শিরোনাম
◈ ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ? ◈ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো না, সবাই দোয়া করবেন: আইন উপদেষ্টা ◈ গুগলকে কনটেন্ট সরাতে অনুরোধের সংখ্যা নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ◈ জামায়াতকে ভোট দিলে আমার মৃতদেহ পাবেন : ফজলুর রহমান (ভিডিও) ◈ প্রধান উপদেষ্টার প্রতি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ◈ বাংলাদেশ সিরিজ স্থগিত করে শ্রীলঙ্কা নারী দল‌কে আমন্ত্রণ ভারতের ◈ শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য জরুরি বার্তা ◈ এক শতক পর আবারও কি সিলেট ঝুঁকিতে? ডাউকি ফল্টে ভূমিকম্পের ধাক্কা! ◈ সুখবর পেলেন বিএনপির আরও ৯ নেতা ◈ বড় চা‌পে ইউ‌রোপ, চল‌ছে জ্বালানি, জলবায়ু, অর্থনীতি ও জনসংখ্যা সংক‌ট

প্রকাশিত : ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ০৬:৩৫ বিকাল
আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্রবাসে যাওয়ার আগে সচেতন নাগরিক হিসেবে যে বিষয়গুলো শেখা জরুরি: প্রস্তুতিহীন যাত্রা নয়, নিরাপদ ভবিষ্যতের পথচলা

আবুল কালাম আজাদ: প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন এখন বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। গ্রামের সাধারণ কৃষক, শহরের হালচাষী পরিবার, কলেজবের হওয়া তরুণ, কিংবা সংসারের অভাব দূর করতে চাইছে এমন কোনো বাবা—সবাই কোনো না কোনো সময় ভেবেছেন রোজগারের জন্য বিদেশে যাবেন। কারণ প্রবাস মানেই যেন উজ্জ্বল ভবিষ্যত, উঁচু দালান, আধুনিক জীবন, এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা। বাস্তবে এ পথ যতটা দীপ্তিমান, ততটাই কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রস্তুতিহীন মানুষের জন্য কখনো কখনো মৃত্যুফাঁদ।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার আগে কী করা জরুরি—এ প্রশ্ন আজ শুধু প্রবাসীদের নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ রেমিট্যান্সের উপর দাঁড়িয়ে, আর এই রেমিট্যান্স আসছে সেই মানুষগুলোর হাত ধরে যারা অনেক সময় কিছুই না জেনে, না বুঝে কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্রবাসে যান। তারা সচেতন না হওয়ায় প্রতারিত হন, শোষিত হন, চাকরি হারান, কখনো কখনো জীবনও হারান। পরিবার ঋণে ডুবে, সমাজ চাপে পড়ে, আর রাষ্ট্র হারায় দক্ষ শ্রমশক্তি।

এ বাস্তবতা বদলানো সম্ভব যদি নাগরিকরা প্রবাসে যাওয়ার আগে নিজেদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করেন। বিদেশে যাওয়া কোনো শখ নয়, কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জীবনচুক্তি। আর জীবনচুক্তিতে ভুলের স্থান নেই। তাই নাগরিকদের কাছে সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমন জরুরি শেখা—দক্ষতা, ভাষা, আইন, নৈতিকতা, আর বাস্তবতার পাঠ।

আজকের পৃথিবী এমন এক জায়গা, যেখানে অদক্ষ, অজ্ঞান ও প্রস্তুতিহীন মানুষদের জন্য আর কোনো জায়গা নেই। বিশেষ করে বিদেশের কঠোর শ্রমবাজারে। সেখানে কেউ কারো প্রতি দয়া দেখায় না, সুযোগ দেয় না, মমতাও দেখায় না। সেখানে টিকে থাকার একমাত্র উপায়—দক্ষতা, বুদ্ধি, সচেতনতা এবং আইন জানা।

বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ মানুষ বিদেশে যান, তার অর্ধেকও যদি যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জন করতেন, তাহলে হাজার হাজার পরিবার কষ্টে পড়তো না, প্রতারণার শিকার হতো না, কর্মহীন হয়ে বিদেশে মানবেতর জীবন কাটাতো না, কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নিতো না।

বিদেশে যাওয়ার আগে মানুষের দুটি জিনিস জানা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—এক: তিনি কোথায় যাচ্ছেন, দুই: তিনি সেখানে কী করবেন। দুর্ভাগ্য হলো—অধিকাংশই না জানে, না বোঝে। শুধু শোনেন, “দুবাই গেলে টাকা! সৌদি গেলে ভাল চাকরি! কাতার গেলে আয়!”—এইসব অর্ধসত্য প্রচারণা। বাস্তবতা হলো—প্রতিটি দেশের শ্রমবাজার আলাদা, কাজের ধরন আলাদা, চাহিদা আলাদা, আইনের ধরন আলাদা।

যখন কেউ বিদেশে যান না জেনে, না শিখে—তখন ঘটে বিপর্যয়। কেউ চাকরি পান না, কেউ পান খুবই কম বেতনের কাজ, কেউ ভাষা না জানায় যোগাযোগ করতে পারেন না, কেউ কাজের নিয়ম না জানায় কাজ হারান, কেউ প্রতারণায় পড়ে অবৈধ হয়ে যান। এমনও হয়—অনেক শ্রমিক কাগজপত্রই বুঝতে পারেন না, নিয়োগপত্রে কী লেখা আছে তা পড়তে জানেন না। ফলে তিনি দালালের কথাই সত্য ধরে নেন, এবং শেষপর্যন্ত পুরো পরিবার বিপদে পড়ে।

একজন সচেতন প্রবাসী কখনো দালালের কথার উপর ভরসা করে না; তিনি তথ্য সংগ্রহ করেন, যাচাই করেন এবং নিজের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিজেই নেন। সচেতনতার মূল শুরু এখানেই। একজন নাগরিককে জানতে হয়—নিরাপদ প্রবাস জীবন কখনোই ভাগ্যের উপর নির্ভর করে না। এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনার ফল।

বিদেশে যাওয়ার আগে যে বিষয়টি প্রথম শেখা জরুরি, তা হলো—ভাষা। যে দেশে মানুষ যাবে, সে দেশের ভাষা অন্তত প্রাথমিকভাবে জানাটা অপরিহার্য। আরবি বা ইংরেজি কিংবা মালয় ভাষা না জানলে শ্রমিক কাজের নিয়ম বুঝবে কীভাবে? নিয়োগকর্তার কথা বুঝবে কীভাবে? বিপদের সময় সাহায্য চাইবে কীভাবে? ভাষা না জানা মানে অন্ধের মতো একটি অজানা দেশে ঢুকে পড়া। এমন অনেক শ্রমিক আছেন যারা আরবি বলতে পারেন না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থাকেন, পানি চাইতেও পারেন না, চিকিৎসাও পান না।

ভাষা শেখা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা। কাজের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। কারণ ভাষা না জানলে কাজ শেখাও কঠিন। আর কাজ না জানলে বিদেশে সুযোগ তো দূরের কথা—টিকে থাকাও কঠিন।

প্রবাসে যাওয়ার আগে শেখা জরুরি দ্বিতীয় বিষয় হলো—দক্ষতা। যে কাজ করতে বিদেশে যাচ্ছেন, সেই কাজটি বাংলাদেশে থেকেই প্রশিক্ষিত হয়ে যাওয়া উচিত। কেউ যদি বলে “দুবাইয়ে গিয়ে শিখে নেবেন”—এটি একটি ভয়াবহ ভুল ধারণা। বিদেশে সময় মানে টাকা, আর টাকা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। সেখানে গিয়ে শিখে সময় নষ্ট করার মতো সুযোগ নেই।

একজন দক্ষ মানুষ বিদেশে ভালো বেতন পান, সম্মান পান, স্থায়িত্ব পান। কিন্তু একজন অদক্ষ শ্রমিককে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। একদিকে কাজের চাপ, অন্যদিকে নিয়োগকর্তার তিরস্কার, আবার অন্যদিকে হয়রানি, ঠকানো, বেতন কাটছাঁট—all মিলিয়ে জীবন হয়ে ওঠে কঠিন।

বাংলাদেশে অদক্ষ মানুষের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি দক্ষ মানুষদের সুযোগ কম। তাই অনেকেই মনে করেন—বিদেশই হবে দক্ষতা পাওয়ার জায়গা। কিন্তু বিদেশ দক্ষতা নেওয়ার জায়গা নয়, বরং দক্ষতা বিক্রি করার জায়গা।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চুক্তিপত্র জানা। বিদেশে যাওয়ার আগে যে চুক্তিপত্রে সই করেন, সেটিই আপনার জীবন নির্ধারণ করে। সেই চুক্তিপত্র যদি আপনি না বুঝেই সই করেন, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যায় আপনি লড়াই করতে পারবেন না। কত বেতন পাবেন, কত ঘণ্টা কাজ করবেন, খাবার দেওয়া হবে কি না, বাসস্থান কেমন—সব কিছু চুক্তিতে থাকে। দালালরা অনেক সময় মিথ্যা বলে, বলে “আপনার মাসে ৮০ হাজার টাকা আয় হবে”, অথচ সেখানে গিয়ে দেখা যায় ২০ হাজার টাকার কাজ।

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক আইন জানা। কোনো দেশের ভিসা, কাজের অনুমতি, ওয়ার্ক পারমিট, রেসিডেন্স কার্ড, চাকরি পরিবর্তনের নিয়ম—এসব না জানা মানে সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই আপনি হার মানলেন। কেউ যদি আইন না জানেন, তাহলে দালালদের কথাই সত্য ভাববেন। অথচ আইন জানা মানে ক্ষমতাবান হওয়া। আইন জানা মানে প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকা।

পঞ্চম বিষয়—সঞ্চয় ও আর্থিক শিক্ষা। বিদেশে গেলে অনেক শ্রমিক প্রথমদিকে খুব খুশি হয়ে অযথা অর্থ খরচ করেন। ব্র্যান্ডেড জুতো, মোবাইল ফোন, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে টাকা সঞ্চয় হয় না। পরিবার ঋণের চাপে থাকে, কিন্তু শ্রমিক নিজেই বুঝতে পারেন না যে এভাবে চললে তিনি কখনোই উন্নতি করতে পারবেন না।

প্রবাসে যাওয়ার আগে তাই আর্থিক পরিকল্পনা দৃঢ়ভাবে শেখা দরকার। নিজের আয়—ব্যয়—সঞ্চয়—ঋণ—সব বিষয় গুছিয়ে না নিলে বিদেশে ভালো থাকা অসম্ভব।

প্রবাসে যাওয়ার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানসিক প্রস্তুতি। বিদেশে জীবন কখনোই সহজ নয়। সেখানে আত্মীয় নেই, বন্ধু নেই, সান্ত্বনা নেই, মায়া নেই। কাজ করতে হয় দীর্ঘ সময়, অনেক চাপের মাঝে। একাকিত্ব, ঘরহারা ভাব, ক্লান্তি—এসব অনিবার্য। মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে মানুষ সহজেই ভেঙে পড়ে। কেউ হতাশায় ভোগে, কেউ অন্যায় করে ফেলে, কেউ আবার আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

এ কারণে বিদেশে যাওয়ার আগে মানুষের জানা উচিত—প্রবাস জীবন মানে ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম, নিয়ম মানা, আর নিজের জীবনকে নিজের হাতে ধরে রাখা।

সচেতনতাই পারে একটি জীবন বদলে দিতে। সচেতনতাই পারে একটি পরিবারকে ঋণমুক্ত করতে। সচেতনতাই পারে এক শ্রমিককে বিদেশে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। আর যেখানেই সচেতনতা নেই—সেখানেই দুর্ভাগ্য, প্রতারণা, বিপদ ও কান্নার গল্প।

বিদেশে যাওয়ার আগে পরিবারগুলোকেও সচেতন হতে হবে। তাঁরা যেন দালালের মিথ্যা কথায় না ভরসা করেন। যেন বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নেন। কারণ শ্রমিকের ভবিষ্যত শুধু তার নিজের নয়—পুরো পরিবারের ভবিষ্যত।

আর সর্বশেষ বিষয়টি হলো—রাষ্ট্রীয় সহায়তা জানা। প্রতিটি দেশের দূতাবাস, শ্রম উইং, হেল্পলাইন, আইনগত সুবিধা—এসব কোথায় exists, কখন ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে আবেদন করতে হয়—এসব জানা জরুরি। যারা এসব জানেন তারা কখনোই নিপীড়নের শিকার হয়ে চুপ থাকেন না।

একজন সচেতন, প্রশিক্ষিত, শিক্ষিত শ্রমিক কখনো অসহায় হন না। তিনি জানেন তার অধিকার কী, কর্তব্য কী, কীভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে লড়াই করতে হয়।

প্রস্তুতিহীন বিদেশযাত্রা ঠিক যেন অন্ধকারে ছুটে যাওয়ার মতো। আর প্রস্তুত থাকা মানে আলো হাতে পথ চলা।

যদি দেশের প্রতিটি প্রবাসী-প্রত্যাশী নাগরিক প্রবাসে যাওয়ার আগে ভাষা, দক্ষতা, আইন, চুক্তি, আর্থিক জ্ঞান এবং মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করেন—তাহলে শুধু তাদের জীবনই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। রেমিট্যান্স বাড়বে, পরিবারের জীবন বদলাবে, দেশের মর্যাদা বাড়বে, প্রবাসীদের নিরাপত্তা বাড়বে।

একটি দেশ তখনই এগোয় যখন তার নাগরিকরা সচেতন, দক্ষ ও আত্মনির্ভর হয়। আর বিদেশে যাওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্তে এই সচেতনতা আরও জরুরি।

প্রবাস জীবন কারও জন্য দুঃস্বপ্ন না হয়ে যেন স্বপ্নপূরণের পথ হয়—এটি কেবল রাষ্ট্র বা সমাজের উপর নয়, প্রতিটি নাগরিকের উপরও নির্ভর করে। তাই সচেতন হই, শিখি, বুঝে সিদ্ধান্ত নেই—কারণ বিদেশে জীবন শুধু উপার্জন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

প্রস্তুত মানুষই পারে জয়ী হতে, আর প্রস্তুতিহীন মানুষই বেশি পড়ে বিপদে। নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়াই হবে প্রথম শর্ত।

আবুল কালাম আজাদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও কলামিষ্ট, columnistazad@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়