প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বীর-খালেদের বীরত্ব প্রচারে কুন্ঠা প্রসঙ্গে

আহমেদ মূসা : His appearances, his serenity, his piercing
eyes, his expressive gesture and the tone of
his voice seemed almost super human to us.

হাবিবুল আলম বীর-প্রতীকের গ্রন্থ ‘ব্রেভ অব হার্ট’-এ খালেদ মোশাররফ সম্পর্কে উপরের উদ্ধৃতিটি রয়েছে। ১৯৭২ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যুদ্ধ ক্ষেত্রে খালেদ মোশাররফকে কেমন দেখেছেন? মুক্তিযোদ্ধার উত্তরটা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, ‘হি ওয়াজ গ্রীক গড ফর আস্।’

আমাদের স্বাধীনতার বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে অনেক বীরের সাক্ষাৎ আমরা পেয়েছি। ইতিহাস অবশ্যই একদিন তাদের প্রাপ্য-সম্মানের জায়গায় স্থান করে দেবে। কিন্তু এ যাবতকাল পর্যন্ত প্রকাশিত ইতিহাসে (!) অনেক বীরের অবদান আংশিকভাবে এসেছে, কারো কারো ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কারো কারো কপালে জুটেছে মিথ্যা ও অনাকাক্ষিত অপবাদ। আমাদের এমনই এক বীরের নাম খালেদ মোশাররফ। আজকের ইতিহাস তার ব্যাপারে ভীরু ও কুণ্ঠিত। এমন কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা অপবাদেরও শিকার তিনি। অবদানের বিচারে বা প্রয়োজনের তুলনায় তাকে নিয়ে সামান্যই আলোচনা হয়েছে। অথচ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হওয়ার কথা বীর-খালেদ। হয়তো বিএনপি বা জাসদের মতো কোনো সংগঠন তিনি রেখে যেতে পারেননি বলে তাঁকে নিয়ে আলোচনার বিষয়টি আলোচকদের আকর্ষণ করে না। তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবধারিত চলে আসে আরেক বীর হায়দারেরও নাম।

খালেদ মোশাররফের নাম আরো জোরালোভাবে আসার কারণগুলির মধ্যে রয়েছে : ১. তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে একটি জনযুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ২. আওয়ামী লীগ বহির্ভুত চিহ্নিত বামপন্থীদের জন্যও খালেদ ও হায়দারের নেতৃত্বাধীন দুই নম্বর সেক্টর ছিল অবারিত। এ জন্য তাদেরকে অনেক ঝুঁকিও নিতে হয়েছে। ৩. খালেদ মোশাররফ অন্যদেশের সাহায্য ছাড়া এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং সে-ভাবেই উদ্ধুদ্ধ করতেন তার সহযোদ্ধাদের। ৪. তাঁর সেক্টরের আওতায় ছিল রাজধানী ঢাকাসহ যুদ্ধের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। যুদ্ধে-বিপ্লবে এমন কি সামরিক শাসন জারির ক্ষেত্রেও রাজধানীর পতন-দখল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৫. হাজার-হাজার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষসহ তিনি পেয়েছিলেন একঝাঁক মেধাবী-দেশপ্রেমিক তরুণ যাদের মধ্যে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া বা স্ট্যান্ড করা যোদ্ধারাও ছিলেন। ৬. তার সেক্টরের যোদ্ধারা গড়ে তুলেছিলেন ক্র্যাক প্লাটুন, যাদের অনেকে চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও ঢাকা শহরে অপারেশন জারি রাখেন। ৭. পাকিস্তানী হানাদাররা ২৫ মার্চ জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই খালেদ মোশাররফকে ভুয়া এসাইনমেন্ট দিয়ে এমবুশ পেতে হত্যা করতে চেয়েছিল।

একজন রক্ত মাংসেরই মানুষ, কিন্তু সহযোদ্ধাদের কাছে খালেদ ছিলেন মানবোত্তর, দেব-দুর্লভ। পাকিস্তান বাহিনী সারাজাতির ওপর আঘাত হানার আগে খালেদ মোশাররফকে হত্যা করার জন্য ভূয়া এসাইনমেন্ট দিয়ে এমবুশ পেতেছিল। কিন্তু তিনি তা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শত্রুর আঘাত প্রতিহত করেছেন, পাল্টা আঘাত করেছেন, আহত হয়েছেন।

খালেদ মোশাররফ চেয়েছিলেন একটি শেকড়, যুদ্ধের একটি গণভিত্তি। যুদ্ধের সময় তিনি ভারতীয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের থেকে একটি সচেতন দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তিনি নিজে গেরিলাদের ট্রেনিং দিয়েছেন । হাজার হাজার প্রগতিশীল ও বিপ্লবী ছেলেকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেন। সেক্টরের উচ্চপদেও আসীন ছিল এরাই।

বিস্তারিত আলোচনা নিবন্ধের আকার ছাড়িয়ে যাবে বলে আলোচনা কলাম-নিবন্ধের গন্ডির মধ্যেই রাখছি। এ ক্ষেত্রে খালেদ ও হায়দারকে নিয়ে এ পর্যন্ত আলোচনার যে-সব অংশ আমার গোচরীভূত হয়েছে সেগুলি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরব। শুরু করছি ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত মাসিক নিপুণ-এ প্রকাশিত খালেদ-পতœী সালমা খালেদ, সাহাদত চৌধুরী ও শহিদুল্লাহ খান বাদলের নেওয়া সাক্ষাৎকার সম্বলিত নিবন্ধের অংশ-বিশেষ দিয়ে। এটি ছিল আমারই লেখা।

সালমা খালেদ: ‘১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানি থেকে পাঁচ মাসের একটা সামরিক কোর্স শেষ করে খালেদ মোশাররফ দেশে ফিরে আসেন। আমি তাঁর সাথেই ছিলাম। দেশে আসার পর তাকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং দেওয়া হয়। তখন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু পর্যন্ত তিনি খুব ব্যস্ত ও অস্থির থাকতেন। বাসায় মাঝে মাঝে শফিউল্লাহ ও জিয়াউর রহমান আসতেন। দরজা বন্ধ করে তারা কথা বলতেন। মুক্তিযুদ্ধে যেদিন অংশ নিতে যাবেন সেদিন আমাকেও বিষয়ে কিছুই বলেননি। শুধু বলে গেছেন আমি যেন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় না থেকে মায়ের কাছে চলে যাই। তিনি যখন যুদ্ধে যোগ দিলেন তখন আমার থাকা নিয়েও সমস্যা দেখা দিল। সবাই আমাকে আশ্রয় দিতে ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ ব্যাপারটা কয়েকদিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। এই বাড়ি ওই বাড়ি করে দু’মাস পার করে দিলাম। পাকিস্তানী আর্মিরা একদিন আমার খালার বাসা ঘেরাও করে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায় এবং অত্যাচার করে। বাসার দু’জন কাজের লোককে গুলি করে হত্যাও করে। এ অবস্থায় শহীদুল্লাহ খান বাদল নামে দু’নম্বর সেক্টরের একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার একজন সঙ্গী আমাকে এসে বলল, আমার ইচ্ছা থাকলে তারা আমাকে খালেদের কাছে নিয়ে যেতে পারে। ও তখন আগরতলায়। আমার তখন দু’মেয়েই ছোট। একজনের বয়স চার অন্য জনের বয়স দুই। মেয়েদের সঙ্গে নিতে ওরা রাজি হলো না। শেষে মেয়েদের রেখে যেতেই মনস্থ করলাম। ..ভারতে গিয়ে আমরা ডা. সুজিতদের বাসায় উঠলাম। রাতে দেখা হল। কিছুদিন থাকার পর আমাদের কলকাতা পাঠিয়ে দিলেন। অক্টোবরের শুনলাম তিনি আহত হয়েছেন। অপাশেন হল। সুস্থ হয়ে আবার যুদ্ধে চলে যান। আমি বা বাচ্চা কারো সম্পর্কেই তখন তার আগ্রহ ছিল না। দেশ ও যুদ্ধই ছিল তখন প্রধান বিষয়। স্বাধীনতার পর জানুয়ারি মাসে আমরা দেশে ফিরে আসি।’

‘প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর তার মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখেছেন?

উত্তর : পড়াশুনা খুব বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। রাত দু’টা পর্যন্ত পড়তেন। রাত একটায়ও যদি বাইরে থেকে ফিরতেন তাহলেও দু’টো পর্যন্ত পড়তেন। সব যুদ্ধের বই। যুদ্ধের ওপর লেখার ইচ্ছে ছিল তার। আরম্ভও করেছিলেন।..

প্রশ্ন : দেশের তখনকার অবস্থা দেখে তিনি কি বলতেন?

উত্তর : খুব দুঃখ পেতেন। বলতেন, যার জন্য যুদ্ধ করলাম তাতো হচ্ছে না।

প্রশ্ন : স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বা পরে তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন যা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে?

উত্তর : স্বাধীনতার পরপরই আমরা যখন সবাই খুব উৎফুল্ল তখন তিনি খুব মনমরা হয়ে থাকতেন। একদিন জিজ্ঞেস করায় বললেন, দেখো, ইন্ডিয়ানরা এসে আমাদের দেশ স্বাধীন করে দিয়ে যাক এটা আমি মোটেও চাইনি। শুধু নয় মাস কেন, নয় বছর হলেও নিজেদের যুদ্ধ নিজেরা করলে ভাল হত।

প্রশ্ন : মৃত্যুর কথা কখন জানতে পারেন?

উত্তর : ৬ তারিখ সন্ধ্যায়। তাকে মেরে ফেলা হবে এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। কারণ শুধুমাত্র আর্মির ডিসিপ্লিন রক্ষার জন্যই তিনি গিয়েছিলেন। সিনিয়র অফিসার থাকতে কয়েকজন মেজর দেশ শাসন করবে এটা যৌক্তিক মনে করেননি। চারদিন পর লাশ পেয়েছি। পেটের একটা জায়গায় শুধু গুলি লেগেছিল। এছাড়া অক্ষতই ছিল সারা শরীর। কবর দেওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টেই। অবশ্যই তখন আমাদের মাথা ঠিক ছিল না। নইলে বনানীতেই কবর দিতাম।

প্রশ্ন : কেউ কেউ তাকে প্রো-ইন্ডিয়ান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন …

উত্তর : তিনি প্রো-ইন্ডিয়ান হলে তাকে মরতে হত না।

প্রশ্ন : তার মা ও ভাই যে মিছিল করেছিলেন তাতে তার সায় ছিল?

উত্তর : অবশ্যই না, আর কোনই সম্পর্ক ছিল না। এমনিতেই আওয়ামী লীগের মিছিল হবার প্রোগাম ছিল। এখন ঘটনা হয়েছে মিছিলে আমার শাশুড়ি যোগদানের বিষয়টি। রাশেদ মোশাররফ পূর্ব থেকেই আওয়ামী লীগ করে আসছেন। তবুও ব্যাপারটা ঘটার পর তিনি সাংঘাতিকভাবে রেগে গিয়েছিলেন। তাঁর মাকে তিনি খুবই ভালবাসতেন। ঘটনার পর তাঁর মার সাথে একবার দেখা হয়েছিল তাঁর, কিন্তু তিনি রাগের জন্য একটি কথাও বলেননি মার সাথে। তার ছোট ভাই রাশেদ মোশাররফের সাথেও তিনি কথা বলেননি। .. আমার মনে হয়, যদি সেই মিছিল না হতো বা তাঁর মা ও ভাই সে মিছিলে যোগ না দিত তাহলে হয়তো খালেদ মোশাররফকে মরতে হত না। আজকেও তাঁর সম্পর্কে এমন ভুল ধারণা থাকত না যে, তিনি ভারতপন্থী ছিলেন। মানুষ তাকে ভুল বুঝেছে।..’

সাহাদত চৌধুরী : ‘এপ্রিল মাসেই আমরা ঢাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধরত আর্মিদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। যুদ্ধ যখন শুরু হলো আমরা তাতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা প্রথমে জানতাম না ঠিক কার অধীন, কাদের সাথে নিয়ে বা কার নেতৃত্বে যুদ্ধ করব। এপ্রিলের মাঝামাঝি আমরা তিনজনের নাম জানতে পারলাম। মেজর জিয়ার নাম আগেই জানতাম, রেডিও’র ঘোষণা শুনে। তারপরে জানলাম খালেদ মোশাররফ ও হায়দারের নাম। প্রথমে শুনলাম হায়দার ঢাকা আসবেন। তিনি খালেদ মোশাররফের অধীনস্থ একজন মেজর। খালেদ মোশাররফ সম্পর্কে তখন নানা আকারে একটা বিশাল বর্ণনা শোনা যেত। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনেকটা গল্পের মত। অর্থাৎ নামটা আমাদের কাছে এপ্রিল মাসেই বিরাট আকারে এসে গেলে। এপ্রিলের শেষের দিক থেকেই যখন মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় আসা শুরু করল তাদের কাছে খালেদের গল্প শুনলাম। শুনলাম খালেদ তাদের পাঠাচ্ছেন, ট্রেনিং দিচ্ছেন, মতিনগর, বক্সনগর ইত্যাদি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। ট্রেনিং শেষ করে তারা ঢাকা এসে অপারেশন করছেন। এই ট্রেনিংপ্রাপ্তরা খালেদ সম্পর্কে নানা রকম বীরত্ব ও প্রশংসাসূচক শব্দাবলী ব্যবহার করতেন। তাদের বর্ণনায় আমি একটা বড় রকমের নেতার চেহারা পেতাম।

‘মে মাসের মাঝামাঝি আমি দুই নম্বর সেক্টরে গেলাম। আমার থাকার কথা ছিল ঢাকাতেই। কিন্তু পরে সেক্টরে যেতে হল সোনামুড়া গিয়ে আমি ক্যাপ্টেন আখতার বলে একজন ডাক্তারের কাছে অপেক্ষা করছিলাম। পরামর্শ চাচ্ছিলাম কীভাবে মেলাঘরে যাওা যায়। তখন দুপুর। আমি দু’দিনের একটানা পরিশ্রমের পর খুব ক্লান্ত ছিলাম। আরো অনেকে সেখানে ছিলেন। এমন সময় সেখানে এলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাদেক খান। তিনিও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি বললেন যে, খালেদ একটু পরেই আসছেন। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। আমরা বসেছিলাম একটা বনবিভাগের ডাকবাংলোয়। বিকেলে দিকে খালেদ মোশাররফের গাড়ি এসে থামল। পরনে ক্রিম কালারের জিনস্ প্যান্ট-সার্ট। কোমড়ে পিস্তল। অসম্ভব সুন্দর দেখতে ভদ্রলোক, বর্ণনায় যা শুনেছি সবই মিলে গেল শুধু বয়সটা অনেক কম মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব সেটাকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তিনি ডাকবাংলোয় এসে বসতেই দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া হলো। তখন সাদেক খান আমার সাথে খালেদ মোশাররফকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমার সম্পর্কে বললেন, ও ঢাকা থেকে এসেছে, আর্টিস্ট ও সাংবাদিক। ..প্রথম সাক্ষাতেই মেলাঘরে আমার অবস্থান নির্ণয় হয়ে গেল। এর ঠিক পনেরো দিন পরই আমি খালেদের পক্ষে একটি বিবৃতি লিখি। এটি ঢাকায় বিলি করা হল, টানানো হল। এতে লেখা ছিল, বিনা প্রয়োজনে দেশ ত্যাগ করবেন না, কারণ আপনারা সবাই দেশ ত্যাগ করলে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় পাবে না। অর্থাৎ আমি তাকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলাম। তখন তার সঙ্গে আমার নীতিগত মিল হয়।

‘.. তাকে পুরোপুরি বুঝতে হলে মুক্তিযুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরের প্রাধান্যের বিষয়টিও বুঝতে হবে। প্রাধান্যের কারণ ঢাকা শহর ছিল দু’নম্বর সেক্টরের আওতায়। দু’নম্বর সেক্টরের গেরিলাদের কেউ কেউ বলতেন আরবান গেরিলা। কৌতুক করে কেউ কেউ বেলবটম গেরিলাও বলতেন। সেক্টরে এদের বিশেষত্ব ছিল সবার প্রতি সমান ব্যবহার। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া ছাত্র থেকে শুরু করে কুলি সর্দার পর্যন্ত সবাইকে খালেদ মোশাররফ নিজে এবং নিজের উদ্যোগে ট্রেনিং দিতেন। পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দু’নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিত্ব একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল। এখানে ভারতীয়দের সহায়তা ছাড়াই গেরিলা তৈরি হতো। অন্যান্য জায়গায় ইয়থ ক্যাম্প খোলার জন্য যে টাকা দেওয়া হতো দুই নম্বরে সেই টাকা দিয়েই খালেদ মোশাররফ ট্রেনিং সেন্টার করে হাজার হাজার ছেলেকে ট্রেনিং দিতেন। এর দায়িত্বে থাকতেন মেজর হায়দার। এখান থেকে ট্রেনিং পাওয়া ছেলেরাই ঢাকার দুর্ধর্ষ অপারেশনগুলো চালাতো। প্রশিক্ষণের ব্যাপারে খালেদ ভারতীয়দের হস্তক্ষেপ কখনো পছন্দ করতেন না। ভারতীয় তত্ত্বাবধানে কাউকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে খালেদ পুনরায় তার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতেন।..

‘খালেদ মোশাররফের যুদ্ধ পদ্ধতি এবং বক্তব্য আমাদেরকে প্রচন্ডভাবে আকর্ষণ করত। তিনি প্রায় বলতেন, যুদ্ধ করবে কোনও প্রাপ্তির আশা না করে, কেননা মনে রাখবে, স্বাধীন দেশ কখনো জীবিত গেরিলা চায় না। যুদ্ধ করবে বিজয়ের জন্য, প্রয়োজনে জীবন দিতে হবে। নিজের জন্য কোনো কিছু আকাক্সক্ষা করবে না।

‘..যখন তাকে সরাবার জন্য প্রচারণা চলছিল তখন একদিন আমাকে ডেকে তিনি বললেন, দেখো, আমি জানি না তোমাদের ভিতর কে কে লেফট পার্টির সাথে যুক্ত। আমি জানি, সেক্টরে যাদের প্রধান দায়িত্বগুলো দিয়েছি তারা প্রায় সবাই কোন না কোন লেফট অর্গানাইজেশনের সাথে জড়িত ছিল। এতে আপত্তির কিছু দেখি না। কারণ এটা জাতীয় যুদ্ধ, এখানে যুদ্ধ করার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে। ..

‘আমার যদ্দূর মনে হয়েছে তিনি ছিলেন প্রচন্ডভাবে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক। তবে যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তাকে প্রচুর পড়তে দেখেছি, বিশেষ করে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ওপর প্রচুর পড়াশুনা করতেন। তাকে আমরা মাও সেতুং, চেগুয়েভারা এমনকি ফ্যাননের বইও পড়তে দেখেছি।’

‘প্রশ্ন : যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি সহায়তাকে তিনি কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন?

উত্তর : ..তাঁকে সরিয়ে দেবার পাঁয়তারা যখন চলছিল, তখন এই প্রশ্ন উঠেছিল। সরিয়ে দিলে তিনি দেশের ভিতরে এসে যুদ্ধ করতেন। সেজন্য প্রস্তুতও ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তির ওপরই প্রধানত আস্থাশীল ছিলেন এবং তিনি হিসেব করে রেখেছিলেন শুধু মুক্তিবাহিনীর শক্তিকেই ’৭২-এর জুন-জুলাই নাগাদ দেশ স্বাধীন করা সম্ভব ছিলো। সুতরাং ভারতীয় বাহিনীর সর্বাত্মক যুদ্ধ তিনি আন্তরিকভাবে চাননি।

প্রশ্ন : ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর তিনি যে অভ্যুত্থান ঘটান সে সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

উত্তর : তিনি কেবলমাত্র সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেটা করেছিলেন। পরে যেকোনভাবেই হোক এটা ভারতের পক্ষের ক্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

প্রশ্ন : খালেদ মোশাররফকে কি আপনার কখনো ভারতপন্থী মনে হয়েছে?

উত্তর : অবশ্যই না। একথা আমি ভাবতেও পারি না। আমার জানা মতে, ক্যু-এর পর ভারতীয় পক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে কিন্তু বারবার এড়িয়ে গেছেন।’

শহীদুল্লাহ খান বাদল : ‘১৯৭১ সালের আগে থেকেই আমি খালেদ মোশাররফকে চিনতাম। আমি তখন লালমাটিয়া আমার ভাইয়ের বাসায় থাকি। পাশেই ছিল খালেদ মোশাররফের শ্বশুরবাড়ি। প্রায়ই দেখা হতো।

‘দেশে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল তখন আমি ও আমার ইউনিভার্সিটির কয়েকজন বন্ধু আমাদের বাসায় বোমা বানাতে ছিলাম। এ সময় একটা ফেটে গিয়ে আমার এক বন্ধুর পা উড়ে যায়। পাশে বিহারীদের কলোনী ছিল, তারা আমাদের বাড়ি ঘেরাও করেছিল। আমরা কোনরকম বেরিয়ে পালিয়ে যাই। সেদিনই লোক মারফত খালেদ মোশাররফ আমাকে ডাকলেন। আমি যাওয়ার পর বললেন, তোমরা বোমা বানাচ্ছ বটে, কিন্তু এভাবে তো হবে না’। বলেই আমাদের বোমার ওপর একটি বই দিয়ে বললেন, বইটা পড়ে ঠিকমত বোমা বানাও, তাহলে আর ভুল হবে না। ২৪ মার্চ তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট চলে গেলেন। তারপর শুরু হল যুদ্ধ। অনেক বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে গেলাম দুই নম্বর সেক্টরে।

‘প্রশ্ন : যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে কেমন দেখেছেন?

উত্তর : তার সম্পর্কে অনেকের মনে কিছু ভুল ধারণা আছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন প্রচন্ড জাতীয়তাবাদী। সামরিক বাহিনীর নিয়ম-কানুনের প্রতি অনুগত থেকেও তিনি যথেষ্ট অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা করতেন। প্রগতিশীল ছেলেদের তিনি আশ্রয় দিয়েছেন, যুদ্ধ করতে সহায়তা করেছেন। ..তিনি চাইতেন স্বাধীনতাপ্রিয় প্রতিটি ছেলে যেন যুদ্ধের সুযোগ পায়। এমনকি মোহাম্মদ তোহাসহ অনেক বামপন্থী গ্রুপের সাথেও তার সমঝোতা হয়েছিল। কাজী জাফর ও রাশেদ খান মেননসহ অনেক বাম নেতার সাথেও মতৈক্য হয়েছিল। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার সেক্টরেই ছিলেন। আমাদের বহু ছেলে প্রশিক্ষণ পেয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। ভারতীয় হাই কমান্ড এসব পছন্দ করত না। তিনি জেনেশুনেই বহু বামপন্থী ছেলেকে সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, আমরা পাকিস্তানী আর্মির কাছ থেকে যেসব অস্ত্র কেড়ে নিতাম তা ভারতীয় বাহিনী নিয়ে যেতে পারে মনে করে উদ্ধারপ্রাপ্ত অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হত এবং সেসব অজ্ঞাতসারেই পাঠিয়ে দিতেন দেশের ভেতরে। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন যুদ্ধটাকে আমাদের শক্তির ওপর নির্ভরশীল করতে এবং আরেকটু দীর্ঘায়িত করতে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে খালেদ মোশাররফকে নক্সাল, কমিউনিস্ট ইত্যাদি নামেও কেউ কেউ চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য করতেন না। নতুন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যেসব নিয়ম-কানুন জারি করেছিল তিনি তা মানতেন না। ছেলে রিক্রুট করার জন্য আমাদের পাঠাতেন। ..তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। বেঁচে থাকলে একজন বড় নেতা হতেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, তার আচ্ছাদন না পেলে হয়তো আমরা যুদ্ধই করতে পারতাম না। ..’

‘প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর তাকে কেমন দেখেছেন?

উত্তর : প্রগতিশীলদের সাথে তিনি সব সময়ই যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু আর্মির নিয়ম ভেঙ্গে তিনি কিছু করার পক্ষপাতী ছিলেন না। প্রচলিত সামরিক বাহিনী ও এস্টাববলিসমেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলতেন না, বলা সম্ভবও ছিল না। তবে মানুষের মুক্তি তিনি চেয়েছিলেন। বেঁচে থাকলে হয়তো পরিষ্কার বুঝা যেত তাকে।

প্রশ্ন : পঁচাত্তরের পর তিনি কি আওয়ামী লীগ বা ভারতপন্থী হয়ে পড়েছিলেন বলে মনে হয়?

উত্তর : অবশ্যই না। তার দৃষ্টিভঙ্গি আগাগোড়াই এক ছিলো। অনেকে ভুল বোঝে তাকে, কিন্তু সেটা এখন পরিস্কার হওয়া দরকার। খালেদ মোশাররফ কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল বা ভারতপন্থী ছিলেন না। এসব অপপ্রচার। তার মা ও ভাইয়ের সেই হঠকারী কাজের সাথে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। এসব নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি, অনেকের সাথে ঝগড়াও করেছি। তার মতো জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক খুব কমই হয়।..

প্রশ্ন : তাঁর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আপনাদের কী ধারণা ছিল?

উত্তর : যথেষ্ট পড়াশোনা করতেন এবং কথায় তার ছাপ পাওয়া যেত। তার বক্তৃতাগুলো ছিল খুব গোছানো ও বুদ্ধিদীপ্ত। চলাফেরা সাধারণত সৈনিকের মতো ছিল না, একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল তার। যমুনার এপারে যারা যুদ্ধ করেছেন সেই সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে জ্ঞানে-বুদ্ধিতে তিনিই প্রথম ছিলেন বলে আমার মনে হয়। ..যুদ্ধের শুরুতেই তিনি আমাদের বলে দিয়েছেন, তোমরা কমপক্ষে তিন/চার বছর ধরে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হও। এই যুদ্ধ থেকে অ্যাকচুয়্যাল যুদ্ধ বেরিয়ে আসবে।’

দুই
শহীদ রুমির বরাত দিয়ে জাহানারা ইমাম : ‘যতগুলি ছেলে সেক্টরে রাখার অনুমতি ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছেলেকে আশ্রয় দিত খালেদ। নির্দিষ্ট সংখ্যক ছেলের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ রেশন দুইগুণ বেশি ছেলেরা ভাগ করে খেত। খালেদ বলত, ঢাকায় গেরিলা তৎপরতা অব্যাহত রাখার জন্য আমার প্রচুর ছেলে দরকার। অথচ আওয়ামী লীগের ক্লিয়ারেন্স, ইউথ ক্যাম্পের সার্টিফিকেট বা ভারত সরকারের অনুমোদন পেরিয়ে যে কয়টা ছেলে আমাকে দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয়। তাই খালেদ বাদলকে বলত, ‘যত পার, সরাসরি ছেলে রিক্রুট করে সোজা আমার কাছে নিয়ে আসবে। এই যুদ্ধ আমাদের জাতীয় যুদ্ধ। দলমত নির্বিশেষে যারাই দেশের জন্য যুদ্ধ করতে আসবে, তাদের সবাইকে আমি সমানভাবে গ্রহণ করব।

‘বাদলরা তাই করত। ফলে, খাতায় যত ছেলের নাম থাকত, তার চেয়ে অনেক বেশি ছেলেকে খালেদ ক্যাম্পে রেখে গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে ঢাকা পাঠাবার জন্য তৈরি করত। তিনশো ছেলের রেশন ছশো ছেলে ভাগ করে খেত। হাত খরচের টাকাও এভাবে ভাগ হয়ে একেকটি ছেলে পেত মাসে এগারো ইন্ডিয়ান রূপী।

‘বহু ছেলে যুদ্ধ করার উন্মাদনায় আগরতলা এসেও কোথাও ট্রেনিং নিতে পারছিল না, বসে বসে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল। খালেদ মোশাররফ এভাবে ভারত সরকারের নাকের ডগায় লুকিয়ে বেশি বেশি, স্বাধীনতাকামী যুদ্ধকামী ছেলেদেরকে তার পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়ে, ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করার পলিসি না নিলে ঢাকার গেরিলা তৎপরতায় এত সাফল্য আসত কি না, এরকম অব্যাহত গতি বজায় থাকত কি না, সন্দেহ। ২৯-৩০ আগস্টে এত বেশি সংখ্যক গেরিলা ধরা পড়ার পরেও মাত্র দেড়-দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রচুর, অজস্র, অসংখ্য গেরিলা ঢাকার বিভিন্ন দিক দিয়ে শহরে ঢুকছে, অ্যাকশান করছে, পাক আর্মীকে নাস্তানাবুদ করছে, সামরিক সরকারের ভিত্তি নড়িয়ে দিচ্ছে, অবরুদ্ধ দেশবাসীর মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছে  এটাও সম্ভব হচ্ছে খালেদেরই দূরদর্শিতার জন্য। আসলে খালেদ স্বপ্নদ্রষ্টা। খালেদ শক্তিমান, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। বাংলাদেশের জন্য যা ভাল মনে করেছে, তাই কাজে পরিণত করতে দ্বিধাবোধ করেনি। এক্ষেত্রে সে আওয়ামী লীগের বা ভারত সরকারের নির্দেশ, বিধিনিষেধের ধার ধারেনি। তার এই সাহস, দুঃসাহস, আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যতের দিকে নির্ভুল নির্ভীক দুষ্টিপাত করার ক্ষমতা তাকে সেক্টর টু-র গেরিলা ছেলেদের কাছে করে তুলেছে অসম্ভব জনপ্রিয়। প্রায় দেবতার মত। খালেদের যে কোন হুকুম চোখবন্ধ করে তামিল করার জন্য প্রতিটি গেরিলা ছেলে একপায়ে খাড়া। খালেদ মোশাররফ সেক্টর-টু-র প্রাণ।’

একাত্তরের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৩০৫-৩০৬

নাসিরউদ্দিন ইউসুফের বরাত দিয়ে জাহানারা ইমাম : ‘এতো বিপদের মধ্যেও আমরা কিন্তু মনের বল হারাইনি। এর মধ্যেও আমরা অ্যাকশন করে গেছি। সেপ্টেম্বরের শেষে আমরা যখন আসি তখন খালেদ মোশাররফ আর হায়দার ভাই বলেছিল শিগগিরই প্রবলেম বাধতে পারে, তোমরা পারলে কিছু টাকাপয়সা যোগাড় করে পাঠায়ো। গত সপ্তাহে আবারো একটা চিট্ পেলাম হায়দার ভাইয়ের কাছ থেকে। শিগগিরই যেন কিছু টাকা পাঠাই। সেই জন্য আমরা কয়দিন আগে পলওয়েল মার্কেটে একটা ব্যাংক লুট করে সেই টাকা সেক্টরে পাঠিয়েছি।

‘..ইন্ডিয়া গভমেন্ট সেক্টর টু-তে আর্মস দেওয়া বন্ধ করেছে, টাকা আর রেশনও দিচ্ছে না। তাই। আপনি জানেন না সেক্টর টু-র সঙ্গে ইন্ডিয়া গভমেন্টের একটা প্রবলেম প্রথম থেকেই ছিল। সেটা গত দুমাস থেকে বেশি হয়ে উঠেছে। ওরা তো সেক্টর টুকে রেড সেক্টর বলে। ওদের ধারণা এখানে নাকি নকশালদের হেলপ্ করা হয়। তাছাড়া আমারো একটা ঘটনা আছে। আমি ভাসানী ন্যাপ রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, তাই আমাকে দু’তিনবার ইন্ডিয়ান আর্মী ইন্টারোগেশানর জন্য নিয়ে যেতে চেয়েছিল, খালেদ মোশাররফ দেয়নি। আমাদের দলের লীডার মানিক, সে ছাত্রলীগ করে, সেও আমাকে কয়েকবার বঁচিয়েছে। দুইজন দুই রাজনীতির সমর্থক কিন্তু দেখুন যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করছি। মানিক লীডার, আমি ডেপুটি লীডার। এখানে আমাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই কারণ এটা আমাদের জাতীয় যুদ্ধ, আমাদের বাঁচামরার ব্যাপার। ওপর দিকে যারা বসে আছে, তারাই খালি ক্ষমতা কী করে দখলে রাখা যায় তার পাঁয়তারা করছে।

একাত্তরের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৩১২।
মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লড়ায়ের ময়দানে খালেদ মোশাররফ যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। তাঁর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি যুদ্ধের বিবরণ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকার কথা। এসব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যে সাহস ও শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন করেছেন তা তুলনাহীন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মেজর খালেদ মোশাররফের নাম হানাদার বাহিনীর শিবিরে ভীতির সঙ্গে উচ্চারিত হতো।’

একটি ফুলকে বাঁচাব বলে : পৃষ্ঠা : ১২৯ ।

‘২২ অক্টোবর ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন কসবা আক্রমণ করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ নিজে রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এই যুদ্ধে আকস্মিকভাবে শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে মেজর খালেদ গুরুতরভাবে আহত হন। মেজর খালেদকে আগরতলা হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন তার বাহিনী নিয়ে কসবা দখল করলেন।’

একটি ফুলকে বাঁচাব বলে, পৃষ্ঠা ১২৯।

এম আর আখতার মুকুল : ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এই ২ নম্বর সেক্টরে সংঘটিত হয়েছিল। এই সেক্টরে সাফল্যজনকভাবে যুদ্ধ পরিচালনার কৃতিত্ব মরহুম খালেদ মোশাররফ ও মরহুম এম টি হায়দারের।’
আমি বিজয় দেখেছি পৃষ্ঠা : ১৪০।

‘….অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হলো। যখনই মুক্তিযোদ্ধারা সেক্টর কামান্ডারের নির্দেশ ‘এ্যাকশনের জন্য রওয়ানা হয় তখনই ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্থানীয় কর্মকর্তারা আন অফিসিয়ালী নানা ‘ওজর-আপত্তি উত্থাপন করতে শুরু করল। এদের বক্তব্য হচ্ছে প্রফেশনাল যুদ্ধের শর্ত পূরণ করে এ্যাকশনে যেতে হবে। কিন্তু মূল বাহিনীতে যথেষ্ট সংখ্যক সামরিক অফিসার ও জোয়ান না থাকায় এসব শর্ত পূরণ সম্ভব ছিল না। উপরন্তু এসব এ্যাকশন ছিল অনেকটা গেরিলা পদ্ধতির। তাই প্রফেশনাল যুদ্ধের পদ্ধতি কোন সময়ই অনুসরণ করা হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্থানীয় কর্মকর্তাদের এসব ওজর আপত্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন দুই নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ আর এই সেক্টরের কসবা-আখাউড়া এলাকায় সবচেয়ে দীর্ঘদিনব্যাপী লড়াই সংঘটিত হয়েছে।’

আমি বিজয় দেখেছি, পৃষ্ঠা : ১৪০।

‘….যুদ্ধের প্রথম থেকেই ক্যাপ্টেন হায়দার ছায়ার মতো খালেদ মোশাররফের সঙ্গী ছিলেন। তাঁরই নির্দেশক্রমে ক্যাপ্টেন হায়দার এই সেক্টরে, বিশেষ করে ঢাকা এলাকার কিছু বামপন্থী মনোভাবপন্ন যুবককে গেরিলা ট্রেনিং প্রদান করেছিল।… বীর যোদ্ধা খালেদ মোশাররফ মিত্রবাহিনীর অন্যতম বৃহৎ অংশীদার ভারতীয় বাহিনী সম্পর্কে সব সময়ই একটা রিজার্ভ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে যার অমোঘ বিশ্বাস ছিল, সেই খালেদ মোশাররফকে পরবর্তীকালে ‘হিন্দুস্তানী জাসুস’ (এজেন্ট) এই ভূয়া অভিযোগে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। রাজনীতির অপার মহিমার জন্য সেদিন এটা সম্ভব হয়েছিল। তবুও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লড়াই-এর ময়দানে খালেদ মোশাররফ যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। তাঁর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি যুদ্ধের বিবরণ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকার কথা। এসব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যে সাহস ও সৌর্য-বীর্য প্রদর্শন করেছেন তা তুলনাহীন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মেজর খালেদ মোশারফের নাম হানাদার বাহিনীর শিবিরে ভীতির সঙ্গে উচ্চারিত হতো।

আমি বিজয় দেখেছি পৃষ্ঠা : ১৬২।

জহিরুল ইসলাম : ‘গেরিলাদের প্রতি মেজর হায়দারের প্রধান ছবক ছিল, ‘অস্ত্র চালানোটাই যুদ্ধ নয়, অস্ত্র লুকোনো, রক্ষণা-বেক্ষণ, শত্রুর খবর সংগ্রহ, আক্রমণ, নিরাপত্তা ইত্যাদি সবই যুদ্ধের অংশ। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভুল হলেই মৃত্যু।’

মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্তক বিদায় : পৃষ্ঠা – ৬৭।

‘মতিনগরের দর্শন ছিল একটাইÑ নদীর স্রোতের মতো যে ছেলেরা আসছে, তাদের গ্রহণ করা। থাকার ঘর নেই, খাওয়া নেই, যথেষ্ট অস্ত্র নেই, কুচ পরোয়া নেই। মতিনগরে অনেক গাছ আছে। গাছ কেটে ডালপালা দিয়ে ঘর বানাও। পাতা দিয়ে বিছানা পাতো। থাকুক না দু-একটা পোকামাকড় বা বিছা। খাবার যা আছে ভাগ করে খাও। প্লেট নেই, তো গ্রেনেডের চোঙা কেটে প্লেট বানাও। অস্ত্র নেই তো কি হয়েছে, পাকস্তিানিদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আসো।’

মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্তক বিদায় : পৃষ্ঠা – ৯৮

মেজর (অব.) ডা. আখতার আহমেদের ‘বার বার ফিরে যাই’ গ্রন্থের বরাত দিয়ে গেরিলাযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম লেখেন,
একসময় বামপন্থী এক নেতার ‘একদল বামপন্থী তরুণকে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক ক্লাস হতো না। আমরা সন্ধ্যার পর স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও দেশাত্মবোধক গান শুনতাম। সেক্টর ২-এর কর্ণধার খালেদ মোশাররফ ছাত্র অবস্থায় ছিলেন ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত। তিনি ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগের পক্ষে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। আর অন্যদিকে মেজর হায়দার কখনো কোনো ছাত্র বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বা অনুসারী ছিলেন না। কিশোরগঞ্জ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে তিনি চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। তাই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়নি। তবু খালেদ মোশাররফ ও হায়দারের নেতৃত্বাধীন সেক্টর ২-কে চিহ্নিত করা হলো বাম বা লাল সেক্টররুপে।’

মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্তক বিদায়  : ১৭৮।

আহসানুল কবির ডালিম : ‘মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশনা ছিলো হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিক ও অতিথিরা থাকাকালীন ঢাকা শহরের পরিস্থিতি যে শান্ত নয় এবং এখানে যুদ্ধ চলছে তা বোঝানোর জন্য শহরের আশে-পাশে কিছু গ্রেনেড ও গুলি ছুঁড়তে হবে। কিন্তু দু:সাহসী একদল তরুণ ঢাকায় ৯ জুন তারিখে সরাসরি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গ্রেনেড হামলা করে বসে যা ছিলো অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ ও অচিন্তনীয় কাজ। সন্ধ্যায় বিবিসির খবর থেকে খালেদ মোশাররফ এই অপারেশনের কথা জানতে পেরে বলেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল! বললাম, ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ ঘটাতে আর ওরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে।

‘তিনিই প্রথম এই দলটিকে “ক্র্যাক” আখ্যা দেন; যা থেকে পরবর্তীতে এই প্লাটুনটি “ক্র্যাক প্লাটুন” নামে পরিচিত হয়। দ্যাট ওয়াজ ক্রাক ম্যান।’
*২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে।

নিজ সম্পর্কে খালেদ মোশাররফ : আমি যোদ্ধা, কিন্তু যুদ্ধবাজ নই। শান্তি আমার একমাত্র কাম্যবস্তু। শান্তির জন্যেই অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম শত্রুর বিরুদ্ধে। জয়ী আমাদের হতেই হবে  দেশমুক্তির জন্যে সাড়ে সাত কোটি বাঙালী যুদ্ধ করেছেন। ভারতে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয়নি, উচিতও না। আমার গেরিলাদের বলতাম, দেশের লোককে বলতে, তারা যেন অপ্রয়োজনে দেশত্যাগ না করেন। প্রত্যেকেরই লড়তে হবে। গেরিলা যুদ্ধে সবচে যা বেশি প্রয়োজন, তা হচ্ছে গণ-আবরণ। সাতকোটি মানুষ এই আবরণ সৃষ্টি করে রেখেছিল।

সেক্টর কমান্ডাররা বলছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা; সম্পাদনা শাহরিয়ার কবির।

এই পবের্র ইতি টানলাম আমার একটি ছড়ার শেষ লাইনের প্রশ্ন দিয়ে –

‘ইতিহাসের পাতা ফুড়ে স্বশরীরে,/ওরা আবার এসেছিলেন একাত্তরে।/খালেদের তরবারী, হাঁক হায়দারের,/যমদূত-ত্রাস ছিল পাক-হানাদারের।../মাৎস্যন্যায় ফের ফিরে আসে বাংলায়/ কে কারে কেন মারে, বুঝা ছিল দায়।/বীরদের খুঁজে-খুঁজে হত্যা করা হয়,/খালেদ আর হায়দার বলি হন সে সময়।/এমন মৃত্যু ওদের ছিল পাওনা?/ইতিহাস কেন তুমি জবাব দাও না!’
ছড়াগ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়ার খুর থেকে’।

নিউ ইয়র্ক, ১৭ মার্চ, ২০১৮।
(লেখার প্রথম অংশ ছাপা হয়েছিল বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর উত্তর আমেরিকা সংস্করণে।)

আহমেদ মূসা লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার।

email : [email protected]
website Address:
https://sites.google.com/view/sreejonkal

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ