শিরোনাম
◈ সংঘাতের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ◈ দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনায় অভিযান, গ্রেপ্তার ২৭৪৭ ◈ আজ বিদেশি কূটনীতিকরা ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শনে যাবেন ◈ চলমান সংকটে রাজশাহীতে কৃষিখাতে দিনে ২০ কোটি টাকার ক্ষতি ◈ কারফিউ শিথিল সময়ে চলবে দূরপাল্লার বাস ◈ প্রাণহানি ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব ◈ ড. ইউনূস রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করেছেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ বাংলাদেশের সহিংসতা বন্ধে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন ড. ইউনূস ◈ নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৩৬ কয়েদির আত্মসমর্পণ ◈ কতজন শিক্ষার্থী মারা গেছেন, জানতে সময় লাগবে: শিক্ষামন্ত্রী

প্রকাশিত : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৩, ১২:৫৬ রাত
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৩, ১২:৫৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নতুন আইন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম : দেশের আয়কর ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি চালু করে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে রিটার্ন দাখিলের সুযোগের আওতায় আনার বিষয়ে আমি বেশ কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায় বেশকিছু নিবন্ধ লিখেছি। সে কারণেই আয়কর আইন ২০২৩-এর প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। সম্প্রতি এই আইন প্রণয়নের পর আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আইনটি পড়েছি। আয়কর আইন-২০২৩ দেশের সম্পূর্ণ আয়কর আইন হিসাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। এটা বলা যেতে পারে যে আয়কর আইন ২০২৩ দেশের প্রথম আয়কর আইন। কারণ এতদিন ধরে দেশের আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। এই আয়কর আইন ২০২৩ ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ বাতিল করে একটি ব্যাপক আইন হিসাবে প্রণীত হয়েছে। এর জন্য এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) অর্থ মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ। এই নতুন আয়কর আইনে নির্দিষ্ট ২৫টি অংশ ৩৪৫টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি অংশের অধীনে পৃথক অধ্যায় রয়েছে, যার অধীনে সংশ্লিষ্ট ধারা রয়েছে। এ ছাড়া এই নতুন আয়কর আইনে আটটি তফসিল সংযুক্ত করা হয়েছে।

এই আইনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো যে যদিও আইনটির বিভিন্ন ধারা, প্রতিটি ধারার অধীনে পৃথক অধ্যায় রয়েছে, আইনের ১ থেকে ৩৪৫ ধারাগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধারা ও অধ্যায় বাদ দিয়ে সরাসরি ধারা উল্লেখ করলেও কোনো সমস্যা হবে না। উদাহরণ স্বরূপ এই আইনের পার্ট ৯ এর অধ্যায় ১ এর ধারা ১৭১ আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময় নিয়ে কাজ করে। ফলে ধারাটি উল্লেখ না করে শুধু ১৭১ ধারা উল্লেখ করে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সম্পর্কে কিছু বলা হলে তা বুঝতে বা আইনের বিধানের সঙ্গে তুলনা করতে কারো কোনো অসুবিধা হবে না। এই আইনের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এই আইনটি বেশ সহজ ভাষায় লেখা। সাধারণত আইনের ভাষা বেশ জটিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন আয়কর আইনটি অত্যন্ত সহজ ভাষায় প্রণয়ন করা হয়েছে, এতে সাধারণ মানুষের বুঝতে খুব বেশি অসুবিধা হবে না, যদিও বিষয়ের জটিলতার কারণে আইনটি অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। এটি রিটার্ন দাখিল, আয়কর মূল্যায়ন, আয়কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিলের বর্তমান মোডে মূল্যায়নের জন্য একটি চমৎকার আইন অর্থাৎ ম্যানুয়াল মুডে কাগজ-ভিত্তিক রিটার্ন। তবে আয়কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করে আধুনিকায়নে কতটা সহায়ক হবে সেটাই দেখার বিষয়। অনেক ‘শর্ত’, ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘সুবিধাপ্রাপ্ত কমিশনার মনে করেন’ আয়কর সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় শর্তের জালে আটকে আছে, এর দ্বারা একটি ভাল মানের ব্যবহারকারী-বান্ধব সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা কঠিন। সেই শর্ত পরিমিতি প্রয়োগ করা। কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও তা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হবে, যা সামলাতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হবে।

পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে প্রযুক্তি বা স্মার্ট আয়কর ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা যেতে পারে। কারণ সাধারণ শর্ত প্যারামিটারগুলো ভালো মানের ব্যবহারকারী বান্ধব সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনের পূর্বশর্ত। শর্ত ও পরিমিতি যতো সহজ হবে, সফ্টওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন ততো উন্নত ব্যবহারকারী বান্ধব হবে। এই আইনের ১৬৬ ধারায় করদাতার সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক নাগরিককে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে সেটাই হওয়া উচিত। কিন্তু এ ধরনের হলে অনেকে ফেরত না দিয়ে বাঁচতে পারে। ইস্যুটি সহজেই এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যাতে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক রিটার্ন দাখিল করতে পারে। যাদের বার্ষিক আয় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত করযোগ্য বয়সসীমার মধ্যে পড়ে তাদের অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে নির্ধারিত আয়কর দিতে হবে। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে একটি উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। সেজন্য আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে রিটার্ন দাখিলের আওতায় আনার লক্ষ্যে এনবিআরকে কাজ করতে হবে। আর এই লক্ষ্য তখনই অর্জিত হবে যখন রিটার্ন দাখিল সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড হবে। ডিজিটাল রিটার্ন দাখিল করার অর্থ এই নয় যে লোকেরা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করবে ট্যাক্স অফিসার রিটার্ন মূল্যায়ন করবেন ও একটি মূল্যায়ন চিঠি ইস্যু করবেন। তা করতে হলে যখন দেশের ১০-১২ কোটি মানুষের রিটার্ন সংগ্রহ করা হবে, তখন তা ম্যানুয়ালি করতে গেলে কয়েক লাখ আয়কর কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। এজন্য বর্ধিত ব্যয় আয়কর হিসেবে আদায় নাও হতে পারে। একটি সত্যিকারের ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থা হলো একটি প্রযুক্তি চালিত ব্যবস্থা যেখানে রিটার্ন ফাইলিং থেকে পুনর্মিলন পর্যন্ত সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় প্রত্যাবর্তনকারীদের মূল্যায়ন চিঠিও দেওয়া হয়। এই পুরো কাজে কর কর্মকর্তার কোনো ভূমিকা নেই। এই পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করা হলে, কিছু রিটার্নে সমস্যা দেখা দেবে ও সেগুলো ট্যাক্স অফিসার দ্বারা সমাধান করা হবে। তাছাড়া কিছু রিটার্ন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করা হবে তা এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হবে ও  প্রতি বছর অডিট করা হবে।

এই আইনের ১৬৭ ধারায় আয়কর রিটার্ন দাখিলের সঙ্গে সম্পদ ও দায়-দায়িত্বের বিবরণী দাখিলের উল্লেখ আছে। এটি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে আয় বছরের শেষ তারিখে ৪০ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ ফাইল করতে হবে। কিন্তু অন্যান্য শর্ত থাকায় প্রায় সকল রিটার্ন দাখিলকারীদের সম্পদের বিবরণী প্রদান করতে হয়। বিষয়টিকে সরলীকরণ করে সরাসরি বলা যেতে পারে যে যাদের সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকার বেশি তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে। এখানে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারীদের সম্পদের বিবৃতিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দেখানোর জন্য তহবিলের উৎসের কোনো প্রমাণ দাখিল করার প্রয়োজন নেই।

তা ছাড়া ব্যাংক উদ্বৃত্ত, ব্যাংকের স্থায়ী আমানত, সঞ্চয়পত্র বা ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডের মতো সম্পদ দেখানোর ক্ষেত্রে অর্থের উৎসের পক্ষে কোনো প্রমাণ সংযুক্ত করা ঠিক হবে না, কারণ এই সম্পদগুলো কিনতে হবে বৈধ টাকা দিয়ে। অবৈধ টাকা দিয়ে এসব সম্পদ কেনার সুযোগ নেই। যদি থাকে তবে তা অন্যান্য সরকারি দফতরের দুর্বলতা। একটি সরকারি দফতরের দুর্বলতার জন্য অন্য সরকারি দফতর কাউকে দোষারোপ করলে তা ঠিক নয়। এই মুহূর্তে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেকে চাইলেও এই সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার ভয়ে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে অক্ষম। দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীকে আয়কর রিটার্নের আওতায় আনতে এই ধারায় কিছু পরিবর্তন আনলে ভালো হবে। সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় কথা দেশে এখন একটি ব্যাপক আয়কর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথমত, ওই আইনে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায় না। এখন এই আইনের উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে, সময়ের পরিক্রমায় আইনটি তার পূর্ণ মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। খুব শিগগিরই স্মার্ট বাংলাদেশে চালু হবে স্মার্ট আয়কর ব্যবস্থাপনা। তারপর আমরা আশা করি যে এই আয়কর আইন ২০২৩ যদি সংশোধন, পরিমার্জন ডিজিটাল আয়কর আইনে রূপান্তর করা যায় তবে উল্লেখিত সমস্যাগুলো ভালভাবে সমাধান হবে।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালকÑবাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড। সূত্র : নিউনেশন। অনুবাদ : মিরাজুল মারুফ

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়