শিরোনাম

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০১:০৮ রাত
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০১:০৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলা ভাষা বিবর্তনের তিন পর্যায়প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক বাংলা 

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে আন্দোলনটা ছিলো, সেটা বাংলা ভাষার আন্দোলন ছিলো না। সেটা ছিলো মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতির আন্দোলন। বাংলা ভাষার আন্দোলন বহু পুরোনো। আজকের বাংলা ভাষা একদিনে রাতারাতি হয়ে যায়নি। আজকের বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় দেখছি ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন করছে। কেন করছে জানি না। পশ্চিমবঙ্গ কবে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলন করলো, যেখানে হিন্দি ভাষা ক্রমশ বাংলা ভাষাকে গ্রাস করে ফেলছে? বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সূত্রপাত হলো বিদেশিদের হাত ধরে এবং তাতে রূপ দিলেন সংস্কৃত পণ্ডিতগণ। বাংলা ভাষা গদ্য-সাহিত্য হলো বটে, কিন্তু তা ছিলো প্রায় ৮৫ শতাংশ সংস্কৃত ভাষা মিশ্রিত সাধুভাষা। পণ্ডিতগণ ঘোষণা করলেন যারা চলিত বা প্রাকৃত ভাষায় লিখবে, তাদের নরকে গমন হবে। অত্যন্ত জটিল এক বহুল তৎসম ও ব্যাসবাক্য শব্দ সহ বাংলা গদ্য-সাহিত্য শুরু হয়ে গেলো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা সেই তৎসম বাহুল্য সাহিত্যের প্রতিনিধি। 

ঋগ্বেদের রচনাকাল ১২০০ খ্রিস্টাব্দ। আর্যগণ ভারতে আসতে শুরু করে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বাংলা ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোত্রে। সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তির কিংবদন্তি থাকলেও বাংলা ভাষাবিদরা মনে করেন করেন, বাংলা মাগধী প্রাকৃত এবং পালির মতো ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে এসেছে। ভাষা গবেষক সুকুমার সেনের মতে, ভারতীয় আর্য  ভাষার প্রাচীন নমুনা ঋগ্বেদে সংরক্ষিত। ঋগ্বেদের রচনাকাল ১২০০ খ্রিস্টাব্দ। আর্যগণ ভারতে আসতে শুরু করে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই ৩০০ বছরে তারা ভারতে অবস্থান করে যে ভাষা ব্যবহার করত, তাই প্রত্ন-ভারতীয় আর্য ভাষা বা প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা। এই ভারতীয় আর্য ভাষা থেকেই আধুনিক ভারতের বাংলাসহ বহু আঞ্চলিক ভাষার উদ্ভব হয়েছে। বাংলাকে তাই ভারতীয় আর্য ভাষার এক সুদূর বংশধর বলা যায়। আর্য ভাষা মানেই সংস্কৃত ভাষা নয়। সংস্কৃত ভাষা ৪০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রচলিত হল। ঋগ্বেদের প্রাচীনতম শ্লোক এক হাজার খ্রিস্টাব্দে রচিত বলে অনুমান করা হয়, সেটা সংস্কৃত নয়। পরবর্তীকালে ঋগ্বেদের শ্লোকের ব্যাখ্যা এবং ভাষার সংরক্ষণশীলতার জন্য ঋগ্বেদের ভাষা সংস্কারের  প্রয়োজনীয়তা থেকে সংস্কৃতের জন্ম হয়। প্রাচীন ভারতে ব্যবহৃত শুদ্ধ বা সাধু রূপ ‘সংস্কৃত’র পাশাপাশি কথ্যভাষা ‘প্রাকৃত’ও প্রচলিত ছিলো। বাংলা ভাষা বিবর্তনের পর্যায়কে তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে  প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক বাংলা। প্রাচীন বাংলা ছিলো ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার পুরোহিত এবং পণ্ডিতদের সাহিত্যকর্মের ভাষা। ব্রিটিশরা বাঙালিদের সঙ্গে কাজ চালানোর জন্য যে ভাষা শিখেছিলো, সেটি হলো সাধুভাষা।

সেই ভাষাতেই কথা বলার চেষ্টা করতো। কিন্তু যথাযথভাবে সেই ভাষা না শিখতে পারায়, তারা একধরনের ভাষা উদ্ভব করে ফেললোÑ হামি টোমাকে মারিয়া ফেলিবে। নরকের ভয়কে উপেক্ষা করে বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষায় প্রথম গ্রন্থ বীরবলের হালখাতা রচনা করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ১৯১৬ সালেই প্রথম মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য শুরু হলো। বর্তমান বাংলা ভাষার আধুনিক রূপটি পাওয়া যায় ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের সময় বাংলার নদীয়া অঞ্চলে কথিত উপভাষায়। প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষার পক্ষে লিখলেন, ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, উল্টোটা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে। প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষার ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও প্রভাবিত করেছিলেন। বহুকাল ধরে গর্বের সঙ্গে চলিত বাংলাভাষায় সাহিত্য চর্চা চলছে। চলছে তৎসমমুক্ত বানান সংশোধনের মধ্য দিয়ে। ঢুকেছে প্রচুর বিদেশি শব্দ। বাংলা চলিত ভাষা ক্রমশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। আরও কাজ করার বাকি আছে। বাংলা ভাষা থেকে যেদিন শ, ষ, স; ন, ণ; র, ড়, ঢ় মুক্ত করতে পারব, সেদিন বাংলা ভাষা হবে বাঙালিদের নিজস্ব ভাষা। ফেসবুকে ২১-২-২৪ প্রকাশিত হয়েছে। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়