শিরোনাম
◈ নারায়ণগঞ্জে মাদক ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার তারেক রহমানের ◈ গভীর রাতে বিসিবি সভাপতি বুলবুলের দেশ ছাড়ার গুঞ্জন! ◈ জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি ◈ প্যারোল কী, কারা পান এবং কীভাবে—বাংলাদেশের আইন কী বলে ◈ ভোটকেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও ভোট গণনা করা যাবে না: ইসির পরিপত্র জারি ◈ ক্ষমতায় গিয়ে কথা না রাখলে জবাব দিতে হবে: তারেক রহমান ◈ ইতিহাসের সব রেকর্ড ভাঙল স্বর্ণের দাম ◈ ‘ভয়াবহ দুর্নীতি’ আদানি চুক্তিতে: বাতিলের জন্য যেতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে ◈ সিডনিকে সিক্সার্সকে হা‌রি‌য়ে বিগ ব্যাশে রেকর্ড ষষ্ঠ শিরোপা জয় কর‌লো স্করচার্স ◈ দেশের মানুষের জন্যই বিএনপির রাজনীতি: তারেক রহমান

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:৪৫ রাত
আপডেট : ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৭:২০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্যারোল কী, কারা পান এবং কীভাবে—বাংলাদেশের আইন কী বলে

বাংলাদেশের বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় 'প্যারোল' শব্দটি প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা বড় মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে এর আইনি প্রক্রিয়া জনমনে কৌতূহল ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। তবে অনেকের কাছেই অস্পষ্ট যে, আইন আসলে কাকে, কেন এবং কীভাবে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ দেয়।

'প্যারোল' একটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ 'প্রতিশ্রুতি'। আইনে এটি মানে কারাগারের বন্দিকে বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি দেওয়া।

তবে এটি কোনো চূড়ান্ত মুক্তি নয়, বরং সাজা চলাকালে একটি নিয়ন্ত্রিত সাময়িক অবকাশ। সাধারণত এর সময়কাল খুব কম হয়, প্রায়ই ১২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি সময়ের জন্যও হতে পারে।

আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশে প্যারোলে মুক্তির জন্য একক কোনো 'প্যারোল আইন' নেই। কয়েকটি আইন ও নীতিমালার সমন্বয়ে এটি পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪০১(১) ধারায় সরকারকে যেকোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির দণ্ড শর্তহীন বা শর্তসাপেক্ষে স্থগিত বা মওকুফ করার পরিপূর্ণ ক্ষমতা দেয়। যদি কেউ শর্ত ভঙ্গ করে, তবে ৪০১ ধারার উপধারা (৩) অনুযায়ী পুলিশ তাকে বিনা পরোয়ানায় আবার গ্রেপ্তার করতে পারে।

৪০২ ধারা অনুযায়ী, সরকার বন্দীর সম্মতি ছাড়াই তার কঠোর সাজাকে লঘুকরণ (যেমন মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন) করতে পারে।

বাংলাদেশ জেল কোড মূলত ১৮৯৪ সালের প্রিজন্স অ্যাক্ট, ১৯০০ সালের প্রিজনার্স অ্যাক্ট এবং ১৯২০ সালের আইডেন্টিফিকেশন অব প্রিজনার্স অ্যাক্টের একটি সংকলন। জেল কোড অনুযায়ী বন্দীদের খাবার, চিকিৎসা, এবং ভালো আচরণের ভিত্তিতে 'রেমিশন' বা সাজা মওকুফের হিসাব রাখা হয়।

২০১৬ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নীতিমালা রয়েছে, যা প্যারোলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা। প্যারোল নিয়ে অস্পষ্টতা কাটাতে সরকার ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। 

এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিকটাত্মীয়ের (বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি) মৃত্যুতে জানাজা বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে বন্দিকে প্যারোল দেওয়া যাবে।

প্যারোলের শর্ত ও সময়সীমা: নীতিমালা অনুযায়ী প্যারোল কোনো নাগরিক অধিকার নয়, বরং এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। এর প্রধান কয়েকটি শর্ত আছে।

সাধারণত প্যারোল ১২ ঘণ্টার বেশি হয় না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার এই সময় কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) এই আদেশ মঞ্জুর করেন।

বন্দিকে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারায় থাকতে হয় এবং কারাগারের ফটক থেকে পুলিশ তাকে বুঝে নিয়ে আবার নির্ধারিত সময়ে ফেরত দেয়।

প্যারোলে মুক্তির প্রধান শর্ত ও কারণ: কারা কর্তৃপক্ষ এবং সরকার সাধারণত কতগুলো বিষয় বিবেচনা করে প্যারোল মঞ্জুর করতে পারে।

বন্দি যদি এমন কোনো প্রাণঘাতী বা গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন যার চিকিৎসা কারাগারের ভেতর বা কারাহাসপাতালে সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে প্যারোল মঞ্জুর করা হতে পারে।

কোনো নিকটাত্মীয়ের (বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান) মৃত্যু হলে জানাজায় অংশ নিতে বা শেষ বিদায় জানাতে সাময়িক প্যারোল দেওয়া হয়।

দীর্ঘমেয়াদী সাজাপ্রাপ্ত বৃদ্ধ বন্দি, যারা শারীরিকভাবে অক্ষম এবং কারাগারে যাদের আচরণ অত্যন্ত সন্তোষজনক, তাদের অনেক সময় প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়।

বিশেষ পরিস্থিতি, যেমন—জাতীয় সংকট, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা কারাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকলে লঘু অপরাধীদের ক্ষেত্রে এটি বিবেচনা করা হয়।

কীভাবে আবেদন করা হয়? : বন্দি বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়।

বন্দির আচরণ, তার অপরাধের প্রকৃতি এবং মুক্তির পর তার জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে যাচাই করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশে প্যারোলে মুক্তির আলোচিত কিছু উদাহরণ
বাংলাদেশে প্যারোলে মুক্তি বা দণ্ড স্থগিতের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। 

যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ 'প্যারোল' কি না তা নিয়ে আইনি বিতর্ক রয়েছে। তবে এটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারার অধীনে একটি বিশেষ মুক্তি, যেখানে শর্ত ছিল তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না। প্রথামে এই মুক্তির মেয়াদ ছয় মাস দেওয়া হলেও পরে তা আবার বাড়ানো হয়।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে সামরিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্যারোলের একটি বড় উদাহরণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও আলোচিত বন্দী তাদের বাবা বা মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুল হক তার মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়া জন্য প্যারোলে মুক্তি পান।

গত বছরের ১৯ জুন গাজীপুরের শ্রীপুর‌ে মাওনা ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম রিপন মায়ের জানাজায় অংশ নিতে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান।

২০১৯ সালে মায়ের মৃত্যুতে আট ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান মুদ্রাপাচার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় কারাগারের ভিড় কমাতে সরকার কয়েক দফায় কয়েক হাজার লঘু অপরাধী ও মানবিক বিবেচনায় বৃদ্ধ বন্দীদের প্যারোলে বা সাজা মওকুফের আওতায় মুক্তি দিয়েছিল।

চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক: প্যারোলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, বন্দি আবার অপরাধ করতে পারে।

এছাড়া প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্যারোল দেওয়া হলে অনেক সময় জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। 

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অনেক সময় একে 'বিচারের অবমাননা' হিসেবে গণ্য করে। 

তবে আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় বন্দিকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্যারোলের অন্যতম ইতিবাচক দিক। উৎস: ডেইলি স্টার।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়