প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রীদেবীর মৃত্যু নিয়ে ভারতে তুমুল বিতর্ক

রাশিদ রিয়াজ : প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠছে বলিউডের অভিনেত্রী শ্রীদেবীর মৃত্যুকে ঘিরে। বিস্ফোরক মন্তব্যে রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছেন,শ্রীদেবীকে খুন করা হয়েছে এবং এই মৃত্যুর সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের হাত থাকতে পারে। দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে সিনেমার অভিনেত্রীদের অবৈধ সম্পর্কের দিকটিতেও আমাদের আলোকপাত করতে হবে। প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেছেন, প্রসিকিউশন কি বলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলির কোনও ধারাবাহিকতা নেই। শ্রীদেবী কখনও মদ ছুঁয়ে দেখেননি। তাহলে তার শরীরে কীভাবে অ্যালকোহল মিলল? সিসিটিভি ক্যামেরার কী হয়েছিল? মিডিয়ার আগেই পৌঁছে গেলেন ডাক্তাররা আর বলে দিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

একটা মৃত্যু , কিন্তু প্রশ্ন একাধিক! শ্রীদেবী মারা যান গত শনিবার রাতে। প্রথমে জানা গিয়েছিল, হার্ট অ্যাটাকে। কিন্তু দু’দিন পর সোমবার বিকালে দুবাই পুলিশ জানাল, জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে শ্রীদেবীর। এ নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলো একাধিকবার শিরোনাম বদল করছে।

প্রশ্ন উঠছে সামান্য উচ্চতার একটা বাথটাব। জল ভরলেও উচ্চতা দেড় ফুটের বেশি হবে না! তাতে কী করে ডুবে গেলেন পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার ওই অভিনেত্রী! অনেকের মনেই প্রশ্নটা ঘুরছে। দুবাই পুলিশ জানিয়েছে, অচৈতন্য অবস্থায় জলে ডুবে গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। কিন্তু, অচৈতন্য হলেন কী ভাবে? সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে গত দু’দিন ধরে বলা ‘হার্ট অ্যাটাক’ শব্দটাও উধাও হয়ে গিয়েছে এ দিনের আলোচনা থেকে। তা হলে কি হার্ট অ্যাটাক হয়নি? জবাব মিলছে না। কারণ, দুবাই পুলিশ বা সে দেশের মিডিয়া সেন্টার এ দিন যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে হার্ট অ্যাটাকের কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে অচৈতন্য হয়েই জলে ডুবে যাওয়ার কথা।

এদিকে শ্রীদেবীর কললিস্ট চেক করছে পুলিশ, জেরা চলছে পরিবার ও হোটেল কর্মীদের। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলছে, শ্রীদেবীর রক্তে অ্যালকোহল পাওয়া গিয়েছে। দুর্ঘটনাবশত ডুবে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে দুবাই পুলিশ। সব দিক খতিয়ে দেখার পর দুবাই পাবলিক প্রসিকিউশন ছাড়পত্র দিলে তবেই দেহ ভারতে আনা যাবে।

পুরো ভারত জুড়ে শ্রীদেবীর মৃত্যুতে যে বিতর্ক চলছে তা সামাল দিতে কোনো জল্পনা না ছড়াতে অনুরোধ জানিয়েছেন, আমিরাতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নবদীপ সিং সুরি। একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এই ঘটনায়। অভিনেত্রীর মৃত্যু নিয়ে তাই রহস্য আরও বেড়েছে। ভারতের সমস্ত টেলিভিশন চ্যানেল ও মিডিয়া সরব হয়ে উঠেছে শ্রীদেবীর মৃত্যু নিয়ে।

রাষ্ট্রদূত নবদীপ সিং সুরি বলছেন, শ্রীদেবীর আকস্মিক মৃত্যুতে মিডিয়ার আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে মাত্রাতিরিক্ত জল্পনা ছড়ানোটা ঠিক নয়। ভারত ও আমিরাত সরকার মিলে মিশে দ্রুত কাজ করছে যাতে শ্রীদেবীর মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানো সম্ভব হয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। শ্রীদেবীর পরিবার এবং শুভাকাঙ্খীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এ ধরণের ঘটনায় তদন্ত , প্রশাসনিক কাজ, সমস্ত রকম প্রক্রিয়া শেষ করতে ২-৩ দিন সময় লেগেই যায়। শ্রীদেবীর মৃত্যুর কারণ খোঁজার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের উপরেই ছাড়া হয়েছে।

প্রশ্ন রয়েছে শ্রীদেবীর স্বামী বনি কপূরের ভূমিকা নিয়েও। কারণ, দুবাইয়ের সংবাদপত্র ‘খালিজ টাইমস’ প্রথমে জানিয়েছিল, বনি সেই সময় হোটেলে শ্রীদেবীর ঘরে ছিলেন। শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তিনি মুম্বাই থেকে দুবাই পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শ্রীদেবীর হোটেলেই পৌঁছেছিলেন তিনি। স্ত্রীর সঙ্গে মিনিট ১৫ আড্ডা দেওয়ার পর ডিনারের প্রস্তাব দেন। আর তাতে রাজি হয়ে যান শ্রীদেবী। ডিনারে যাবেন বলে তৈরি হতে গিয়েছিলেন বাথরুমে। কিন্তু, অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি বেরিয়ে আসেননি। তখন বনি বাথরুমের দরজা ভেঙে স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। অচৈতন্য অবস্থায় শ্রীদেবী নাকি বাথটাবের ভিতরেই পড়ে ছিলেন। ঘরে এনে স্ত্রীর সংজ্ঞা ফেরানোর নানা চেষ্টা করেন বনি। কিন্তু, কোনও কাজ হয়নি। পরে এক বন্ধুকে ডেকে স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা শ্রীদেবীকে মৃত বলে জানিয়ে দেন। কপূর পরিবারের তরফে জানানো হয়, হার্ট অ্যাটাকেই মৃত্যু হয়েছে শ্রীদেবীর।

অন্য সূত্র বলছে, রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ রুম সার্ভিসে ফোন করে তার ঘরে জল দিতে বলেছিলেন শ্রীদেবী। মিনিট ১৫ পর হোটেলের এক কর্মী শ্রীদেবীর ঘরে জল দিতে গিয়ে কোনও সাড়া পাচ্ছিলেন না। একাধিক বার ডোর বেল বাজানোর পর যখন দরজা খোলেননি শ্রীদেবী, তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ ভিতর থেকে বন্ধ থাকা দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। ঘরে ঢুকে তারা দেখেন, শ্রীদেবী বাথটাবে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছেন। সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তা হলে বনি সেই সময় কোথায় ছিলেন?

শ্রীদেবীর দেহের ময়নাতদন্ত এবং ফরেন্সিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে যে রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে বলা হয়েছে অচৈতন্য অবস্থায় জলে ডুবে মৃত্যু। অচৈতন্য কী ভাবে হলেন? একটা সময় জানা গিয়েছিল, ময়নাতদন্তে মৃতের শরীরে অ্যালকোহল পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেই অ্যালকোহলের পরিমাণ কতটা, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ডেথ সার্টিফিকেটে তার অচৈতন্য হয়ে পড়ার কথা থাকলেও অ্যালকোহলের কারণেই তা হয়েছিল কি না সে ব্যাপারে কোনও আলোকপাত করা হয়নি।

উঠছে আরও একটি প্রশ্ন। ভাগ্নের বিয়ের পর মেয়ে খুশিকে নিয়ে মুম্বই ফিরে এসেছিলেন বনি কপূর। দুবাই ফিরে যান দু’দিন পর। ওই দু’দিন হোটেলেই ছিলেন শ্রীদেবী। একা। তাকে এক বারের জন্যও ঘরের বাইরে দেখা যায়নি। কেন? অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন অভিনেত্রী? সে কারণেই তাকে বাইরে দেখা যাচ্ছিল না? তিনি কি অবসাদ কাটাতে ওষুধ খেতেন? জানা যায়নি।

কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালের এক ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘আত্মহত্যা (সুইসাইডাল) বা খুনের (হোমিসাইডাল) প্রাথমিক প্রমাণ না পেলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আমরা ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ড্রাউনিং’ বা ‘দুর্ঘটনায় ডুবে মৃত্যু’ বা ‘ডুবে আকস্মিক মৃত্যু’ লিখি না। শুধু ‘ডুবে মৃত্যু বা ‘ড্রাউনিং’ লিখি। এ বার সেটা আত্মহত্যা, নাকি খুন বা দুর্ঘটনা, তা তদন্ত করে দেখার কাজটা পুলিশের। আমাদের নয়।’’

কলকাতার ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ডুবে মৃত্যু হতে পারে তিন রকমের। না জেনে জলে পড়ে গিয়ে ডুবে মৃত্যু হতে পারে। জলে ডুবে আত্মহত্যা হতে পারে। বা, কেউ ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিয়ে খুন করতে পারে। গলায় ফাঁসের দাগ ছাড়া তিন রকমের ডুবে মৃত্যুর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে সাধারণত, কোনও ফারাক থাকে না। এ দেশে গঙ্গা বা কোনও নদী, পুকুর বা লেকে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা হাতে আসে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের। হোটেলের ঘরের বাথটবে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা এ দেশে তেমন একটা নেই বলেই জানিয়েছেন ওই বিশেষজ্ঞ।

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, রিপোর্টে যা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে কোথাও বলা হয়নি, শ্রীদেবীর শরীরে বাইরে থেকে কোনও আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। বাথরুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা ছিল। তাই খুন বলা যাচ্ছে না। কোনও ভারী জিনিস দেহে চাপিয়ে শ্রদেবী বাথটাবে ডুবে আত্মহত্যা করেছেন, এমন প্রমাণও পাননি দুবাইয়ের ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা।

শহরের ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রথমে দেখা হয় শরীরের বাইরেটা। সেখানে কোনও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না? তার পর দেহ কেটে হিস্টোপ্যাথলজি ও কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করা হয়। হিস্টোপ্যাথলজিতে দেখা হয় শরীরের কোনও অঙ্গে আগে কোনও রোগ হয়েছিল কি না বা তার মেয়াদ ছিল কত দিনের? আর রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে বিশ্লেষণ (কেমিক্যাল অ্যানালিসিস) করে দেখা হয় বিষ বা অন্য কোনও পদার্থ শরীরে ঢুকে মৃত্যু ঘটিয়েছে কি না? গন্ধ আর বর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমেই তা বোঝা সম্ভব হয়।

তবে, শ্রীদেবীর ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেট হাতে আসার পর দুবাই পুলিশ গোটা ঘটনাটাই সরকারি কৌঁসুলির হাতে সমর্পণ করেছে। তিনি অনেকগুলি দিক খতিয়ে দেখেই তবে সিদ্ধান্ত নেবেন, শ্রীদেবীর দেহ ভারতে কবে পাঠানো সম্ভব! শোনা যাচ্ছে বনি কপূরকে দুবাই পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ওই হোটেলেও গিয়েছে তারা। সিল করে দিয়েছে শ্রীদেবীর সেই ঘর।

দুবাইয়ে দেহের ময়নাতদন্ত হলেও আরও একবার ময়নাতদন্তের জন্য মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবীশের কাছে আবেদন করলেন আইনজীবী ও সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার এস.বালাকৃষ্ণণ ৷ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ইমেল করে তিনি জানান, যে শ্রীদেবীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে এক এক সময় এক একটি তথ্য উঠে এসেছে ৷ কখনও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আবার কখনও বা বাথটাবে জলে ডুবে অভিনেত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে দুবাই পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ৷ তাই প্রশ্ন উঠছে যদি হৃদরোগে আক্রান্তই হন শ্রীদেবী তাহলে তাঁর ফুসফুসে জল ভরল কী করে ? এছা়ড়া রক্তে অ্যালকোহলও পাওয়া গিয়েছে ৷ তাই তিনি পুরপুরি নেশাগ্রস্ত ছিলেন না তো ? এর জন্য মহারাষ্ট্র সরকারের তরফে কোনও ডাক্তারকে দুবাইতে পাঠানো উচিৎ ছিল শ্রীদেবীর ময়নাতদন্ত হওয়ার সময় ৷ কিন্তু সেটা যখন হয়নি তখন শ্রীদেবীর মরদেহ মুম্বইয়ে পৌঁছনোর পর যেন অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার আগে আরও একবার দেহ ময়নাতদন্ত করা হয় ৷ তাহলেই মৃত্যুর আসল কারণ পরিষ্কার হবে ৷

নানা প্রশ্নের উত্তর দুবাই পুলিশও খুঁজছে। তা হলে কি শ্রীদেবীর এই মৃত্যুর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য? সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত পাওয়া মুশকিল।

আনন্দবাজার/এইসময়/নিউজ এইটটিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত