ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের কৌশলগত সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর এখন নিরাপত্তা, সংযোগ, জলবায়ু, জ্বালানি ও বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের লিডারশিপ ফোরামে ‘হোয়াই দ্য বে ম্যাটারস টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক অধিবেশনে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া ও মালদ্বীপের আলোচকেরা এ কথা বলেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর দেশ, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যকে যুক্ত করেছে। আজ এটি এমন এক প্রধান ক্ষেত্র, যেখানে নিরাপত্তা, সংযোগ, জলবায়ু, জ্বালানি ও বৈশ্বিক প্রভাবের প্রশ্ন মিলিত হয়েছে।
সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখার তাগিদ
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ইসলামাবাদভিত্তিক সানা ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান ধীরে ধীরে মহাদেশীয় পরিসর থেকে সামুদ্রিক পরিসরের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটারের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা, ব্লু ইকোনমিতে গুরুত্ব এবং গোয়াদর বন্দরে গিয়ে শেষ হওয়া চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)।
বঙ্গোপসাগর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ায় ভূ-রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ভারত মহাসাগরের বাব-এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালি ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছে। মালাক্কা প্রণালি ও আশপাশের সমুদ্রযোগাযোগ পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য শান্তিপূর্ণ ও উন্মুক্ত রাখা এ অঞ্চলের যৌথ স্বার্থ।
গণতন্ত্র ও আস্থা পুনর্গঠন
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ড. জন কে. গ্লেন বলেন, ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলো এখন নতুন করে পর্যালোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরে তরুণদের মধ্যে উন্নত শাসন, মৌলিক অধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও প্রকৃত গণতন্ত্রের জোরালো দাবি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফেরাতে হলে দেখাতে হবে যে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও আইনি কাঠামো নাগরিকদের জন্য কার্যকর ও ন্যায়সংগতভাবে ফল দিতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক নবায়ন নিয়ে ঢাকায় প্রাণবন্ত ও উন্মুক্ত বিতর্ক হচ্ছে দেখে তিনি অনুপ্রাণিত বলে জানান।
ডেনমার্কের আগ্রহের তিন কারণ
বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান ব্রিক মোলার বলেন, প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরের ছোট ইউরোপীয় দেশ হয়েও ডেনমার্ক বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরে গভীরভাবে আগ্রহী। এর তিনটি কারণ তিনি তুলে ধরেন।
প্রথমত, ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ডেনমার্কের বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। মাথাপিছু হিসাবে ডেনমার্ক বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্য, যেখানে বছরে ১৫০ কোটি ডলারের পোশাক যায়।
দ্বিতীয়ত, সবুজ ও অবকাঠামো বিনিয়োগ। রাষ্ট্রদূত জানান, মায়ের্স্কের এপিএম টার্মিনালস চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে ৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে, যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রিনফিল্ড বেসরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ। নভো নরডিস্ক স্থানীয়ভাবে উচ্চপ্রযুক্তির ইনসুলিন উৎপাদনে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে অংশীদারত্বে গেছে। ডেনমার্ক বঙ্গোপসাগরে অফশোর বায়ু ও বৃহৎ পরিসরের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
তৃতীয়ত, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অঙ্গীকার। তিনি বলেন, ডেনমার্ক মোট জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সংহতিতে বরাদ্দের অঙ্গীকারে অটল। এর লক্ষ্য এশিয়ায় টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সবুজ রূপান্তর।
চীনের উপস্থিতি ও বিমসটেকের ভূমিকা
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রদীপ কে. তানেজা বলেন, বঙ্গোপসাগর ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব এশিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তার মতে, ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে চীনের উত্থান এবং শিপিং ও জাহাজ নির্মাণে বৈশ্বিক শক্তি হয়ে ওঠা ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে দেশটির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। চীন বাণিজ্যিক জাহাজ, বিমানবাহী রণতরি ও সাবমেরিন তৈরি করছে এবং দ্রুত নৌ-সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, এই উপস্থিতির মধ্যে বাণিজ্যিক চলাচলের পাশাপাশি গবেষণা জাহাজ ও কৌশলগত মোতায়েনও রয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে বিমসটেকের (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) মতো আঞ্চলিক কাঠামো মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেসকে সহযোগিতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ করেছে। আঞ্চলিক সমৃদ্ধির জন্য বঙ্গোপসাগরে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্মুক্ত সমুদ্রপথ বজায় রাখা জরুরি বলেও তিনি মত দেন।
‘বৃহৎ সমুদ্র রাষ্ট্র’ মালদ্বীপ
বাংলাদেশে নিযুক্ত মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনীন রশীদ বলেন, মালদ্বীপ নিজেকে ‘বৃহৎ সমুদ্র রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে। দেশটির কাছ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রযোগাযোগ পথ গেছে। সেখানে কোনো বিঘ্ন ঘটলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ ও পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি জানান, অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি, জলদস্যুতা, মানবপাচার ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় মালদ্বীপ কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে (বাংলাদেশ, ভারত, মরিশাস ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে) এবং ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশনে (আইওআরএ) সক্রিয়।
শিউনীন রশীদ বলেন, বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিকের সঙ্গে যুক্ত করা এক গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
প্রশ্নোত্তর পর্বে আইজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে ‘উইন-উইন’ সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে সিপিইসি (চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর) ও বিসিআইএমের (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর) মতো করিডর সবার জন্য লাভজনক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক তানেজা বলেন, বাংলাদেশের মতো আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিতে নিজস্ব সক্ষমতা প্রয়োগ করে।
শেষে পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ বঙ্গোপসাগর দিয়ে যায়। এই সাগর প্রাকৃতিক সম্পদ, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভভিত্তিক কার্বন শোষণ ক্ষমতা ও জ্বালানি মজুতে সমৃদ্ধ। সামুদ্রিক সংযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা ও ব্লু ইকোনমিতে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে তিনি মত দেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট