বাংলাদেশের সড়ক, রেল, নৌপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য সুবিধা নিতে ৫০ বছর আগের একটি চুক্তিতে ট্রানজিট সুবিধা চাইছে পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। অপরদিকে বাংলাদেশ আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করতে চাইছে নেপাল থেকে। দুই দেশের এই চাওয়াপাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে ঢাকায় আগামীকাল থেকে দুই দিনব্যাপী বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপালের পক্ষে দেশটির শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সচিব রাম প্রসাদ ঘিমিরের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। ওপরের ইস্যু দুটি ছাড়াও সচিব পর্যায়ের বৈঠকে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), দুই দেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও পোখরার মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং নেপালের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বা পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর করার বিষয়গুলো এবারের আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ কার্যকর করতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিবিআইএন চুক্তি রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৫ জুন চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে চার দেশ। যদিও পরে ভূটানের সংসদ ওই চুক্তি রেটিফাই করেনি। বিবিআইএন চুক্তি অনুযায়ী নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে ২০২২ সালের ৩০ মে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়। তবে নেপাল বলছে, তারা দ্বিপক্ষীয় যে চুক্তি রয়েছে সেই চুক্তির আওতায় ট্রানজিট সুবিধা নিতে চায়।
জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ থেকে নেপালে পণ্য রপ্তানি করা হয় এবং অন্যান্য দেশ থেকে নেপালের আমদানি করা পণ্যগুলো ভারতীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ‘ট্রাফিক ইন ট্রানজিট’ হিসেবে পরিবহন করা হয়। রেলপথে ট্রাফিক ইন ট্রানজিট-৬টি রুট অন্তর্ভুক্ত থাকলেও মূলত দুইটি রুটে পণ্য পরিবহন হয়। ভারত-বাংলাদেশ ক্রসিং পয়েন্টে এ দুইটি রুট হচ্ছে রোহনপুর (বাংলাদেশ), সিঙ্গাবাদ (ভারত) এবং বিরল (বাংলাদেশ) রাধিকাপুর (ভারত) রেলপথ। প্রচলিত চুক্তি অনুযায়ী রেলপথ ছাড়াও জলপথেও ট্রানজিট সুবিধা চাইছে দেশটি।
আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব : বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে নেপাল। গত বছরের ৩ অক্টোবর নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী এই বিদ্যুৎ আসছে। এই চুক্তি অনুযায়ী দেশটি থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব দেবে ঢাকা।
পিটিএ নিয়ে আলোচনা : দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে প্রিফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়টি আলোচ্য সভায় গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের পিটিএ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এখন দ্বিতীয় দেশ হিসেবে নেপালের সঙ্গে চুক্তিটি কার্যকর করতে আলোচনার ইস্যুতে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে।
কক্সবাজার-পোখরা বিমান যোগাযোগ চায় নেপাল : দুই দেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশে বাংলাদেশের কক্সবাজারের সঙ্গে দেশটির পর্যটন শহর পোখরার সরাসরি বিমান যোগাযোগ সুবিধা চাইছে নেপাল। তবে এ সুবিধা দিতে হলে কক্সবাজার বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরাসরি পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর : নেপালের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি লেনদেন সুবিধা নেই। বর্তমানে ভারতের ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করে দেশটির সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ চাইছে নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি দ্বিপক্ষীয় পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর করতে। বাংলাদেশ ও নেপাল ২০২৬ সালে একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় ব্যবসাবাণিজ্য ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিও সচিব পর্যায়ের বৈঠকের আলোচনায় থাকছে। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের নেপালের ভিসাপদ্ধতি সহজীকরণ ও ত্বরান্বিতকরণ এবং নেপালের পক্ষ থেকে দেশটি তার পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিতে পারে বলে জানা গেছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন