প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জুসের নামে আমরা কি খাচ্ছি?

মো. ওসমান গনি : দেশে উৎপাদিত এবং বাজারজাতকৃত জুস ও ফ্রুট ড্রিংকসে মেশানো হচ্ছে ভেজাল। ভেজাল মিশ্রিত, নিম্নমানের এবং মাত্রাতিরিক্ত এসিটিক এসিড থাকায় এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। গত ১৭ অক্টোবর বুয়েটের রাসায়নিক পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ফ্রুটস্ ড্রিংকসে কমপক্ষে ১০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ফলের রস থাকা বাধ্যতামূলক। বুয়েটের পরীক্ষায় তার অর্ধেকও পাওয়া যায় নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ফ্রুটস্ ড্রিংকস পান করে শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

 

ম্যাংগো জুসে ম্যাংগো নেই-এটাতো সবারই জানার কথা। মনিটরিং না থাকায় বড় বড় কোম্পানীগুলো চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিশু তথা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসব জুস বিক্রি করছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এসোসিয়েশন (এফডিএ) গঠন করতে হবে। সেক্ষেত্রে একই ল্যাবরেটরিতে সব ধরনের খাদ্য ও পানীয় পরীক্ষা করা যাবে। এ ছাড়া বিএসটিআইকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যাতে তারা নিয়মিত মনিটরিং করতে পারে। এর আগে ২০১২ সালে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরিতে দেশের বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত ৭২টি জুস ও ফ্রুটস ড্রিংকসের নমুনা পরীক্ষা করে শতভাগ নমুনায় মাত্রাতিরিক্ত এসিটিক এসিড ধরা পড়েছিল। ২০১৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পরীক্ষায় জুসে বিষাক্ত কেমিক্যাল পাওয়া গিয়েছিল।

 

সে সময়ে শুধুমাত্র ভেজালের কারণে ২০১৩ সালে একটি কোম্পানির কিছু পণ্যের লাইসেন্স বাতিল করেছিল মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই)। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার করে আসছে কোম্পানিগুলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে চার প্রকার জুসের নমুনা সংগ্রহ করে বুয়েটে পাঠায়। গত ১৭ অক্টোবর বুয়েট ওইসব জুসের রাসায়নিক পরীক্ষার পর যে রিপোর্ট দিয়েছে তাতে দেখা যায়, প্রতিটি ফ্রুট ড্রিংকসে ১০ শতাংশ ফলের রস থাকার নিয়ম থাকলেও তার অর্ধেক পাওয়া গেছে। এসব অভিযুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএসটিআইকে গত ১৮ অক্টোবর চিঠি দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে রাজধানীর বিভিন্ন কোম্পানির ৯ ধরনের জুসের গুণগত মান পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্পগবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট। এতে দেখা যায়, জুসে দ্রবণীয় কঠিন বস্তু রয়েছে ৯ থেকে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২-৫ শতাংশ।

 

শিশুদের প্রিয় এসব পণ্যে ক্ষতিকর মাত্রায় সালফার ডাইঅক্সাইড বা সোডিয়াম বেনজয়েটেরও উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০০৭ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন বাজার থেকে সাত ধরনের জুস ও ফ্রুট ড্রিংকস সংগ্রহ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নমুনাগুলোয় ৪০-৫০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) সালফার ডাইঅক্সাইড বা সোডিয়াম বেনজয়েট ছিল। অথচ জনস্বাস্থ্যের জন্য এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা সর্বোচ্চ ১০ পিপিএম। এ ছাড়া নমুনাগুলোয় এসিটিক এসিড পাওয়া যায় ২ দশমিক ৩৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ক্ষতিকর এসব উপাদানের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার প্রিজারভেটিভও রয়েছে। অন্যদিকে, জুস ও ফ্রুট ড্রিংকসে ভেজাল থাকার অভিযোগে ২০১২ সালের ১৩ অক্টোবর ৩১ কোম্পানির বিভিন্ন সার্টিফিকেশন মার্কস (সিএম) লাইসেন্স বাতিল করে দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআই। দেশের খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমল পানীয় ও জুসের নামে শিশুসহ আমরা যা পান করছি তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। জুসে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ সোডিয়াম সাইক্লামেট, কাপড়ের রং, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিভ (সোডিয়াম বেনজোয়িক ও পটাশিয়াম)। অম্লতা বাড়াতে ফসফরিক এসিড এবং ঠা-া রাখতে ইথিলিন গ্লাইকলও মেশানো হচ্ছে।

 

জুসের নামে এসব পানীয় দীর্ঘদিন পানের ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, দাঁতের ক্ষয়, কিডনির সমস্যাসহ নানা রোগ হতে পারে। শিশু ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পানীয় মানবদেহের জন্য ভয়াবহ হয়ে দেখা দিচ্ছে। ১০ বছর আগেও দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ। এখন এ সংখ্যা দুই কোটির বেশি এবং তাদের অর্ধেকই শিশু। এ ছাড়া দেশে বছরে অন্তত ৮৪ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। কৃত্রিম সুগন্ধি মেশানো এসব পানীয় গর্ভবতী ও বৃদ্ধদের জন্যও ক্ষতিকর।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ