মনিরুল ইসলাম : দেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত সময়সীমা—ডিসেম্বর। একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ থেকেও একই সময়কে সামনে রেখে সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন করে উত্তেজনা, জল্পনা ও বিশ্লেষণের ঢেউ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই দুই ধারার ঘোষণার মধ্যে কাকতালীয়তার চেয়ে বেশি কিছু থাকতে পারে। বিশেষ করে ডিসেম্বরকে ঘিরে ‘পটপরিবর্তনের সম্ভাবনা’ নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতির ইঙ্গিতও মিলছে বিভিন্ন মহল থেকে। এতে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সমীকরণের পুনরাবৃত্তির প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যে চাপে ফেলার বক্তব্য যেমন আসছে, তেমনি ক্ষমতাসীনদের দিক থেকেও কড়া অবস্থান স্পষ্ট করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সতর্ক করে বলেন, অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় তার সেই সুযোগও শেষ হয়েছে বলে সরকারি পক্ষের বক্তব্য।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, দেশে ফিরলে তাকে সরাসরি আইনের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, আইনি দিক থেকে এখন পরিস্থিতি এমন যে, তিনি দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়াই সামনে থাকবে।
অন্যদিকে, দেশে ফেরার বাস্তবতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় তাকে ফিরতে হলে ‘ট্রাভেল পাস’ নিতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত তিনি এমন কোনো আবেদন করেননি। ট্রাভেল পাস ছাড়া আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বা সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব নয়, ফলে তার প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো সম্ভাব্য জোট সমীকরণ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের বোঝাপড়ার ইঙ্গিত নিয়ে বিরোধী দলগুলোর একটি অংশের দিকে আঙুল তুলছে বিএনপি নেতৃত্ব। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে ঘিরে এই বিতর্ক জোরালো হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দলগুলো স্পষ্টভাবে বলছে, বর্তমান বাস্তবতায় এমন কোনো জোটের সুযোগ নেই।
এদিকে ১১-দলীয় জোটের কিছু নেতা ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। অলি আহমদ সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে দাবি করেন, জনমনে ইতোমধ্যে ‘ডিসেম্বরে পরিবর্তন’ ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক সমীকরণ। একদিকে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে আন্দোলনের প্রস্তুতি—এই দুই প্রবাহ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটুকু স্পষ্ট, সামনের কয়েক মাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।