প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমরা কী জহির রায়হানকে ভুলে গেলাম!

জাহাঙ্গীর বিপ্লব : জহির রায়হান। একাধারে তিনি সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা এক ‘সূর্যন্তান’। যাকে আমরা হারিয়েছিলাম আজ থেকে ৪৪ বছর আগে এই দিনে। যে হারানো’টা ছিল একটি স্বাধীন দেশে আমাদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা এবং যা অপ্রত্যাশিত। জহির রায়হান হলেন সত্য ও সাহসিকতকতার চেতনা। তিনি হলেন সেই বিরল হতভাগা, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতেন তাঁর চলচ্চিত্রে। কিন্তু দেশ যখন সত্যি সত্যি স্বাধীন হলো তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তি হয়ে গেলেন জহির রায়হান।
বাংলা চলচ্চিত্রের মেধাবি কিংবদন্তি পরিচালক জহির রায়হানের ৪৪ তম অন্তর্ধান দিবস ছিল মঙ্গলবার। দিবসটি নিয়ে মাথাব্যাথা তো দূরের কথা দিনটির কথাই যেন ভুলে বসে আছে গোটা চলচ্চিত্র পরিবার। প্রতিবার এফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাবে দিবসটি নিয়ে ছোটো-খাটো আয়োজন দেখা গেলেও এবারের চিত্রটা একেবারেই বিচিত্র।

জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবসে এফডিসি আজ যেন আজ নিরব, স্তব্ধ আর নিরেট হয়ে পড়ে আছে। জনমানবহীন এফডিসিতে কেবলই হাহাকার বিরাজ করছে। শোকের বদলে হই-হুল্লোরে মেতে উঠেছে চলচ্চিত্র পরিবার। এফডিসি ছেড়ে গাজীপুরে উল্লাস-উদ্দীপনায় কাটছে চলচ্চিত্রের সকল শিল্পী এবং কলাকুশলীদের।

জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবসেই এবার উদযাপন হচ্ছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির বার্ষিক বনভোজন। চলচ্চিত্রের রেকর্ড সংখ্যক তারকা এবং শিল্পীদের মহা সমাবেশ হচ্ছে আজ। দিনভর সেখানে নাচ, গান এবং খেলাধূলার আয়োজন থাকলেও জহির রায়হানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এক মিনিট নিরবতা পালন করার সময়ই যেন ছিল না কারও।

জহির রায়হানের চলচ্চিত্র জীবন

শুরুতেই জহির রায়হান সম্পর্কে একটু জেনে নিই। জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ’ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাবেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে।

তিনি সালাউদ্দীনের ছবি যে নদী মরুপথেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে এ দেশ তোমার আমার এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কখনো আসেনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র বাহানা মুক্তি দেন। জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়াতে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চল”িচত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র

১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সবেরা’ দিয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন উর্দুতে পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। এরপর ‘বরফ গলা নদী’, ‘শেষ বিকালের মেয়ে’, ‘আর কত দিন’, ‘তৃষ্ণা’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘জীবন থেকে নেয়া, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘স্টপ জেনোসাইড’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মাইলফলক হিসেবে পরিচিত। পরিচালনার পাশাপাশি ছবি প্রযোজনাতে তাকে পাওয়া গেছে। তার প্রযোজনায় নির্মিত হয় মনের মতো বউ, জুলেখা, দুই ভাই, সংসার, শেষ পর্যন্ত এবং প্রতিশোধ।

জন্ম, অন্তর্ধান এবং মৃত্যু

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন: ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।
জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন এবং তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানী আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মীরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেন নি। ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না। মীরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

(সুত্রঃ উইকিপিডিয়া)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত