শিরোনাম
◈ ‘খামেনির দাফনের জন্য ইরানকে এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছি’: ট্রাম্প ◈ ‘সবার আগে বিচার চাই’—প্রধানমন্ত্রীর সামনে জুলাই শহীদ স্বজনদের আকুতি ◈ নতুন পে-স্কেলের গ্রেডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ, গেজেট চলতি মাসেই ◈ খামেনির জানাজায় অংশ না নিতে ১৩ দেশকে চাপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: তাসনিম ◈ প্রধানমন্ত্রীকে কাছে জুলাই শহীদের স্বজন ও আহত জুলাই যোদ্ধারা তুলে ধরেন তাদের কথা, ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ ◈ বাংলাদেশেও দেখা মেলে ডানা ছাড়াই আকাশে উড়ন্ত সাপের, জানা গেল কীভাবে আকাশে ওড়ে তারা (ভিডিও) ◈ এফডিসিতে উত্তেজনা: নানা শাহ ও মারুফের মধ্যে সংঘর্ষ, ভিডিও ভাইরাল ◈ জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না, আইন অনুযায়ী সবার বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ জুলাই আন্দোলনকে কটাক্ষ: অভিনেত্রী শাওন, মাহিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ ◈ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে, শিগগিরই দল হিসেবে বিচার হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত : ০৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:২৯ বিকাল
আপডেট : ০৪ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

‘সবার আগে বিচার চাই’—প্রধানমন্ত্রীর সামনে জুলাই শহীদ স্বজনদের আকুতি

বুকে পাথরচাপা কষ্ট আর চোখে জল নিয়ে আবারও বিচার চাইলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বজনরা। সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের হারানোর ক্ষত দুই বছরেও একটুও শুকায়নি। স্বজনদের একটাই কথা-তারা সবার আগে চান এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার। তাদের মতে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিলুপ্তি সম্ভব নয়।

শনিবার (৪ জুলাই) গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও 'আমরা জুলাই যোদ্ধা' কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নেন শত শত জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

সরকারপ্রধানের সামনে তারা নিজেদের বুকের যন্ত্রণা ও মনের আকুতি তুলে ধরেন। এ সময় সন্তান ও স্বজনহারা এই পরিবারগুলোর চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো হলরুম।

জুলাইয়ে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুর রব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জুলাই আসলেই চোখের পানি বাঁধ ভাঙে। আগস্ট মাসের ৫ তারিখ আমার ছেলের বুকটা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশরা। আমি এক হতভাগা বাবা এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

চট্টগ্রামের শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলে হারিয়ে গেছে কোনো দুঃখ নেই। আমার গর্ব হয়। কিন্তু আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়। এখন সরকারের কাছে দাবি, জুলাই যোদ্ধা যারা হাত-পা হারিয়েছে তাদের সহায়তা করুন। তারা যেন কষ্টে না থাকে।’

রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন চোখে জল নিয়ে ভারী গলায় বলেন, ‘আমার ভাই ফ্যাসিবাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে, তার অনুপ্রেরণায় অনেক ভাই জীবন দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। অনেক শহীদ পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের কাছে দাবি, তাদের সহায়তা করুন। আমার ভাইয়ের হত্যার দ্রুত বিচার করুন। সেই সঙ্গে সারাদেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার দাবি জানাচ্ছি।’

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পরে আমার ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমার স্বামীও হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যান। আমি অসহায় অবস্থায় ওই সময় এমন কোনো দরজায় নেই যে যাইনি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। তবে আমার বিএনপি পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন, সহায়তা করেছেন। এখন বিএনপি সরকারের কাছে একটাই দাবি—সকল জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার চাই। আমি যেভাবে বিএনপির কাছে সহায়তা পেয়েছি, অন্য জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও যেন তেমন সহায়তা পায়। আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাবো না, তবে সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, ‘আমার ছেলে আগস্টের ৪ তারিখ মিরপুরে মারা যায়। দুই বছর পার হলো কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিচারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচারের জন্য রাস্তায় আন্দোলন করেছি কিন্তু দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। আমরা তখন আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, ক্ষমতায় বসবেন এবং আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করবেন। আমরা আশা রাখি, তিনি যেন আমাদের চোখের পানির মূল্য দেবেন।’

পা হারানো জুলাইযোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, ‘গত ১৭ বছর জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দেশকে ভালো রাখতে হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে থাকুন। শহীদ পরিবার যদি চান তবে তারেক রহমানকে সহায়তা করুন। এই দেশ তার কাছেই নিরাপদ। আজকে বুকটা ভরে যায়—দুইটা পা হারিয়েছি দুঃখ নেই, তবে জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার যেন দেখে যেতে পারি।’

আহত জুলাইযোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘আমি একজন আহত জুলাইযোদ্ধা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দাবিতে নয়াপল্টন থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাব যাওয়ার সময় আমি গুলিবিদ্ধ হই। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, কিন্তু কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা পর্যন্ত পাইনি। প্রথমে আমার পরিবারকে বলা হয় আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছি। এরপর থেকে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন এবং পরে মারা যান। আমরা শুধু জুলাই যোদ্ধা নই, গত ১৭ বছরের যোদ্ধা। আমি সকল জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

আরেক আহত জুলাইযোদ্ধা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা সুজন মোল্লা বলেন, ‘লন্ডন থেকে তারেক রহমান একদফার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই জন্যই আন্দোলন করেছিলাম। চোখে গুলি লেগেছে। তবুও পিছপা হইনি। এই একদফা বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জুলাই শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে দেশের মানুষ এখন নিরাপদে বাস করছে। তবে আমাদের আক্ষেপ থেকেই গেছে। শহীদ যোদ্ধাদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে, তিনি চাইলেই পারবেন দ্রুত জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।’

আহত আলামিন বলেন, ‘জামায়াত জুলাইকে বিক্রি করে আর বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে। আমার একটা হাত নেই, ব্যথায় মাঝেমধ্যে কাঁপতে থাকে। চিকিৎসা করতে পারি না। আমার মতো কতো শত যোদ্ধা এমন হাত-পা হারিয়েছেন ঠিক নেই। আমি সরকারের কাছে দাবি করবো, আমার মতো হাত-পা হারানো যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।’

জুলাইযোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল শহীদ যোদ্ধাদের নাম বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে, তাদের জন্য অভিশাপ দেই। শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হওয়ার কারণে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমাদের কোনো সহায়তা করা হয়নি, বলা হতো আমরা জুলাই যোদ্ধা নই, বিএনপির লোক। আমাদের সহায়তা করবে বিএনপি।’

এই সম্মেলনের মূলমন্ত্র ছিল 'সবার আগে বাংলাদেশ'

মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল: ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ পরিবারের হাতে 'জুলাই স্মৃতি স্মারক' তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাইয়ে আহত আল মিরাজ এবং জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ইমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মারক গ্রহণ করেন।

পরে উপস্থিত সকলের জন্য রাখা স্মৃতি স্মারক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে একটি বিশেষ স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রীরা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনাররা, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

রক্তক্ষয়ী সেই জুলাই

২০২৪ সালের বাংলাদেশের যে জুলাই এসেছিল, তা ছিল রক্তস্নাত। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর রাজপথ থেকে জেলা-উপজেলা—সারা বাংলাদেশে গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব এক গণআন্দোলন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী একদফা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং টানা ৩৬ দিনের তীব্র আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের যে তালিকা সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, সেখানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪জন। তবে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘ যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়