শিরোনাম
◈ শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টায় ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিপেটা ও বল প্রয়োগ করে: আইএসপিআর ◈ নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে এনসিপির বিক্ষোভ (ভিডিও) ◈ পল্টনে ফের র.ক্তা.ক্ত সংঘর্ষ: হলুদ হেলমেটধারীরা কারা?" ◈ মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশ নিয়ে যা বললেন ভারতীয় সাংবাদিক ◈ ‘প্ল্যান-বি হলো জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে লীগকে ফেরানো’ ◈ নুর আশঙ্কাজনক, বাঁচবে কি মরবে জানি না : রাশেদ খাঁন (ভিডিও) ◈ ভূমি মালিকদের জন্য বড় সুখবর: মাত্র ২৪ ঘন্টায় খতিয়ানের ভূল সংশোধনের সরকারি নির্দেশনা, জানুন কিভাবে ◈ ঢাকায় জাতীয় পার্টি-গণঅধিকার পরিষদ সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন ◈ সংঘের নিয়মে মোদির অবসর? বয়স বিতর্কে মোহন ভাগবতের স্পষ্ট জবাব ◈ খালেদা জিয়া সরকারে থাকাকালে দেশের টাকা বিদেশে পাঠাননি: চান্দিনায় মাহমুদুর রহমান মান্না

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩, ১২:৩০ রাত
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩, ১২:৩০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জলবায়ু পরিবর্তন :  মারাত্মক ঝুঁকিতে শিশুদের জীবন

ফাতেমা ইয়াসমিন

ফাতেমা ইয়াসমিন : তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ভয়াবহ আবহাওয়া বিপর্যয় শুরু হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশে বিশেষ করে বাংলাদেশে স্বাভাবিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। এই দুর্যোগের ফলে মানুষের জীবন আজ হুমকির মুখে। বিশেষ করে শিশুদের জীবন হুমকির মুখে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বন উজাড়, শিল্পায়ন, দূষণ ও নগরায়ন জলবায়ুর উপর দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। একে জলবায়ু পরিবর্তন বলে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা। তাই জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে জানতে হবে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি জনবসতিকে প্রতিনিয়ত আঘাত করছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গত ১০০ বছরে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস (০.৯৮+-০.১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১.৩ +- ০.৩২ডিগ্রী ফারেনহাইট) বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের জলবায়ুতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

রেকর্ড অনুসারে, বিশ্বের উষ্ণতম বছরগুলো ছিল ১৯৮০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে। ২০০০-২০০৯কে বিশ্বের উষ্ণতম দশক হিসাবে স্বীকৃত করা হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তন প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের বেশি প্রভাবিত করছে, কারণ শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় দুর্বল ও কম অভিযোজনযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তন ঘরবাড়ি ধ্বংস, খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি, পরিবারের জীবিকা বিনষ্টের মাধ্যমে একটি পরিবারে শিশুর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও স্বাস্থ্য মহামারীর কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এই প্রভাবটি সম্ভবত আরও বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমান করে যে বিশ্বব্যাপী মোট রোগের ৮৮ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রভাবিত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বলে বলা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিন দিন নতুন নতুন রোগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাবের ফলে একটি পরিবারকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম সমস্যা হলো আর্থিক সমস্যা। এটি সরাসরি শিশুদের প্রভাবিত করে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুদের শৈশব ও স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশকে নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। যেমন অতিরিক্ত তাপ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত শৈত্যপ্রবাহ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে, এটা এখন নিয়মিত ঘটনা। বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত। আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। মানুষের দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। প্রকৃতির এ ধরনের নির্মম আচরণে মানুষের জীবনে নেমে আসে দুঃখ-দুর্দশার ছায়া। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক শিশু ও নবজাতক। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের আয় কম। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে তাদের বছরের পর বছর লেগে যায়। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। শিশুসহ পরিবারের কেউ সুষম খাবার খেতে পারে না। পরিবারের চাপ সামলাতে শিশুদের কাজে পাঠানোর কারণে আর্থিক সমস্যার কারণে অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকাংশ শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয় তারা স্কুলে না গিয়ে কাজ করছে কেন? তাহলে তারা উত্তর দেবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে, তারা পরিবারের অর্থ উপার্জনকারীর মৃত্যুসহ পারিবারিক আর্থিক সমস্যা মোকাবেলা করছে।

তাই বলা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুশ্রম দিন দিন বাড়ছে।  শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়া দিন দিন বাড়ছে। গবেষণায় বলা হয়েছে দেশের প্রায় ১৭ লাখ শিশু নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। চারজনের একজনের বয়স ১১ বা তার কম। বড়রা যেমন কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসছে, তেমনি শিশুরাও আসছে। ঢাকা ও আশপাশের বস্তির অধিকাংশ শিশু ট্যানারি, দর্জির দোকান, মুদির দোকান, লঞ্চ ইয়ার্ড, ঝুঁকিপূর্ণ মিল বা রাসায়নিক কারখানা, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট বা রেলস্টেশনে ভারী জিনিসপত্র বা মালামাল টানার কাজ করে। যদি আমরা স্বাস্থ্যের দিক থেকে বিবেচনা করি তবে দেখা যাবে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একটি শিশু হঠাৎ জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হয়। এটা স্বাভাবিক মনে হলেও পরবর্তীতে মারাত্মক রোগে রূপ নেয়। পরিবেশ দূষণ বা বায়ু দূষণও একটি শিশুকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। পরিবেশ দূষণ থেকে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি হয়। বায়ু দূষণ কম ওজন ও অকাল জন্মের ঘটনাকে প্রভাবিত করে। বিষাক্ত বাতাসের সংস্পর্শে এলে শিশুদের হাঁপানি হওয়ার প্রবণতা থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। পৃথিবীর বিভিন্ন গতিশীল প্রক্রিয়া যেমন আছে, তেমনি আছে বাহ্যিক প্রভাব। পরবর্তী ফ্যাক্টরটিতে সৌর বিকিরণের পরিমাণ, পৃথিবীর অক্ষের দিক পরিবর্তন বা সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ মানব সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন। কিন্তু এখন যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে তার জন্য মানুষের কর্মকাণ্ড অনেকাংশে দায়ী। পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ যখন মানুষ কারখানা ও যানবাহন চালানোর জন্য বা শীতকালে ঘর গরম রাখতে তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়াতে শুরু করেছিল। কার্বন ডাই অক্সাইড, বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে একটি, ১৯ শতকের পর থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুই দশকে তা বেড়েছে ১২ শতাংশ। বন উজাড়ের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনও বেড়ে যায়। গাছপালা কার্বন সঞ্চয় করে। ফলস্বরূপ যখন সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হয় বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সঞ্চিত কার্বন বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়।

জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের আরও বেশি বনভূমি বৃদ্ধি ও কম জমি ব্যবহার করা উচ্চ ভবন ও কারখানা স্থাপন করা দরকার। পরিবেশের কোনো ক্ষতি যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিল্প বর্জ্য শোধন করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা করতে হবে  কীভাবে এই বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করতে হবে  নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কলকারখানার কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য এখন থেকে গ্রিন ফ্যাক্টরির উদ্যোগ নিতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। এই প্লাস্টিক বর্জ্য সহজে পঁচে না যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশের ক্ষতি করে না।

ট্যানারির বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। ট্যানারির বর্জ্য যাতে খাল ও নদীতে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ট্যানারির বর্জ্য খাল-বিল-নদীতে গেলে নানা রোগের আশঙ্কা রয়েছে। তাই ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন করে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। কৃষিজমি যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে শিল্প কারখানা স্থাপনে।

কম জায়গা ব্যবহার করে শিল্প কারখানা তৈরি করতে হবে। শিল্প কারখানার আশেপাশে গাছ লাগানো বা থাকার ব্যবস্থা করা উচিত। কৃষি জমি ধ্বংস না করে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বাড়ে। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আলাদা ঘর নির্মাণ করতে হচ্ছে। কৃষি জমি কমে যাচ্ছে, তাই বেশি সন্তান না নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক :  উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সিনিয়র এইচআর ম্যানেজার। সূত্র : নিউনেশন। অনুবাদ : মিরাজুল মারুফ

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়