শিরোনাম
◈ এ মাসের মধ্যেই হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে: নৌ উপদেষ্টা ◈ বাংলা‌দে‌শের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দ‌লে নেই শান্ত ◈ হলফনামায় চমক: জোনায়েদ সাকির চেয়ে স্ত্রীর সম্পদ অনেক বেশি ◈ নি‌জের মাঠেই হোঁচট খে‌লো লিভারপুল ◈ বাছাইয়ের প্রথম দিনে বিএনপি-জামায়াতসহ হেভিওয়েট যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলো ◈ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী পাবেন, ‘না’ দিলে কী পাবেন না ◈ বগুড়া-২ আসনে মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ◈ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাদি হত্যার বিচার না হলে সরকার পতনের আন্দোলন: ইনকিলাব মঞ্চ (ভিডিও) ◈ খালেদা জিয়ার ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম ও শৈশব নিয়ে যা জানা যায় ◈ ২১ বছর পর চূড়ান্ত হলো জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতিমালা, নগরায়ণে নতুন দিশা দিচ্ছে সরকার

প্রকাশিত : ০২ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:৩৫ দুপুর
আপডেট : ০২ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:১৫ রাত

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

এল আর বাদল : কখনও রাজনীতি করেননি। কিন্তু খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম । ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মানুষের ভিড়ে কথা হয় ৬৮ বছর বয়সী এই মি.ইসলামের সঙ্গে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ পর্যায়ে কারাবন্দি থাকা এবং দীর্ঘ সময়ের অসুস্থতার কারণে তার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল মি. ইসলামের। সেকারণে বিএনপি নেত্রীর জানাজায় শরিক হন বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে দলমত নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে খালেদা জিয়ার জানাজা ইতিহাস গড়ল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তারা বলছেন, স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর কারণে আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। এরপর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে 'আপসহীন' পরিচিতি পেয়ে একটা প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন। -------- বি‌বি‌সি বাংলা

খালেদা জিয়ার চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে লম্বা সময় ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন এই দুই নেত্রী; তাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত ছিল রাজনীতি। তারাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন রাজনীতির মঞ্চ থেকে। অন্যদিকে, প্রায় দেড় বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেখানেই অবস্থান করছেন। এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

প্রভাবশালী এই রাজনীতিক রেখে গেলেন সেই দল বিএনপি, যে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর ধরে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থান ঠেকেছিল বৈরি সম্পর্কে। তাদের মুখোমুখি অবস্থানের রাজনীতি চলেছে দশকের পর দশক।

বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে 'দুই বেগমের যুদ্ধ' বলে চিত্রিত করেছে।

দুই নেত্রীই গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাদের দুজনের শাসনামলেই মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমবেশি অভিযোগ, সমালোচনা রয়েছে।

২০০১ সালে খালেদা জিয়ার পূর্ণ মেয়াদের দ্বিতীয় দফার সরকার গঠনের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অনেক অভিযোগ উঠেছিল।

সেই সরকারের এক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে সেনাবাহিনীকে দিয়ে অপরেশন ক্লিনহার্ট নামে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চালানো হয়েছিল।

৮৪ দিনের ই অভিযানেআটকের পর অন্তত চল্লিশ জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। অভিযান শেষে অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবিযোগে সোচ্চার হয়েছিলএবং সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের ওই সরকারের সময়ই পুলিশের বিশেষ বাহিনী র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল। র‍্যাবের হাতেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ উঠেছিল।

তবে এর সঙ্গে তুলনা করলে শেখ হাসিনার সর্বশেষ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানুষের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা মামলার ভারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। গ্রেফতার আতঙ্কতো ছিলই। তাদের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রেও সরকারের বাধা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন,আওয়ামী লীগের ওই শাসনে বিরোধী মতও দমন করা হয়েছে কঠোরভাবে। ব্যক্তিগভাবে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করলেও তার ওপর সরকারের খড়গ নেমে আসতো।

দমন নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনার টানা শাসনে প্রতিহিংসার রাজনীতির চূড়ান্ত একটা অবস্থা দৃশ্যমান হয়েছিল। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছর কারাবন্দী করে রাখা হয়েছিল।

টানা ক্ষমতায় থাকার চিন্তা থেকে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করে নির্বাচনী ব্যবস্থাই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার জনবিচ্ছীন্ন হয়ে পড়েছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তারা বলছেন, এসব কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল; গণ-অভ্যত্থানে পতন হয়েছে শেখ হাসিনার শাসনের।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার স্বল্পভাষী হওয়া, সহনশীল আচরণ দেখানোর বিষয় রাজনীতিতে ও সাধারণ মানুষের মধ্যেএকটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল। আর সেকারণে তিনি একটা 'স্বতন্ত্র' রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে কখনো হারেননি তিনি।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দ্বি-দলীয় বা দুই দলের রাজনীতির জায়গায় পরিবর্তনের কথা আলোচনায় এসেছিল। জোর আলোচনা ছিল নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে।

কিন্তু সেই আলোচনা থমকে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। তাদের মতে, দ্বি-দলীয় রাজনীতির সেই ধারাই দেখা যাচ্ছে।

সেখানে পরিবর্তন এটাই হয়েছে যে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে তাদের পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী। বারই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরে অন্য দলগুলো আসন সমঝোতায় দুই ধারায় বিভক্ত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের শাসনের পতনে রাজনীতিতে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। এরই মাঝে খালেদা জিয়ার মৃতুতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু দ্বি-দলীয় রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে আসা কতটা সম্ভব হবে, সে প্রশ্নে সন্দেহ রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

খালেদা-হাসিনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বৈরিতা 

সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করেছিলেন খালেদা জিয়া। সেই আন্দোলনেই 'আপসহীন' নেত্রীর পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।

যদিও পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সখ্য ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে সমালোচনা রয়েছে।

দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষাপটে ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরেছিলেন। এরপর ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবন।

খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপির হাল ধরেই নেমেছিলেন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে। তিনি তখন বিএনপির নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট গঠন করে সেই আন্দোলনের নেতৃত্বের সামনের সারিতে অবস্থান করে নেন।

অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছরের মাথায় তার কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগও সমমনা বিভিন্ন দলকে নিয়ে আট দলীয় জোট গঠন করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নামে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জোটের বাইরে বামপন্থি পাঁচ দলীয় জোটও সেই আন্দোলনে ছিল।

যদিও সেই আন্দোলনে তিনটি জোট সমন্বয় করে কর্মসূচি নিয়ে পৃথকভাবে তা পালন করে এগিয়েছে এবং তিন জোটের আন্দোলনেই গণ-অভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদের শাসনের পতন হয়।

কিন্তু এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। আর সেই আন্দোলনেই তাদের পরিচিতি হয়েছিল 'দুই নেত্রী' হিসেবে।

সে সময় তাদের দুজনের নেতৃত্বে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে দুই নেত্রীকে মুখোমুখি বৈঠকে বসানোর এক ধরনের তাগিদ তৈরি হয়েছিল।

তখনও তাদের একসঙ্গে বৈঠকে বসাতে বেগ পেতে হয়েছিল সেই আন্দোলনের অন্য নেতাদের। তবে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বৈঠকে বসেছিলেন এবং সেই বৈঠকের প্রভাবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গতি পেয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দুই নেত্রী, তাদের নেতৃত্বে দল ও জোটের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতপূর্ণ হলেও রাজনীতিতে একটা সহনশীলতা ছিল।

লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দুজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় থাকলেও বৈরি সম্পর্ক তখনও তৈরি হয়নি। পরে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্ক পৌঁছায় বৈরিতায়।বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দুই নেত্রীর নেতৃত্বে প্রথম দুটি সরকারের সময়ও অনেকটা সহনশীল পরিবেশ ছিল।

নব্বইয়ের আন্দোলনে এরশাদের শাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে।

সেই সরকারের শেষ দিকে অন্য দলগুলোকে নিয়ে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তাদের আন্দোলনের মুখে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন করেছিলেন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সেই সরকার টিকেছিল মাস দুয়েকের মতো। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর দাবির মুখে একতরফা ওই সংসদে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাস মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়।

এরপর বিএনপি সংসদ ভেঙে দিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতায় আসে। সেটি ছিল শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। যদিও আওয়ামী লীগের সেই সরকারের সময়ও অনেকটা সহনশীলতা ছিল এবং সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পৌঁছায়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

তবে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে দুই নেত্রীকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক বিভাজন বাড়তে থাকে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দুই নেত্রীর সম্পর্ক বৈরিতার দিকে এগোতে থাকে। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ চার দলীয় জোট সরকার গঠন করেছিল।

২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় কমপক্ষ ২৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর দুই নেত্রীর সম্পর্ক চরম বৈরিতায় পৌঁছায়। সেই থেকে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক ফেরত আসেনি। দুই নেত্রীর সম্পর্কের বৈরিতার প্রভাবেই বিভাজনের রাজনীতি এগিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

সম্পর্কের বাঁকবদল যে সব ঘটনায়

 বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকারের শাসনের সময় ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা রাজনীতিতে বৈরী সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় উপাদান হিসেবে কাজ করে।

আওয়ামী লীগের শাসনে ২০১০ সালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়। এই ঘটনাকে প্রতিহিংসার রাজনীতির একটা প্রকাশ বলে আলোচনা রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু তাদের সম্পর্কের তিক্ততার প্রভাবে প্রতিহিংসার রাজনীতি চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়েছিল রাজনীতিকদের।

সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নে রাজপথে হতাহতের ঘটনায় সহিংস পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গিয়েছিল সেনাসমর্থিত একটি সরকারের হাতে।

সেনাসমর্থিত সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুই নেত্রীকে জেলে যেতে হয়েছিল। নির্যাতন নেমে এসেছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ওপর।

তখন দুই নেত্রীকে মাইনাস করা অর্থ্যাৎ 'মাইনাস টু' এবং দলগুলোয় সংস্কারের ফর্মূলা আলোচনায় এসেছিল। যা পরে কার্যকর করতে পারেনি সেই সরকার।

সে সময় বিএনপিই বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে, ২০০৮ সালে সমঝোতার ভিত্তিতে জেল থেকে বেরিয়ে নির্বাসনে লন্ডন যান তারেক রহমান।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে গত ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান; শেষ হয় তার ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল। খালেদা জিয়া বিপর্যস্ত সেই বিএনপিকে ধরে রেখে আবার প্রভাবশালী দলে পরিণত করতে পেরেছিলেন।

বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে সংসদের বাইরে চলে যায়। সেই নির্বাচন ঘিরে তাদের আন্দোলন তখন সহিংস রুপ নিয়েছিল। এ ব্যাপারে সমালোচনা ছিল। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়ে মাত্র পাঁচটি আসন পেয়েছিল।

কিন্তু 'রাতের ভোট' বলে সেই নির্বাচন ঘিরে নানা অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ আছে। বিতর্কিত দুটি ভোট ছাড়াও আওয়ামী লীগের শাসনে সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি ও তার মিত্ররা।

বিতর্কিত এই নির্বাচনগুলো ঘিরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পৌঁছেছিল। এরআগে ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সাজা দিয়ে কারাবন্দী করা হয়েছিল।

দুই বছর পর করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই মুক্তি ছিল ঢাকায় বাসভবন ও হাসপাতাল যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়