প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৫ বছর, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি অনেকেই

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ২৪ এপ্রিল। দেশের পোশাক শিল্প খাতের এক শোকাবহ দিন। ২০১৩ সালের এই দিনে ধসে পড়ে সাভার বাজার বাসস্ট্যন্ড এলাকার রানা প্লাজার আট তলা ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ১১৩৬ জন শ্রমিকের। আহত হন আরও কয়েক হাজার শ্রমিক। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণঘাতী এই দুর্ঘটনার রেশ এখনও বয়ে চলছেন আহত শ্রমিক এবং হতাহততের পরিবারের সদস্যরা। আহত শ্রমিকদের বড় একটি অংশই এখনও ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে, কেউ কেউ পঙ্গু হয়েছেন আজীবনের জন্য। নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এসব পরিবারে এখনও বয়ে চলেছে অশ্রুর ধারা।

দেশের পোশাক শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার এই এ দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন কর্মসূচি। রানা প্লাজার জায়গায় গড়ে ওঠা স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন ওই দুর্ঘটনায় আহতসহ হতাহতদের স্বজনরাও।

সেদিন যা ঘটে ছিল
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত রানা প্লাজায় ছিল তিনটি পোশাক কারখানা। প্রতিদিনের মতো ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলও ওই তিন কারখানার শ্রমিকরা সকাল ৮টায় হাজির হন কর্মস্থলে। কারখানা চালুও হয় নির্ধারিত সময়ে। ঘণ্টা দেড়েক পরই সকাল সাড়ে ৯টায় হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশ। মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে আট তলা ভবন। আশপাশের বাতাসে তখন কেবলই আর্তনাদ। শুরু হয় আহত শ্রমিকদের আহাজারি। উদ্ধারে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র্যা ব ও পুলিশ সদস্যরা। তিন সপ্তাহ ধরে চলে বিরতিহীন উদ্ধার অভিযান।

যা ছিল ভবটিতে
রানা প্লাজার প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান, দ্বিতীয় তলায়ও ছিল দোকান আর ব্যাংক। ওপরের তলাগুলোতে ছিল পোশাক কারখানা। এর মধ্যে তৃতীয় তলায় ছিল নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে ও ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেডে এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড।

হতাহতের সংখ্যা
রানা প্লাজা ধসে ১,১৩৬ জন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২,৪৩৮ জন শ্রমিককে। আহতদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছেন, অনেকেই এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মানসিক আঘাত।

তৈরি হয়েছে শহীদ বেদী
রানা প্লাজা ধসে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ২০১৩ সালের ২৪ মে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে নির্মাণ করেন শহীদ বেদী। অস্থায়ী শহীদ বেদীটির নামকরণ করা হয় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। এ শহীদ বেদীটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনগুলো আন্দোলন-কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন।

বর্তমান রানা প্লাজার চিত্র
রানা প্লাজা ধসের পর ধ্বংসস্তূপের অধিকাংশই সরিয়ে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় বংশাই নদীর পাড়ে। এখনও কংক্রিটের সুরকি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় রানা প্লাজার ১৮ শতাংশ জমির জায়গাটিতে। শুরুতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারপাশ কাঁটাতার ও টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর অস্তিত্ব আর নেই বললেই চলে। ওই দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও মাঝে মধ্যেই আহত শ্রমিক আর নিহতদের স্বজনদের আনাগোনা চোখে পড়ে রানা প্লাজার স্থানে।

সোহেল রানার জমি সরকারের দখলে
রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার মালিকানাধীন রানা প্লাজা, রানা টাওয়ার ও ধামরাইয়ের রানা ব্রিকসের ভূমি সরকারের দখলে নিয়েছে। আদালতের নির্দেশে সোহেল রানার মালিকানাধীন সব ভূমি বাজেয়াপ্ত করে দখল বুঝে নিয়েছে ঢাকা জেলা প্রসাশন।

কালের সাক্ষী অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ
বেদনার সাক্ষী হয়ে আছে সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। ঘটনার দিন থেকে টানা ১৭ দিন ওই বিদ্যালয়ের মাঠে নিহতদের নিয়ে রাখা হতো। প্রিয় মানুষটির সন্ধানে সেখানেই উদভ্রান্তের মতো সকাল-সন্ধ্যা ছোটাছুটি করতেন স্বজনরা। রানা প্লাজা থেকে বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তায় তখন অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ মানেই নতুন কোনও মরদেহ উদ্ধার; আর তা শনাক্ত করতে মাঠে হাজির হাজারও মানুষের অশ্রুভরা চোখ। সেই ঘটনার শোকেই যেন আজও পাথর অধরচন্দ্র স্কুলের সেই মাঠ। নেই মানুষের তেমন আনাগোনা, নেই কোনও খেলার আয়োজন। রানা প্লাজায় নিহত হাজারও শ্রমিকের লাশ বুকে নেওয়া সেই মাঠ যেন আজও বয়ে চলেছে সেদিনের সেই গভীর ক্ষত।

অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরিদ জানান, আগে সকাল-দুপুর-রাত— এমন কোনও সময় নেই যে সময়টিতে মাঠ ফাঁকা থাকত। সারাদিনই আড্ডা চলত, খেলাধুলা হতো। রানা প্লাজা ধসের পর সেই চিত্র বদলে যায়। ওই দুর্ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া সব মরদেহ এখানে নিয়ে এসে রাখা হতো। ওই ঘটনার পর থেকেই এই মাঠটা কেমন যেন নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে।

মেলেনি ক্ষতিপূরণ, শোক দিবস ঘোষণার দাবি
রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি শ্রমিক সংগঠনই নড়েচড়ে বসে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখতে শুরু হয় আন্দোলন। নিহত ও আহতদের লস অব আর্নিংয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করার জোর দাবি তোলেন তারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানার সভাপতি মো. ইব্রাহিম বলেন, রানা প্লাজায় আহত অনেক শ্রমিকই এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। দ্রুত তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ ছাড়া সরকার সোহেল রানার যেসব সম্পত্তি জব্দ করেছে, সেসব সম্পত্তি হতাহতদের পরিবারের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। তা না হলে আবারও শ্রমিক সমাজ একত্রিত হয়ে আন্দোলনে নামবে।

অভিযোগের আঙুল স্থানীয় প্রশাসনের দিকে
রানা প্লাজার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য অভিযোগের আঙুলটা ওঠে স্থানীয় প্রশাসনের দিকেই। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও আহত শ্রমিকরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই ঘটেছিল ওই দুর্ঘটনা। কারণ, ভবনধসের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগেই (২৩ এপ্রিল) ফাটল দেখা দিয়েছিল রানা প্লাজার ৪ ও ৫ তলার কয়েকটি পিলারে। ফাটল দেখে শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে নেমেও আসেন মহাসড়কে। এমন সংবাদের পর সেখানে ছুটে যান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরাও। কিন্তু তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি মালিকপক্ষ। স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়, প্রচার করা হয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও।

পরে ওইদিন (২৩ এপ্রিল) বিকালেই ভবনের ফাটল দেখতে আসেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন সরদার। তিনি এসে ভবনটির ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘এ ফাটলে তেমন কোনও সমস্যা নেই, বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভবনা নেই। সামান্য প্লাস্টার উঠে গেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এ বলেই চলে যান তিনি।
ঠিক ২৪ ঘণ্টা পরই ইতিহাসের অন্যতম এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয় সাভারবাসীকে। নিভে যায় হাজার প্রাণের প্রদীপ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২৩ এপ্রিল রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দেওয়ার পরই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এভাবে প্রাণ দিতে হতো না হাজার শ্রমিককে। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত