শিরোনাম
◈ সিলেটে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ: পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগারদের দাপুটে সিরিজ জয় ◈ ৯৬ সা‌লের এই দি‌নে রাষ্ট্রপতি ফোন করে বলে‌ছি‌লেন, ঢাকায় যেন কোনো সৈন্য ঢুকতে না পারে ◈ ৪০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে অবরুদ্ধ হরমুজ পার হলো চীনের দুই সুপারট্যাংকার ◈ বাড়িতে পৌছালো ওমানে নিহত চার ভাইয়ের লাশ, আজ বেলা ১১টায় জানাজা ◈ হবিগঞ্জে মৃদু ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল উত্তর-পূর্বাঞ্চল ◈ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ১০ ইউনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে ◈ ম‌্যান‌চেস্টার সিটি ছাড়ছেন কোচ গার্দিওলা, আসছেন মারেস্কা  ◈ বিশ্বকা‌পে ফেভারিট না হলেও যেকোনো দলকে হারানোর ক্ষমতা রা‌খে নেদারল্যান্ডস: কোচ রোনাল্ড কুমান ◈ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য: গুলিবিদ্ধদের ‘ইনজেকশন দিয়ে মারতে’ চাপ ◈ ইরান হামলা স্থগিতের ঘোষণায় কমলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম

প্রকাশিত : ২০ মে, ২০২৬, ১১:১১ দুপুর
আপডেট : ২০ মে, ২০২৬, ১১:২১ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

৯৬ সা‌লের এই দি‌নে রাষ্ট্রপতি ফোন করে বলে‌ছি‌লেন, ঢাকায় যেন কোনো সৈন্য ঢুকতে না পারে

এল আর বাদল : ত্রিশ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের ২০শে মে'র ঘটনা। বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভারি অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর একদল সদস্য। অন্যদিকে তাদের ঠেকাতে ঢাকায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করে আরেকদল সেনা সদস্য।

বাংলাদেশে তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্তির পর সেই সরকারের অধীনে তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে একদিন পরেই। ঠিক সেই সময় ১৯৯৬ সালের ২০শে মে হঠাৎই করেই দেশে এক নাটকীয় ঘটনা ঘটতে শুরু করে। ------ বি‌বি‌সি বাংলা

তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় সৈন্যদের মার্চ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম। ঢাকার বাইরের সেনানিবাস থেকে সৈন্য তলব করেছিলেন। অন্যদিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের একটি অংশ সেই চেষ্টা ঠেকাতে নিজেদের সৈন্য সমাবেশ করতে শুরু করেন।

ওইদিন বাংলাদেশে একটি সেনা অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরে সেনাপ্রধানের ওই চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের ২০শে মে এই ঘটনা ঘটলেও পুরো বিষয়টি শুরু হয়েছিল আরো দুইদিন আগে থেকে।

এ নিয়ে বাংলাদেশে বেশ কিছু বই রচিত হয়েছে। সেখানে এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এসেছে নানাভাবে। ঘটনার পরপর পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। ওই ঘটনার মাত্র ২২ দিন পরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।।

ঘটনাটির সূত্রপাত যেভাবে

বাংলাদেশের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম. এ. হাকিম 'একটি সামরিক অভ্যুত্থানঃ ব্যর্থ প্রয়াস' বইয়ে এই ঘটনাটির আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছিলেন।

সেই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ২০শে মে'র ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল দু'জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোকে ঘিরে। ১৮ই মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের নির্দেশে বগুড়া সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান ও তৎকালীন বিডিআরের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

অন্যদিকে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এম এ মতিন তার আমার দেখা ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান' ৯৬ বইয়ে লিখেন, হেলাল মোর্শেদ খান ও ব্রিগেডিয়ার মিরনকে সেনাবাহিনী থেকে অপসারণকে ঘিরে তখন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের সাথে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সেখান থেকে ঘটনাটির শুরু।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "হেলাল মোর্শেদ খান ও ব্রিগেডিয়ার মিরন তখন ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের খুব ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচালিত ছিল। যে কারণে তাকে না জানিয়ে ওই দুইজন সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন জেনারেল নাসিম"।

সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম. এ. হাকিম 'একটি সামরিক অভ্যুত্থানঃ ব্যর্থ প্রয়াস' বইয়ে লিখেন, রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তকে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মি. নাসিম মেনে নিতে পারেন নি। তিনি এ আদেশ কার্যকরী না করে তার অনুগত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে রাষ্ট্রপতিকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেন'।

বইয়ে উল্লেখ করা হয়, ওই ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৯শে মে তৎকালীন সেনাপ্রধান মি. নাসিমের নির্দেশে সেনাবাহিনীর তৎকালীন চারজন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন, মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূইয়া, ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রহিম এবং কর্নেল আব্দুস সালামের বাসার টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ হিসেবে বইয়ে উল্লেখ করা হয়, 'এসব কর্মকর্তারা সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নাসিমের উচ্চাভিলাষ ও অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের বিরোধিতা করেছিলেন'।

এই ঘটনাগুলো এমন একটি সময় ঘটেছিল ঠিক তার আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন অধিকাংশ বিরোধী দল বর্জন করে। তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানে সংশোধনী এনে 'নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা চালু করে এবং সংসদ ভেঙে দেয়। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৭শে এপ্রিল সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় ১২ই জুন।

মি. মতিনের 'আমার দেখা ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান' ৯৬ বইয়ে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের আদেশে দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন সেনাপ্রধান মি. নাসিম রাষ্ট্রপতির অনুগত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে তাদের পদ থেকে প্রত্যাহার বা বাহিনীতে সংযুক্তি করার নির্দেশ দেন।

বইটিতে আরো উল্লেখ করা হয়, এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই অস্থিরতা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমানকে সম্পূর্ণ বিষয়ে অবহিত করে সেনাপ্রধানকে তার কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান সেই চেষ্টা করেও বিফল হন।

সেনাবাহিনীকে ঢাকায় মার্চ করার নির্দেশ

এমন অস্থির অবস্থার মধ্যেই ২০শে মে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অংশ হিসেবে প্রতিটি ডিভিশনে যোগাযোগ করেন সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল নাসিম। সেই সঙ্গে প্রতিটি ডিভিশন থেকে এক ব্রিগেড সৈন্য ঢাকায় প্রেরণের আদেশ দেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তার আদেশ মেনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

'একটি সামরিক অভ্যুত্থানঃ ব্যর্থ প্রয়াস' বইয়ে এম. এ. হাকিম লিখেন, '২০শে মে ১৯৯৬ সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নাসিম ময়মনসিংহ, বগুড়া ও যশোর এর এরিয়া কমান্ডার যথাক্রমে মেজর জেনারেল আইন উদ্দিন, মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান, মেজর জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে এক বিগ্রেড গ্রুপ করে সেনাদল এক একজন ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশ দেন ও মুভ অর্ডার জারি করেন'।

মে. জেনারেল এম এ মতিন তার বইয়ে লেখেন, 'তিনি (সেনাপ্রধান নাসিম) তিনি এই একই আদেশ মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামানের অধীনস্থ সাভারের নবম ডিভিশনকেও দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছিল যে সেনাপ্রধানের উদ্দেশ্যে ছিল রেডিও এবং টেলিভিশন দখল করা এবং বঙ্গভবন ঘোরও করে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে গ্রেফতার করা'।

সেনাপ্রধানের নির্দেশ পাওয়ার পর ময়মনসিংহ সেনানিবাস থেকে ব্রিগেডিয়ার জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে একটি ব্রিগেড গ্রুপ সেনাদল এবং বগুড়া সেনানিবাস থেকে ব্রিগেডিয়ার শফি মাহবুবের নেতৃত্বে একটি ব্রিগেড গ্রুপ সেনাদল ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। আর যশোর সেনানিবাস থেকে একটি ব্রিগেড গ্রুপ প্রস্তত করা হয়েছিল কিন্তু যাত্রা করার সময় পায়নি বলেও এম এ হাকিম তার বইয়ে লিখেছেন।

তখন যশোর সেনানিবাসের জিওসি সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম সেনাপ্রধান নাসিমের খুব অনুগত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সময়ে কি হয়েছিল তা নিয়ে বিবিসি বাংলা কথা বলেছে মি. ইব্রাহীমের সাথেও।

বিবিসি বাংলাকে মি. ইব্রাহীম বলেন, "জেনারেল নাসিম যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল সেগুলো ছিল পক্ষপাতদুষ্ট। আমি জেনারেল নাসিমের আইনানুগ হুকুমের অধীনে ছিলাম। কিন্তু আমার অন্তর তার হুকুম মানার পক্ষে ছিল না। তাই সেদিন যশোর সেনানিবাস থেকে কোন সৈনিক ক্যান্টনমেন্ট সীমানার বাইরে আমি পাঠাই নাই।

ওই সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা নিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "তখন এক ধরনের গুঞ্জন ছিল অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাটি ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং বিএনপির বিরুদ্ধে।

প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছিল যেভাবে

সাবেক সচিব এম এ হাকিম তার বইয়ে উল্লেখ করেন, 'সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান ও কুমিল্লার ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন সেনাপ্রধানের রাষ্ট্রেদ্রোহীতামুলক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় অংশ না নিয়ে রাষ্ট্রপতির ডাকে সাড়া দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসেন'।

সেই সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা নিয়ে যে সব বই পুস্তক রয়েছে তার বেশিরভাগেই সেদিনের সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামানের ভূমিকার কথা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামানের সাথেও এ নিয়ে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তিনি সেই ২০শে মে'র সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেন।

তিনি বলেছিলেন, "একদিকে সেনাপ্রধান যখন তাকে ঢাকায় অস্ত্রসহ মার্চ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, ঠিক তখন রাষ্ট্রপতি তাকে বলেছিলেন তা প্রতিহতের। রাষ্ট্রপতি আমাকে ফোন করে বললেন, ঢাকায় যেন কোন সৈন্য ঢুকতে না পারে"।

মি. ইমামুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "২০ শে মে তারিখে সেনাপ্রধান অর্ডার দিলেন সব ক্যান্টনমেন্ট সৈন্য ঢাকায় সমাবেশ করতে। সেনাপ্রধানের অর্ডারের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস আমাকে ফোন করে বললেন ঢাকাতে সমাবেশ করবা না। এছাড়া ঢাকা অভিমুখে বাইরে থেকে যে সব সৈন্যরা আসে তাদেরকে প্রতিরোধ করো। তাদেরকে প্রতিরোধ করে রাখলাম"।

একটি সামরিক অভ্যুত্থান: ব্যর্থ প্রয়াস বইয়ে বলা হয়েছে, সাভার সেনানিবাস থেকে এক ব্রিগেড সেনাদল ময়মনসিংহ থেকে আগত ব্রিগেড গ্রুপকে ঢাকার অদূরে শ্রীপুরে বাঁধা প্রদান করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করে এবং অন্য এক ব্রিগেড বগুড়া থেকে আগত বিদ্রোহী গ্রুপকে বাঁধা প্রদানের জন্য আরিচাঘাটে অবস্থান গ্রহণ করে।

বগুড়া থেকে আসা সেনাদল ঠেকাতে পদ্মা নদীতে চলাচলরত সব ফেরি আরিচাঘাটে এনে জড়ো করে রাখা হয়। এছাড়া কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আগত একটি ব্রিগেড ঢাকা আর্মি স্টেডিয়াম ও মাওয়া ঘাটে অবস্থান নেয়। সাভার থেকে ১০টি ট্যাঙ্ক ও একদল সেনা বঙ্গভবন সুরক্ষার জন্য এবং ১০টি ট্যাঙ্ক এবং একদল সেনা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্ডন করে রাখে।

রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সেনাদল ও সাভারের সৈনিকগণ রেডিও এবং টিভি স্টেশন বিদ্রোহী সেনাপ্রধানের সেনাদলের দখল থেকে রক্ষা করার জন্য ঘেরাও করে রাখে। এসব অবস্থান ও কর্ডনের কাজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে সম্পন্ন করে রাখা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয় মি. হাকিমের বইয়ে। সেনাবাহিনীর একটি অংশের ঢাকামুখী মার্চ, আরেকটি অংশের তা প্রতিহতের চেষ্টার এসব খবর পরবর্তী দুইদিন দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়।

২২শে মে দৈনিক জনকণ্ঠের খবরে বলা হয়, ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৬৫টি লরি ও অস্ত্রসহ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক সৈন্য। তারা ২০ই মে রাত পর্যন্ত গাজীপুরের শ্রীপুর থানার তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান করার পর ওইদিন গভীর রাতে আবার ময়মনসিংহ ফিরে যায়।একইভাবে দেশের অন্য জায়গাগুলো থেকে সেনাবাহিনীর টিমগুলোকে ঢোকার প্রচেষ্টাও ঠেকিয়ে দেওয়া হয়।

একই দিন মানিকগঞ্জ সংবাদদাতার বরাত দিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় বলা হয়, ঘাটে সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ঘাটের পাঁচটি পন্টুনে ভারি মেশিনগান ও মর্টার স্থাপন করা হয়েছে। আরিচা ঘাটের উজানে জাফরগঞ্জ এবং ভাটিতে কাশাদহ পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ কিঃমিঃ নদীর পাড়ে একই ধরনের অস্ত্র স্থাপন করে সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়েছে। আনা গেছে, আরিচা ও নগরবাড়ী ঘাটের মধ্যবর্তী যমুনা নদীর কয়েকটি চরেও সেনা সদস্যদের দেখা গেছে। ঘাট এলাকায় সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ইমামুজ্জামানের নির্দেশে যখন এভাবে ট্যাঙ্কগুলো মুভ করছিল তখন জেনারেল নাসিম মনে করেছিল এটা তাদের পক্ষে। কিন্তু ইমামুজ্জামান মুভ করেছিলেন তাদেরকে প্রতিহত করতে।

থমথমে ঢাকা, সেনাপ্রধানকে অবসর

সেনাবাহিনীর একটি অংশ সেনাপ্রধানের নির্দেশে ঢাকায় ঢোকার চেষ্টা করেছে, আরেকটি পক্ষ সতর্ক অবস্থা নিয়ে তাদের প্রতিহত করলেও দেশের কোথাও কোন ধরনের গোলাগুলি বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

একটি সামরিক অভ্যুত্থানঃ ব্যর্থ প্রয়াস বইয়ে উল্লেখ করা হয়, 'ঢাকার রাস্তায় সাড়ে পাঁচটার দিকে ট্যাঙ্কের চলাচল ঢাকাবাসী অবলোকন করেছে। ঢাকার রাস্তায়-ঘাট ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল এবং দোকান-পাট বন্ধ করা হয়েছিল। লোকজন আতঙ্কে যার যার ঘরে অবস্থান করছিলেন'।

এর আগেই রাষ্ট্রপতির বাসভবন তথা বঙ্গভবন, রেডিও টেলিভিশন অফিসসহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বিকাল সাড়ে ৫টায় রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস রেডিও এবং টেলিভিশনে ভাষণ দেন।

এর আগেই দুপুরের দিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বলেন, "বেলা ৩টার দিকে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিলেন জেনারেল নাসিমকে বরখাস্ত করে জেনারেল মাহবুবকে সেনাপ্রধান বানাবেন। সে সময়ে প্রতিরক্ষা সচিব বহিষ্কারাদেশ ও নতুন সেনাবাহিনীর নিয়োগ রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষণা করে দিলেন"।

সেই সময়ের প্রতিরক্ষা সচিব এম এ হাকিম তার বইয়ে লেখেন, 'বিকেল সাড়ে পাঁচটায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ টেলিভিশনে প্রচার হওয়ার পর আমি বঙ্গভবন ত্যাগ করে কোন এক অজ্ঞাত স্থানে চলে যাই। ভয় করছিল এ জন্য যে রাষ্ট্রপতির অনুগত সেনা গ্রুপগুলোকে পরাস্ত করে বিদ্রোহী সেনাপ্রধানের অনুগত বাহিনী ঢাকায় ঢুকে না পড়ে'।

তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত ও ভাষণের পর লে. জেনারেল নাসিমের সমর্থক সেনা কর্মকর্তারা একে একে সরে যেতে শুরু করেন এবং তিনি সেনাসদরে একা কার্যত বন্দি হয়ে পড়েন।

সেখানে থাকা অবস্থায়ই ওইদিন বিবিসি বাংলাকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন লে. জেনারেল নাসিম। সেখানে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে 'অবৈধ আদেশ' বলে দাবি করেন।

মি. নাসিম তখন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "আমাকে রিটায়ার করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমি তো সেনাবাহিনী প্রধান। সেই রিটায়ারটা তো ইলিগ্যাল অর্ডার। কারণ রিটায়ারমেন্ট করতে হলে তার একটা নিয়ম আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোন নিয়ম কানুন অনুসরণ করা হয় নাই। রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস তার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, জেনারেল নাসিম আদেশ পালন না করে ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছেন।

সেই ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণ করে দুই শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে অবসর দেওয়া হয়েছে। তার এই আচরণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হয়।

একই দিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। সেই ভাষণে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি স্বীয় বিবেচনায়, নিজ সিদ্ধান্তে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার জন্য আহ্বান জানান।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়