজুড়ে অব্যাহতভাবে ইসরাইল-আর্জেন্টিনা ম্যাচ ঘিরে বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। প্যালেস্টাইন ফুটবল প্রধান জিব্রাল রাজুব মেসির জার্সি পোড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন। মেসি বিরোধী শিবিরেও সাজ সাজ রব পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ ভেবে দেখল না ম্যাচটির আয়োজক আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন আর মেসি নিমিত্ত মাত্র। আর্থিক দেনায় জর্জরিত ‘এএফএ’ প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারত যদি তারা সেখানে খেলতে যেত। কিন্তু খেলার মাঠ যখন পরিবর্তিত হয়ে বিতর্কিত ভ্যানু জেরুজালেমের টেডি কোলেন স্টেডিয়ামে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সত্তর বছর পূর্তি উদযাপনের ম্যাচে পরিণত করার প্রপাগা-া তোলা হলো, তখন আর্জেন্টিনার উপর চাপ দেওয়া শুরু করল প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। মেসি ও কোচ সাম্পাওলি আসন্ন বিক্ষোভে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও নেতানিয়াহুর সরাসরি চাপ থাকায় এএফএ শুরুতে নিশ্চুপ থাকে। অবশেষে সরাসরি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে মেসি নিজেই এই বিতর্কের অবসান ঘটালেন। মানবাধিকার সংস্থা ও মুসলিম উম্মাহ এখন হাততালি দিয়ে মেসি বন্দনায় ব্যস্ত। সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও ফুটবলকে ঘিরে এই রাজনৈতিক ডামাডোলে কয়েকটি বিষয় কিন্তু ঠিকই অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।

প্রথমত মেসিকে ইচ্ছে করে মধ্যপ্রাচ্যের এই অমীমাংসিত রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়ানো হলো। ব্রাজিল বা পর্তুগালের সাথে ইসরাইলের খেলাটি হলে নেইমার বা রোনালদোর ব্যক্তি ইমেজ একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতো। ফিলিস্তিন সমস্যা হুট করে কিছুদিন আগে শুরু হয়নি তা সবাই জানে। সেই ১৯৪৮ সালে ১৪ মে বৃটিশরা জেরুজালেম ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে আরব খৃষ্ট্রান-মুসলিম বনাম ইহুদী স্যাটেলারদের অনন্তকালের লড়াই শুরু হয়। এর মীমাংসা করতে গিয়ে অনেক নেতা শান্তিতে নোবেল পেলেন, কিন্তু স্থায়ী শান্তি মিলল না। মিশর, লেবানন, সিরিয়া, সৌদি আরব এই সূত্রে অনেকভাবে লাভবান হলো এবং এখনো হচ্ছে । মার্কিনীরা স্পষ্ট দ্বৈত নীতি নিয়ে ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিরা নিজেরাও বহুবার এই আন্দোলন ইস্যুতে নানামতে গ্রুপে বিভক্ত হলো। বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা জিহাদিস্ট-টেররিস্টদের পক্ষে বিপক্ষে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা ক্রমে এক অসম লড়াইয়ে যে ভাবে জড়িয়ে পড়ল তার দায়ভার নেওয়ার উদ্যোগ নেই। আলোচনার টেবিল শেষ আশ্রয়।

কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে তার জের ধরে হালের ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে মেসির জার্সি পোড়ানোর ডাক দেওয়া যায় কিংবা মেসিদের জেরুজালেমের মাটিতে খেলিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা যায়, কিন্তু মার্কিনিরা জেরুজালেমে দূতাবাস বসালে জোরাল প্রতিবাদ হয় না। সৌদি আরব গোপনে ইসরাইলকে সাথে নিয়ে আইএসএস ইস্যুতে আঁতাত গড়লে তা যখন ফাঁস হয় তখন কোনো প্রতিবাদ আসে না। এক্ষেত্রে ইতিহাসের পাঠ জেনেও কেবল মেসিকে দোষারোপ করাটা যেন একধরনের ফুটবলীয় রোমান্টিসিজম। আর যেহেতু মেসির সামনে বিশ্বকাপের হাতছানি তাই তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়ে হয়রানির সুযোগটা ষোলআনা নেয়াই যায়। কিন্তু মেসি আপাতত এই সুযোগটা কাউকে নিতে দিল না। মধ্যপ্রাচ্যের আবেগী জনতার কড়া ট্যাকেল আসার আগেই ড্রিবল করে বের হয়ে গেল। কিন্তু আশঙ্কা হয়, শক্তিশালী ইহুদী অক্ষের অহমে আঘাত করাটা ভীষণ বিপদজনক। হলিউডের জাঁদরেল অভিনেতা-পরিচালক মেল গিবসনের পরিণতি আমরা দেখেছি। মেসির সামনের লড়াইটা তাই আরও কঠিন। সেই মাঠের যুদ্ধে মেসি কিন্তু সম্পূর্ণ একা। কোনো শান্তিকামী ফিলিস্তিনি আন্দোলন তাকে বিশ্বকাপ পাইয়ে দেবে না। তবে সুন্দর ফুটবলের প্রতি শাশ্বত ভালোবাসা জটিল রাজনীতির অনেক উর্ধ্বে তা নতুন করে প্রমাণিত হলো। এর মূল কৃতিত্ব মেসি ও তার আকাশী-নীল দল আর্জেন্টিনার।
লেখক : চিকিৎসক ও লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত