শিরোনাম
◈ আজ থেকে আমানতের অর্থ ফেরত পাবে একীভূত ৫ ব্যাংকের গ্রাহকরা ◈ শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ◈ আসছে বড় সুখবর, ২০২৬ সালে কোন মাসে কত দিন টানা ছুটি পাবেন চাকরিজীবীরা, দেখুন তালিকা ◈ যে ওভারকোট জিয়া পরিবারের আর কখনো ফেরত দেওয়া হয়নি ◈ জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী এক বছরে উপহার পেয়েছেন ১৫ ভরি সোনা, রয়েছে নগদ ১৮ কোটি টাকা ◈ নতুন বছরে কমলো জ্বালানি তেলের দাম ◈ হলফনামায় প্রকাশ: কে কত ধনী — শীর্ষ রাজনীতিবিদদের আয় ও সম্পদের চিত্র ◈ বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের নজরদারিতে নোয়াখালীর সহকারী কোচ নিয়াজ খান ◈ ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য রেকর্ড ১৫ কোটি টিকেটের আবেদন   ◈ ব্রা‌জি‌লিয়ান রবের্তো কার্লোস হাসপাতালে, হয়েছে অস্ত্রোপচারও: কেমন আছেন কিংবদন্তি ফুটবলার?

প্রকাশিত : ০১ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:১৯ দুপুর
আপডেট : ০১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:৩৮ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

যে ওভারকোট জিয়া পরিবারের আর কখনো ফেরত দেওয়া হয়নি

এল আর বাদল : ১৯৭১ সালের মার্চের একেবারে শেষ দিকের কথা। পার্বত্য চট্টগ্রামের যে সাজেক ভ্যালিতে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের গেরিলারা প্রশিক্ষণ শিবির তৈরি করে বহু বছর ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন চালাচ্ছেন, সেই ক্যাম্পের সামনেই শেষ বিকেলে এসে থামল সামরিক বাহিনীর দুটি জিপ।

মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এমএনএফের 'সুপ্রিম কমান্ডার' লালডেঙ্গা সে দিন ওই ক্যাম্পেই, তিনি বোধহয় তখন সঙ্গীদের নিয়ে বসে 'বাই' বা এক ধরনের মিজো স্যুপ খাচ্ছিলেন।

এমনিতে পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের অতিথি হিসেবে ঢাকার লালমাটিয়াতেও তার নিবাস ছিল – কিন্তু সে দিন কোনো কাজে তিনি নিজেও ওই শিবিরেই অবস্থান করছেন। ----- বি‌বি‌সি বাংলা

যথারীতি লালডেঙ্গার সঙ্গে প্রায় ছায়ার মতো সেঁটে রয়েছেন তার বিশ্বস্ত অনুচর ও তরুণ কমান্ডো জোরামথাঙ্গা, যিনি এর প্রায় সাতাশ বছর পর ভারতের অঙ্গরাজ্য মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী হবেন।

যাই হোক, জিপ থেকে নামলেন সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান – চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহকারী কমান্ডিং অফিসার হিসেবে মিজো নেতৃত্বর সঙ্গে যার অনেক আগে থেকেই খুব ভাল হৃদ্যতা ছিল।

এর মাত্র চার-পাঁচ দিন আগেই ঢাকায় পাকিস্তানি সেনার ক্র্যাকডাউনের পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পুরোদস্তুর শুরু হয়ে গেছে – চট্টগ্রামে কমান্ডিং অফিসারকে বন্দি করে মেজর জিয়া শুধু বিদ্রোহই ঘোষণা করেননি, কালুরঘাটে বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার বিখ্যাত ঘোষণাও পাঠ করে ফেলেছেন।

এসব খবর মিজো নেতৃত্বরও অজানা ছিল না, ফলে জিয়াউর রহমান আচমকা তাদের ক্যাম্পে কেন এসে হাজির – তা আঁচ করতে লালডেঙ্গারও বোধহয় অসুবিধা হয়নি।

মিজো রীতিতে সামান্য অতিথি আপ্যায়ন শেষ হতে না হতেই মেজর জিয়াউর রহমান লালডেঙ্গাকে বললেন, "আপনার সময় বেশি নষ্ট না করে সরাসরি আসল কথায় আসা যাক!

লালডেঙ্গাও ঝটিতি জবাব দিলেন, "বলুন বলুন – যে কোনো দিন আপনি যে এসে পড়বেন আমি ধারণাই করেছিলাম!"

এই পুরো গল্পটা বছর তিনেক আগে এই প্রতিবেদককে শুনিয়েছিলেন মিজোরামের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা নিজেই – আইজলে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসেই। ঘটনাটা তার একেবারে চোখের সামনেই ঘটেছিল – ফলে বাকিটা শোনা যাক জোরামথাঙ্গার নিজের বয়ানেই।

আর প্রোটেকশন পাবেন না

মেজর জিয়া সে দিন আমাদের আসলে যেটা বলতে এসেছিলেন, তা হল তার রেজিমেন্ট পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ডিফেক্ট করে ফেলেছে – ফলে তারা এখন থেকে আমাদের আর কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবেন না।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে মিজো গেরিলারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় পেয়েছিল পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তেই, আর পাকিস্তানি সেনারা আমাদের সব ধরনের সহযোগিতাও করত যথারীতি।

সীমান্তের কাছে প্রশিক্ষণ শিবির ও ঘাঁটি তৈরি করেই তখন ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন চালাচ্ছিল এমএনএফ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধর সূচনা এই পরিস্থিতিটাকে রাতারাতি বদলে দিল।

মেজর জিয়ার প্রস্তাব ছিল – হয় আমরা তাদের মতো মুক্তি-সমর্থক বিদ্রোহী সেনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরি, কিংবা যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরে গিয়ে বার্মার আরাকান হিলসের দিকে চলে যাই। মানে এই লড়াইয়ের মধ্যে যেন না থাকি!

কিন্তু আমরা যদি সাজেক ভ্যালিতে থেকে যাই, আগের মতো তারা যে আমাদের কোনও সাহায্য করতে পারবেন না বা সুরক্ষাও দিতে পারবেন না – সেটাও পরিষ্কার জানিয়ে দেন তিনি।

আমার মনে আছে তিনি সে দিন বলেছিলেন, "মিজোদের সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই, বরং আমরা তাদের ভালইবাসি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাদের সত্যিই কিছু করার নেই!"

সুপ্রিম কমান্ডার ধৈর্য ধরে তার সব কথা শুনলেন। তারপর লালডেঙ্গা ধীরে ধীরে বললেন, 'আমাদের মূল লড়াই যাদের বিরুদ্ধে, সেই ভারত আপনাদের সঙ্গে আছে – আমরা কী করে আপনাদের সঙ্গে যাব বলুন?"

"তা ছাড়া যে পাকিস্তান সরকার আমাদের এখানে আশ্রয় দিয়েছে, আতিথেয়তা দিয়েছে - তাদের সঙ্গে বেইমানি করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এমএনএফ যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেবে, সেটাও তিনি দৃঢ ভঙ্গীতে জানিয়ে দিলেন। আর লালডেঙ্গার সেই কথাগুলো শুনে মেজর জিয়াও বুঝে গিয়েছিলেন এ নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

'আজকের রাতটা থেকেই যান বরং'

এদিকে কথায় কথায় আলো পড়ে এসেছিল। পাহাড়ে এমনিতেই সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি, সে দিনের আলোচনাও চলেছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরে।

অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে দেখে লালডেঙ্গা অতিথিকে বললেন, "আপনার আজ আর শহরের দিকে ফেরাটা উচিত হবে না, রাতটা বরং আমাদের সঙ্গেই থেকে যান।"

সাতপাঁচ কী ভেবে মেজর জিয়াও তাতে রাজি হয়ে গেলেন – কিন্তু মুশকিল হলো, তিনি যেহেতু রাত্রিবাসের জন্য তৈরি হয়ে আসেননি তাই সঙ্গে কোনও চেঞ্জ পর্যন্ত ছিল না।

তার ওপর চৈত্রের রাতেও সাজেক ভ্যালিতে ঠান্ডা কম নয় – আর সে দিন শীতটাও পড়েছিল জাঁকিয়ে।

ঠান্ডায় মেজর জিয়ার কষ্ট হচ্ছে দেখে সুপ্রিম কমান্ডারই তখন বললেন, "আমাদের কারও একটা ওভারকোট ওকে দেওয়ার ব্যবস্থা করো।

তড়িঘড়ি খুঁজে পেতে বের করা হল মোটামুটি ওনার মাপেরই একটা ওভারকোট। সেটা আসলে যার ছিল, সেই কমরেড আবার সে দিন ক্যাম্পেই ছিলেন না।

তবে সেই ওভারকোট যে তার গায়ে ফিট করেছিল তা মোটেও নয় – কিন্তু উনি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে সেটাই গায়ে জড়িয়ে একটা ক্যাম্প চেয়ারে আধশোয়া হয়ে দিব্বি গোটা রাত কাটিয়ে দিলেন।

ক্যাম্পে আমাদের সঙ্গে রাতের খাবার কী খেয়েছিলেন, আজ আর এতদিন বাদে সে সব মনে নেই!

তারপর হালকা ভোরের আলো ফুটতেই সঙ্গীদের তৈরি হওয়ার নির্দেশ দিয়ে জিপ হাঁকিয়ে চট্টগ্রামের দিকে তীরবেগে রওনা হয়ে গেলেন জিয়াউর রহমান। তখনও তার গায়ে জড়ানো সেই বেঢপ জংলাছাপ মিলিটারি ওভারকোট!

'খালেদার কাছে ফেরত চেয়েছিলাম' 

চলে আসা যাক সেই ঘটনার ঠিক পঁয়ত্রিশ বছর বাদে – ২০০৬ সালের মার্চ।
জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া তখন তার দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লিতে এসেছেন।

জোরামথাঙ্গা বলছিলেন, এদিকে ১৯৮৬তে মিজো শান্তিচুক্তির পর মিজোরাম যে ভারতের আলাদা অঙ্গরাজ্য হয়েছে, আমি তখন সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। আমারও দ্বিতীয় মেয়াদ চলছে।

বাংলাদেশের লাগোয়া একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরের সময় আমাকেও কেন্দ্রীয় সরকার রাজধানীতে ডেকে পাঠাল, ব্যবস্থা হল সফররত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা মুখোমুখি বৈঠকের।

দিল্লির সেই বৈঠকেই আমি সে দিন সাজেক ভ্যালির ক্যাম্পের পুরো ঘটনাটা মিসেস জিয়াকে খুলে বললাম – উনি মনে হল এটার বিন্দুবিসর্গও জানতেন না।

তারপরই হাসতে হাসতে বললাম, "আচ্ছা আমার কমরেডের ওভারকোটটা কিন্তু জিয়াউর রহমান সাহেব আর ফেরত দেননি, একটু খুঁজে দেখবেন আপনার বাড়িতে কোথাও পড়ে আছে কি না?"

এবার মিসেস জিয়ার হেসে কুটোপাটি হওয়ার পালা!

তিনিও পাল্টা রসিকতার জবাব দিলেন, "নিশ্চয়ই খুঁজে দেখব। আর পেলেই আপনাকে দাওয়াত করব, আপনাকে কিন্তু ঢাকায় এসে ওটা ফেরত নিয়ে যেতে হবে।

সত্যি বলতে কী, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ঢাকায় ফেরার ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীকে ঢাকায় আসার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি চিঠিও পাঠান।

কিন্তু ওভারকোট খুঁজে পাওয়া গেছে কি না, চিঠিতে তার কোনও উল্লেখ ছিল না।

জোরামথাঙ্গা বলছিলেন, এদিকে সেই চিঠি লেখার কিছুদিন পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে, তিন-চার মাসের মধ্যেই বোধহয় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেও সরে দাঁড়াতে হয় খালেদা জিয়াকে।

ফলে আমারও তখন আর ঢাকায় যাওয়া হয়নি। জিয়া পরিবারেরও আর কখনোই ফেরত দেওয়া হয়নি আমাদের মিজো গেরিলাদের থেকে ধার-করা সেই ওভারকোট!

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়