প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হোমবেইজড শ্রমিকদের সহিংসতা প্রতিরোধের পথ চলা

তাহমিনা হক দিনা : জনবহুল বাংলাদেশে জীবিকার তাগিদে নানা ধরনের ছোট-খাটো কাজে যুক্ত থাকার ইতিহাস সেই প্রাচীন যুগের। সামন্ততান্ত্রিক যুগ থেকে বর্তমান পুঁজিবাদ বিকাশের সময়েও এই ধারা অব্যাহত আছে। অনগ্রসর, দরিদ্র সমাজ কাঠামোয় প্রতি দিনের খাবার জোগাতে গ্রাম শহরের মানুষ বিশেষ করে নারীরা এ ধরনের ছোট খাটো কাজ করে আসছেন। আধুনিক অর্থশাস্ত্র যাকে অভিহিত করেছে গৃহে অবস্থান করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত কর্মী হিসেবে (ঐড়সব ইধংবফ ডড়ৎশবৎং, ঐইড).
এক সমীক্ষায় দেখা (২০০৯-২০১০ অর্থ বছর) গেছে, বাংলাদেশে গৃহে অবস্থান করে কাজ করা (ঐড়সব ইধংবফ ডড়ৎশবৎং, ঐইড) শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ। যাদের বেশিরভাগের অবস্থান গ্রাম বা শহরের উপকন্ঠে। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত নন। বাড়িতে বসেই তাদের কাজ চলে।

গৃহের অন্যান্য জরুরী কাজ করার পাশাপাশি ঐ কাজ তারা পরিচালনা করে থাকেন। ঐ সমীক্ষায় আরও দেখা যায় এই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিযুক্ত কর্মীরা ভীষণভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তারা একটি সাপ্লাই চেইন (ংঁঢ়ঢ়ষু পযধরহ) এর একেবারে নি¤œস্তরে কাজ করেন। মধ্যের কাজ গ্রহীতা (সরফফষব সধহ) ও তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমে নিগৃহিত হন পদে পদে। তাদের পারিশ্রমিক, কাজের সময়, নিরাপত্ত নিয়ে নেই কোন ধরনের নীতিমালা বা আইন। একেবারেই সুরক্ষা ছাড়া কাজ করতে হয় তাদের। সম্প্রতি শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্ত, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ ওকুপেশনাল সেফটি, হেলথ এন্ড এনভাইরনমেন্ট ফাউন্ডেশন (ওশি) এই খাতের শ্রমিকদের নিয়ে একটি জরীপ পরিচালনা করেছে।

তাতে দেখা যায় জরীপে উত্তর দেওয়া নারী শ্রমিকদের ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন তারা এই খাতে কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা বা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যার হার শতকরা ২৭ শতাংশ । আর ৬৫ শতাংশ উত্তর দাতা জানিয়েছেন তারা কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের মানসিক নিপীড়নের শিকার । যা মূলত করে থাকেন মধ্যের মানুষ (সরফফষব সধহ) ও সাথের কর্মীরা (পড়-ড়িৎশবৎ). আরও ভীতিকর তথ্য হল এই ধরনের নিপীড়নের শিকার নারীরা জানেন না এই অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের জন্য তারা কার কাছে যাবেন।

অতি সম্প্রতি শ্রমিকদের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা ওশি ফাউন্ডেশন দঞযব ংরঃঁধঃরড়হ ধহধষুংরং ড়ভ মবহফবৎ নধংবফ ারড়ষবহপব ধঃ ঐইডং ংবপঃড়ৎদ শিরোনামের একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। যাতে দেখা যায় বাংলাদেশে গৃহে বা বাসায় অবস্থান করে যারা কাজ করে থাকেন তারা মূলত নানা ধরনের নির্যতনের শিকার হন। যেগুলোর মধ্যে শারীরিক আঘাত, মৌখিকভাবে তিরস্কার, কাজের জন্য অনৈতিক চাপ, নানা ধরনের যৌন হয়রানি ও হেনস্থা। ঢাকার যাত্রাবাড়ি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আগারগাঁও কামরাঙ্গীর চর, সাভারের বিভিন্ন এলাকা ও মানিকগঞ্জ, গাজীপুরের প্রায় ৩০০০ জন গৃহের শ্রমিকের উপর পরিচালিত ঐ গবেষণা থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ নারী নির্যাতনের চিত্র আরও ভয়াবহ। ২০১৫ সালে ঞযব টহরঃবফ ঘধঃরড়হং চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ঋঁহফ (টঘঋচঅ) ও ইধহমষধফবংয ইঁৎবধঁ ড়ভ ঝঃধঃরংঃরপং (ইইঝ) পরিচালিত গবেষণায় পাওয়া গেছে আরও ভীতিকর তথ্য। ঐ গবেষণায় পাওয়া যায়, বাংলাদেশে শতকরা ৭৩ শতাংশ বিবাহিত নারী তাঁদের স্বামী দ্বারা নিজ ঘরে নির্যাতনের শিকার হন। ৫৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তারা শারীরিকভাবে নিগৃহের শিকার। আর সন্তান ধারনের সময় ১৪ শতাংশ নারী মারা যান স্বামীর কোন কোন ধরনের নির্যাতনের ফলে। অর্থনৈতিক হিসেবে ২.১ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের সম পরিমাণ ক্ষতি হয় পারিবারিক এই নির্যাতনের ফলে। এই চিত্র বদলাতে সরকারী বেসরকারী উদ্যোগে নানা কর্মসূচী পালিত হচ্ছে।

যারা গৃহে অবস্থান করে কাজ করেন সেইসব শ্রমিকদের সংগঠিত করে নির্যাতন প্রতিরোধ ও ন্যায্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে কাজ করছে উন্নয়ন সংস্থা ওশি ফাউন্ডেশন। তাদের সামান্য সহযোগিতায় ও উৎসাহে ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও গাজিপুরে গঠিত হয়েছে ‘ভাউ কমিটি’ (ঠরড়ষবহপব ধমধরহংঃ ডড়সবহ). প্রাথমিকভাবে এই তিনটি জেলার সক্রিয় কমিটিগুলো বেশ ইতিবাচক কাজ করছে। সম্মিলিতভাবে সংগঠিত হয়ে তারা প্রতিরোধ করছেন নারী নির্যাতন ও সমাজে নারীর প্রতি নানামুখী নিপীড়ন। তৈরী করছে অনন্য সব উদাহরণ। গাজীপুরে একটি গ্রামে নিপীড়ন ঠেকাতে ‘ভাউ কমিটি’র সদস্যরা র‌্যাপিড এ্যাকশান ব্যাটালিনের সহযোগিতা নিয়েছেন।

ফলে একদিকে যেমন এক নারী নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন অন্যদিক সামাজিকভাবে তাদের অবস্থানা স্বীকৃত হয়েছে। দিনে দিনে এই কমিটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ‘একতাই বল, একতাই শক্তি’ এমন শ্লোগান পুঁজি করে চলছে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের অনন্য এক কার্যক্রম। যা হয়ত একদিন সার্বিকভাবে এই সমাজে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করতে ভূমিকা রাখবে। অবসান হবে সব ধরনের নিপীড়নের। আর সবচেয়ে জরুরী প্রতিষ্ঠিত হবে শ্রমজীবী নারীরা সমাজে একা নন। নন দুর্বল বা বিচ্ছন্ন।

লেখক : প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত