প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শব্দ দূষণ: আইন আছে প্রয়োগ নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : ১৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার। রাতের ঘটনা। ঘটনাস্থল ঢাকার ওয়ারি। এক ভবনের ছাদে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান চলছিল। আর সেখানে গান বাজানো হচ্ছিল উচ্চ শব্দে। ১১ তলা সেই ভবনের ৯ম তলার বাসিন্দা একজন হৃদরোগী নাজমুল হক (৬৫)। যার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। যারা গান বাজাচ্ছিল তাদের বাবার অসুস্থতার কথা ছেলে নাসিমুল কয়েকবার জানালেও তারা কেউই কর্ণপাত করেননি। উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদ করায় পরদিন সকালে নাসিমুলকে ডেকে মারধর করে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন। কারণ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি ছিল তার ভাইয়ের ছেলের। ছেলেকে মারধরের হাত থেকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা নাসিমুল হক এবং পরে তিনি মারা যান।

এভাবেই ঢাকাসহ দেশজুড়ে বিয়ে বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানসহ নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইকে গান বাজানো যেন একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতার জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসগুলোতে সারাদিন-রাত ধরে উচ্চ শব্দে মাইক বাজালেও কেউ তার প্রতিবাদ করার সাহস পান না। আর শীতকাল এলেই এলাকায় এলাকায় ওয়াজ মাহফিল, কোথাও আবার কীর্তন চলে। এসব মাহফিল বা কীর্তনে একাধিক মাইক বাজানো হয় উচ্চ শব্দে। ফলে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আর ঢাকা শহরে যানবাহনের অতিরিক্ত শব্দ তো আছেই।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়েই শব্দ দূষণ এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। শব্দ দূষণ এখন জীবনবিনাশী শব্দ সন্ত্রাস। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই এর বিরুদ্ধে। এক গবেষণায় জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকার মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ কানে কম শুনবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না।

বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, পরিবেশবাদীদের শত চেষ্টা এবং প্রচারণায় কোনো কাজে আসবে না, যদি না সরকারের সদিচ্ছা থাকে। তিনি জানান, দেশে আইন আছে, তবে এর ব্যবহার নেই। তা হলে আইন তৈরি করা কিসের জন্য? সরকার যদি চায় অবশ্যই জনগণকে মোটিভেট করতে পারে। আমরা আন্দোলন করি, শুধু সরকারের কানে পৌঁছানোর জন্য। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সম্ভব হলে এ দেশে কেন হবে না? শুধুমাত্র উদ্যোগটা দরকার। আর এটা সরকার ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব না।

বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট’ সম্প্রতি ঢাকা শহরের ১০টি স্থানের শব্দ পরিমাপ করে দেখেছে। ঢাকায় নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে গড়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হয়। জরিপে দেখা গেছে, উত্তরার শাহজালাল এভিনিউতে শব্দ মাত্রা সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫ ডেসিবেল, মিরপুর-১ এ সর্বোচ্চ ৯৬ ডেসিবেল, পল্লবীতে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ৫ ডেসিবেল, ধানমণ্ডি বালক বিদ্যালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ১০৭ দশমিক ১, ধানমণ্ডি ৫ নম্বর সড়কে সর্বোচ্চ ৯৫ দশমিক ৫, নিউমার্কেটের সামনে সর্বোচ্চ ১০৪ দশমিক ১, শাহবাগে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৩ এবং সচিবালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ৮৮ ডেসিবেল। অর্থাৎ ‘ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকায় এখন শব্দের সার্বক্ষণিক গড় মাত্রা ১০০ ডেসিবেল’। এ ছাড়া রাজধানীর শ্যামলীতে দশ মিনিটে শব্দ দূষণ ৬শ’টি আর ময়মনসিংহের ব্রিজমোড় এলকায় দশ মিনিটে ১ হাজারটি শব্দ দূষণ হচ্ছে বলে সম্প্রতি এক সমীক্ষায় পাওয়া গেছে বলে জানান মারুফ হাসান।

ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হাসান জানান, এলাকা ভিত্তিতে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য শব্দের মাত্রার পাঁচটি ভাগ আছে। আর সেই হিসেবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা হলো ৪০ থেকে ৭০ ডেসিবেল। অথচ আমরা পরীক্ষায় দেখেছি, কোথাও কোথাও শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার তিন গুণেরও বেশি।
তিনি বলেন, ঢাকায় সাধারণভাবে যানবাহন ও হর্নের শব্দই শব্দ দূষণের মূল কারণ। তবে এর বাইরে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার আর একটি বড় কারণ। যদি আমরা ইনডোর শব্দ দূষণের দিকটি বিবেচনায় নেই তা হলে টাইলস লাগানো, মিউজিক সিস্টেমে জোরে গান বাজানো, ড্রিলিং এগুলোর শব্দ রয়েছে।

জানা গেছে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আলসার, বিরক্তি সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিশু এবং বয়স্করা। এমনকি গর্ভে থাকা সন্তানও শব্দদূষণে ক্ষতির শিকার হয়, অর্থাৎ তাদের শ্রবণশক্তি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক বুলবুল বলেন, ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, হৃদযন্ত্রের কম্পন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়, হজমক্রিয়া ব্যাহত ও মাংসপেশীতে খিঁচুনি হয়, শিশুদের বেড়ে ওঠায় বাধাগ্রস্ত এবং গর্ভবতী নারীদের মৃত সন্তান জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। শব্দ দূষণে মেজাজ খিটখিটে হয়, মনোযোগ নষ্ট হয়। অসুস্থরা এই শব্দ দূষণের বড় শিকার। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে শব্দদূষণ অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ কানে কম শুনবে।

তিনি বলেন, শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬০ ডেসিবেল, সেখানে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকায় এখন শব্দের সার্বক্ষণিক গড় মাত্রা ১০০ ডেসিবেল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল, রাতে ৪৫ ডেসিবেল হওয়া উচিত, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল, রাতে ৫৫ ডেসিবেল, শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডেসিবেল, রাতে ৬৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা থাকা উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ীভাবে বধির করে দেয়। অথচ ঢাকা শহরে শব্দের মাত্রা ধারণা করা হয় ৬০-৮০ ডেসিবেল যা মানুষকে বধির করে দিতে পারে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে জানা যায়, ঢাকায় যানবাহনের শব্দের পরিমাণ ৯৫ ডেসিবেল, কলকারখানায় ৮০-৯০ ডেসিবেল, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁতে ৭৫-৯০ ডেসিবেল, যে কোনো অনুষ্ঠানে ৮৫-৯০ ডেসিবেল, মোটর বাইকে ৮৭-৯২ ডেসিবেল, বাস এবং ট্রাকে ৯২-৯৪ ডেসিবেল যার সবকটিই মানুষের মস্তিষ্কের বিকৃতি এবং জটিল সব রোগ সৃষ্টি করে। অধিদফতরের অন্য এক জরিপে জানা যায়, শয়ন কক্ষে ২৫ ডেসিবেল, ডাইনিং এবং ড্রয়িং কক্ষের জন্য ৪০ ডেসিবেল, অফিসের জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, শ্রেণিকক্ষের জন্য ৩০-৪০ ডেসিবেল, লাইব্রেরির জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালের জন্য ২০-৩৫ ডেসিবেল এবং সর্বোপরি ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া উচিত নয়। অথচ রাজধানীতে সৃষ্ট শব্দের সীমা স্বাভাবিক সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

এ ছাড়া যা থেকে মাত্রাতিরিক্ত শব্দ নির্গত হয় তা হলো- পটকা, বাজি (৯০-১২০ ডেসিবেল), ডিজেল চালিত জেনারেটর (৮০ ডেসিবল), মিছিল, মিটিং এ সেøাগান, লাউড স্পিকার ও মাইকের মাধ্যমে (১১০ ডেসিবেল), ঢোল (১০০ ডেসিবেল)। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এর ২৫, ২৭, ২৮ ধারা মতে- শব্দদূষণ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড উভয়েরই বিধান রয়েছে। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ১৩৯ এবং ১৪০নং ধারায় নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহার ও আদেশ অমান্য করার শাস্তি হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২০০৬ সালের পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ আইনের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী নীরব এলাকায় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দের মাত্রা থাকা বাঞ্ছনীয়। এই আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে নীরব এলাকা চিহ্নিত করা হয়। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে আবাসিক এলাকায় শব্দের মান মাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রের ব্যবহার করা গেলেও রাজধানীজুড়ে নিত্যদিন অবাধে চলছে শব্দদূষণকারী যন্ত্রের ব্যবহার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও বাতাস-শব্দদূষণ কর্মসূচির সদস্য সচিব এম সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, বহু আন্দোলন আর প্রতিক্ষার পর সরকার ২০০৬ সালের নভেম্বরে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করেছে। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রণালয়, পরিবেশ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার হচ্ছে। হর্ন বাজানো যেখানে সম্পূর্ণ নিষেধ সেখানে আমরা দেখতে পাই গাড়ি সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকলে বা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক চালক অহেতুক হর্ন বাজাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ট্রাফিক পুলিশ ইচ্ছা করলেই এটা কমাতে পারে। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে আরো বেশি সক্রিয় ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. রইছউল আলম মণ্ডলের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। মানবকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত