এল আর বাদল : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের কয়েকটি এলাকায় এতদিন ধরে বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলেছিলেন দলের নেতা-কর্মীরা৷ অন্তত একটি এলাকায় বিএনপি নেতারা তাদের সহযোগিতাও করেছেন৷ অবশ্য পরে আবার কার্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে গেছে৷
১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা৷ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো৷ নেতা-কর্মীরা সেখানে ঢুকে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে দেন৷ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ডও লাগানো হয়৷ কিন্তু রাতে ওই কার্যালয় আবার ভাঙচুর করা হয়৷
বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ওইদিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে৷ -------- ডয়েচেভেলে
শেখ হাসিনা কি আসলেই এরকম কোনো নির্দেশ দিয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে বলেন, আমাদের নেত্রীর নির্দেশনা হলো আমাদের পোড়া বাড়িতেও যেতে হবে৷
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্যপ্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, আমার জানা মতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অফিস খোলার ব্যাপারে কোনো অফিসিয়াল নির্দেশ দেননি নেতা-কর্মীদের৷ তিনি বারণও করেননি৷ যা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হচ্ছে৷ এটা আগামী দিনে আরো ঘটবে৷ আমরা কিছুদিন পর হয়তো কর্মসূচি দেবো৷
কার্যালয় খোলার কয়েকটি ঘটনা
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিনই পঞ্চগড় সদরে চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসের তালা খুলে ঢুকে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা৷ তার সেখানে স্লোগানও দেন৷ সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ খান৷ তবে পরে আবার ওই অফিসে তালা মারা হয়৷
এনিয়ে আবু দাউদ খান বলেন, ‘‘আসলে ওটা আওয়ামী লীগের অফিস ছিলো না৷ ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ অফিস ছিলো৷ পরে ওটা স্থানীয় বণিক সমিতির অফিস করা হয়৷ কিন্তু স্থানীয় জামায়াত নেতারা ওটা দখল করে ভাড় দিয়েছিলো৷ নির্বাচনের পরদিন আমাকে জানালে আমি ওটা দখলমুক্ত করে বণিক সমিতির কাছে চাবি হস্তান্তর করি৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমি কেন আওয়ামী লীগের অফিস খুলতে সহায়তা করব? আমার নামে তো আওয়ামী লীগের সময়ে অনেক মামলা হয়েছে৷
পটুয়াখালী দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে৷ অফিস খোলার পর সেখানে ছাত্রলীগ- যুবলীগের নেতা-কর্মীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মোনাজাত করেন৷ পরে অবশ্য ওই কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়৷
একইদিন বিকালে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রবেশ করেন৷ সেখানে তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিতে মালা দিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দেন৷ এরপর তারা তালা লাগিয়ে চলে যান৷ তারা ছবি তুলে ফেসবুকেও দিয়েছেন৷
খুলনা জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান ফয়জুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ‘‘বিএনপির ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে চাইছে৷ তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কাজে লাগিয়েছে৷ এখন তারা তার প্রতিদান নিচ্ছে৷ তবে তারা সফল হবে না৷ তাদের প্রতিরোধ করা হবে৷
বরগুনার বেতাগী উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনাটি ঘটে ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর৷ সেদিন বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে৷ তার নির্দেশ পেয়েই আমরা বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে যাই এবং দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও দলীয় কার্যালয়ের ব্যানার টাঙাই৷
তবে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল কবির রেজা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা নেত্রীর সরাসরি কোনো নির্দেশ নয়৷ তবে তিনি আমাদের সক্রিয় হওয়ার জন্য সবসময়ই তাগিদ দেন৷ আমরাতো যেভাবেই হোক দেশে আছি৷ আমরাতো রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চাই৷ একটি নির্বাচন হয়েছে৷ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে৷ আমরা আরো সক্রিয় হবো৷
আর বরগুনা পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, ‘‘নির্বাচনে ভোটের জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকে কাজে লাগিয়েছেন৷ ভোট নিয়েছেন৷ কিছু প্রতিশ্রতিও দিয়েছেন৷ আর সেই কারণেই আওয়ামী লীগ অফিস খোলার সুযোগ পাচ্ছে, তবে এরকম হওয়া ঠিক না৷ জেলার এনসিপি নেতা মীর নিলয় বলেন, একটি দল তাদের এখন পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে৷ এটা খুবই দুঃখজনক৷ আমরা এটা হতে দেব না৷
১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকাল সাতটার দিকে ছাত্রলীগের ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতা-কর্মী তালা ভেঙে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ঢোকেন৷ এরপর ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন৷ পরে কার্যালয়টিতে একটি ব্যানার টাঙিয়ে সটকে পড়েন তারা৷
শেখ হাসিনা কী আসলেই নির্দেশ দিয়েছেন?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘আমাদের নেত্রীর নির্দেশনা হলো আমাদের পোড়া বাড়িতেও যেতে হবে৷ শুধু আওয়ামী লীগের অফিস নয়, ৩২ নাম্বার ধ্বংস করা হয়েছে৷ আমাদের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে৷
নেত্রীর নির্দেশনা হলো তৃণমূল থেকে সব পর্যায়ের কার্যালয়ে আমাদের যেতে হবে৷ আমাদের নেতা-কর্মীরা তো দেশে আছে৷ এখন যেহেতু ড. ইউনূসের বিদায়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে তাই নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ে যাচ্ছে৷ কার্যালয় খুলছে৷ আত্মগোপন থেকে আমাদের নেতা-কর্মীরা আরো বেরিয়ে আসবে৷ দেশেও ফিরবে৷’’
তিনি বলেন, ‘‘গত ১৮ মাস অবৈধভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা হয়েছে৷ অফিসে তালা মেরে দেয়া হয়েছে৷ এর অবসান ঘটবে৷’’
আর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন,
আমাদের নেতা-কর্মীরা মনে করেন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তারা গণতান্ত্রিক আচরণ করবে৷ তাই আমাদের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস খুলছে৷ তবে আমাদের নেত্রীর নির্দেশনা আছে যে পার্টি অফিস খুলতে হবে৷ সেখানে বসতে হবে৷ আমরা তো কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছি না৷ আমরা স্বাভাবিক রাজনীতি করতে চাই৷ আমাদের পার্টি তো নিষিদ্ধ করা হয়নি৷
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, ‘‘আমার জানামতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অফিস খোলার ব্যাপারে কোনো অফিসিয়াল নির্দেশ দেননি নেতা-কর্মীদের৷ তিনি বারণও করেননি৷ যা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হচ্ছে৷ এটা আগামী দিনে আরো ঘটবে৷ আমরা কিছুদিন পর হয়তো কর্মসূচি দেব৷
তিনি বলেন, যেভাবেই হোক একটা একতরফা নির্বাচন হয়েছে৷ এনজিওগ্রাম সরকার চলে গেছে৷ মানুষের মধ্যে কনফিডেন্স ফিরে আসতে শুরু করেছে৷ ফলে মানুষ এখন বেরিয়ে আসবে৷ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও প্রকাশ্যে আসবে৷
বিএনপি-এনসিপি কী বলছে?
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অফিস খোলার জন্য সরাসরি বিএনপির সহযোগিতাকে দায়ী করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি আবার ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে চায়৷ আমরা দেখেছি বিএনপি নেতারাও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে সহায়তা করছেন৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে দেখছি৷
আর নির্বাচনের সময় দেখেছি আওয়ামী লীগের যারা হত্যা মামলার আসামি তারাও বিএনপির সঙ্গে কাজ করছে৷ তাদের পোলিং এজেন্ট হয়েছে৷ তারা ধানের শীষে ভোট চাইতে গিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছে৷ বিএনপি তার ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে, ফিরিয়ে আনছে৷ কিন্তু এটা করে বিএনপির শেষ পর্যন্ত লাভ হবে না৷ তারা এখন জুলাইয়ের সংস্কারকেও অস্বীকার করছে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার জন্য৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ যদি ফিরে আসে তখন বিএনওি থাকবে না৷
তবে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের অফিস খুলছে -এরমধ্যে আমি খারাপ কিছু দেখি না৷ যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার হবে৷ তারা শাস্তি পাবে৷ কিন্তু কোনো দলের রাজনীতি আমি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই৷
বিএনপি ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে- এই অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতি করা তো গণতান্ত্রিক অধিকার৷ তারা যদি রাজনীতি করে তাহলে সেটা ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দেয়া হবে কেন? যে যতটুকু অপরাধ করবে ততটুকু শাস্তি পাবে৷ কিন্তু তাদের অফিস বন্ধ করে রাখা, রাজনীতি করতে না দেয়া তো গণতান্ত্রিক হতে পারে না৷’’
এ বিষয়ে চেষ্টা করেও জামায়াতে ইসলামীর কোনো কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি৷