এলএনজি আমদানিতে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা একাধিক এলএনজি কার্গো নির্ধারিত সময়ে দেশে না আসায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে এক মাসের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারছে না দেশের অনেক শিল্পকারখানা। সামনে আরও কয়েকটি কার্গো আসার কথা থাকলেও সেগুলোর সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মোটাদাগে তিনটি কারণে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিপিএমে ব্ল্যাক কিউব কোম্পানির কাছ থেকে কেনা একটি এলএনজি কার্গো ৬ সেপ্টেম্বর দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) জমা দেয়নি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি কয়েকদিন ধরে ব্ল্যাক কিউবের কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগই করছেন না। ফলে নির্ধারিত সময়ে কার্গোটি না এলে চলতি সপ্তাহজুড়ে গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এমভি ইসটিম ফুজি’ নামের কার্গোটি বর্তমানে লোহিতসাগর হয়ে জিব্রাল্টারের দিকে যাচ্ছে। ফলে ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে সেটি পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। এখন আগের বা পরের কার্গোর সময় এগিয়ে এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এর আগে ডিপিএমে কেনা জেন হু শিপিংয়ের ‘কুংপেং’ নামের একটি কার্গো ২৬ আগস্ট দেশে আসার কথা ছিল। পরে কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, ওই কার্গোটি রাশিয়ার এলএনজি বহন করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে সেটিও দেশে আসেনি। ওই কার্গোর ঘাটতি পূরণে তাৎক্ষণিকভাবে স্পট মার্কেট থেকে বিকল্প এলএনজি কেনা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।
ডিপিএমে একটিও কার্গো আসেনি
গত ১৭, ২৩, ২৬ ও ২৯ আগস্ট এবং ৬ ও ১০ সেপ্টেম্বর ডিপিএম পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির শিডিউল করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কার্গোর একটিও নির্ধারিত সময়ে দেশে আসেনি। এর মধ্যে ২৬ আগস্টের কার্গোর ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং করতে হয়েছে।
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭২ কোটি ঘনফুট। এতে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
১০ সেপ্টেম্বর ডিপিএমে মেক্সওয়েলের একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। তবে সেটিও অনিশ্চিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরামকো ট্রেডিংয়ের কাছে একটি কার্গো সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।
বেশি দামে এলএনজি কেনার চাপ
এলএনজি আমদানিতে সময়মতো পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে সরকারকে এখন বেশি দামেও কার্গো কিনতে হচ্ছে। ৭-৮ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সৌদি আরামকো ট্রেডিংয়ের একটি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার এবং পসকোর একটি কার্গো ২৪ দশমিক ৬২ ডলারে কেনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত এক মাস আগে স্পট বা চুক্তিভিত্তিক কার্গোর শিডিউল নিশ্চিত করা গেলে প্রতি কার্গোয় ৫০ লাখ থেকে এক কোটি ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমানে একটি কার্গো কিনতে ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ডলার।
এদিকে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সেটি পুনরায় চালু হলেও কার্গো সরবরাহের অনিশ্চয়তায় সংকট কাটেনি।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট
গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। নেপালে আকস্মিক বন্যায় চিলিমে ও ত্রিশূল বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অন্য কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম।
সারা দেশে এখনও লোডশেডিং চলছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি কেনা ও বকেয়া পরিশোধের জন্য অর্থের প্রয়োজন। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সরকারের কাছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
শনিবার দুপুর ২টায় সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৬১০ মেগাওয়াট।
সব মিলিয়ে এলএনজি আমদানিতে ভুল পরিকল্পনা, সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জ্বালানি খাতে সমন্বয়হীনতার কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। উৎস: যুগান্তর।