পারমাণবিক জ্বালানি এমন এক ধরনের শক্তির উৎস, যা পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এই নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত। সাধারণত এই শক্তি দুইভাবে পাওয়া যায়—নিউক্লিয়ার ফিশন এবং নিউক্লিয়ার ফিউশন। তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত ফিশন প্রযুক্তি।
ফিশন প্রক্রিয়ায় একটি ভারী পরমাণু ভেঙে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয় এবং সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। অন্যদিকে ফিউশন হলো একাধিক পরমাণু মিলিত হয়ে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া, যা এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।
ফিশন প্রক্রিয়ায় সাধারণত ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়। যখন একটি নিউট্রন এই পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করে, তখন সেটি ভেঙে দুটি ছোট নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং অতিরিক্ত নিউট্রন ও তাপশক্তি উৎপন্ন করে। এই অতিরিক্ত নিউট্রন আবার অন্য পরমাণুকে আঘাত করে একই ধরনের বিভাজন ঘটায়, ফলে একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়।
পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া। ছবি: ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি ।
এই ধারাবাহিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন তাপই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল শক্তির উৎস। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই তাপ শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয় একাধিক ধাপে।
প্রথমে, রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ফিশন প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়। এরপর সেই তাপে পানি গরম হয়ে উচ্চচাপের বাষ্পে রূপ নেয়। এই বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, যা একটি জেনারেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। জেনারেটর সেই যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করে।
এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই, তবে এখানে তাপের উৎস আসে পরমাণুর ভেতর থেকে।
পারমাণবিক জ্বালানির প্রধান উপাদান হলো ইউরেনিয়াম, যা পৃথিবীর বিভিন্ন শিলা ও খনিজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি রূপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগ অংশই ইউরেনিয়াম-২৩৮, যা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর নয়। অপরদিকে, ইউরেনিয়াম-২৩৫ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও এটি ফিশন বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম।
এই কারণে ইউরেনিয়ামকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধ করা হয়, যাতে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো যায় এবং এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হয়।
উল্লেখ্য, ইউরেনিয়াম উত্তোলন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহৃত জ্বালানির ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় পারমাণবিক জ্বালানি চক্র।
এই চক্রের ধাপগুলো হলো: খনি থেকে ইউরেনিয়াম আহরণ, সমৃদ্ধকরণ, রিঅ্যাক্টরে ব্যবহার, এবং শেষে ব্যবহৃত জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা বা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ।
পারমাণবিক শক্তি একটি স্বল্প-কার্বন শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় এতে প্রায় কোনো কার্বন নির্গমন হয় না।
বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের একটি অংশ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে আসে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।