ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যে ইশতেহার দেয়, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই প্রথম অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের দমনে শিগগিরই ‘ক্রাকডাউন’ বা বিশেষ অভিযান চালাতে যাচ্ছে সরকার। এই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেবে। রাজধানী ঢাকা দিয়ে শুরু হবে এই বিশেষ অভিযান। এ জন্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দাগি আসামি এবং মব সন্ত্রাসের নেতৃত্বদানকারীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে পুলিশ ও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এই তালিকা তৈরির কাজ শেষ হলেই সমন্বিত বিশেষ অভিযান শুরু হবে। এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা শেষ করার কিছুদিন পরই সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্যারাকে ফিরে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়। এরপর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং একের পর এক খুনোখুনিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এতে মানুষের মনে চরম আতঙ্ক আর উদ্বেগ দেখা দেয়।
নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বেসামাল হয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কঠিন সিদ্ধান্ত নেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মানুষের নিরাপত্তা বিধানে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে সারা দেশে একযোগে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। মধ্যরাতে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে এই অভিযান শুরু হয়। প্রথম রাতের অভিযানে ১ হাজার ৪০০ ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন, যাদের একটি বড় অংশই ছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অভিযানে তিনি অপরাধে জড়িত নিজ দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করান। এতে শান্তি ফেরে দেশে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তেমনিভাবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের নিরাপত্তা বিধানে দলমত বিবেচনা না করে অভিযান চালানোর সবুজ সংকেত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনোখুনি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির খবর আসছে গণমাধ্যমে। দিনের পর দিন তা বাড়ছেই। পুলিশের অপরাধ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৫ দিনে হত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির কর্মী তিনজন, যুবদল নেতা একজন, ছাত্রদল কর্মী একজন ও জামায়াত সমর্থক একজন রয়েছে। নিহতের মধ্যে ছুরিকাঘাতে নিহত আট, গুলিতে খুন তিন। এ ছাড়া গণপিটুনি, শ্বাসরোধ, চাকুর আঘাত ও সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন কয়েকজন। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন সাতজন।
সূত্র বলেছে, পুলিশ গোয়েন্দারা যে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে, তার মধ্যে চাঁদাবাজদের পৃথক তালিকা করা হচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে টেম্পোস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক চাঁদাবাজ, বাস টার্মিনাল, ফুটপাতের চাঁদাবাজ, কাঁচাবাজার, মার্কেট, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, নৌবন্দরকেন্দ্রিক ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ এবং নৌপথ ও সড়কপথকেন্দ্রিক চাঁদাবাজ। পুলিশের পাশাপাশি এনএসআই, ডিজিএফআই এবং এসবি এই তালিকা তৈরির কাজ করছে। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক শুটার, সন্ত্রাসী, দখলবাজ, দাগি অপরাধী এবং মাদক ব্যবসায়ীদেরও তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যারা মব সন্ত্রাস করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করেছেন তাদেরও একটি তালিকা করা হচ্ছে। এসব তালিকা তৈরি করতে কোনো দলমত যাতে দেখা না হয়, এ বিষয়ে সরকার থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের অপরাধে জড়িত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নামও তালিকায় স্থান পাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার গত মঙ্গলবার আমাদের সময়কে বলেন, ডিএমপির ৫০ থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধীদের তালিকা তৈরির কাজ করছে। তালিকা তৈরির পর বিশেষ অভিযান শুরু হবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির আরও বহুমুখী কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) হেডকোয়ার্টার্সে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুটি বিষয়ে আমি অনুশাসন দিয়েছি। আমরা শিগগির দেশব্যাপী, বিশেষ করে ঢাকা থেকেই শুরু করব। আমরা চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত করে সেই হিসেবে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব। দ্বিতীয়টি যারা অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী, দাগি আসামি, যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেটা নির্মোহভাবে (তালিকা) প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং আনবায়াসড (পক্ষপাতহীন) তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেটা আমরা পর্যালোচনা করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব শিগগিরই। এই দুটা বিষয়ে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়েছি। সেদিকেই যাচ্ছি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে যেন দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় এবং জনগণ স্বস্তিতে থাকে। এভাবেই আমরা এগোতে চাই। আশা করি, এই মেসেজটা সারা জাতিকে দেবেন।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শিগগিরই আমরা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারি, যেভাবে আমরা পরিকল্পনা করছি। আমরা যেন সফল হতে পারি, সেই জন্য সবাই সহযোগিতা করবেন।’
সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়