শিরোনাম
◈ জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট নিয়ে ১০১ আলেমের তিন আপত্তি ◈ বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় আটক ২৮ ◈ মানবাধিকার সংগঠনের চোখে বাংলাদেশে 'মব সন্ত্রাস' উদ্বেগজনক, থামছে না কেন ◈ দেশের স্বার্থে বিএনপি-জামায়াত একসাথে কাজ করবে: জামায়াত আমির  (ভিডিও) ◈ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলা‌দে‌শে আসা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হলো না কেন? ◈ নেতৃত্ব বদলালেও সার্কের স্বপ্ন শেষ হয়নি: প্রধান উপদেষ্টা ◈ তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত আমিরের সাক্ষাৎ ◈ তারেক রহমানের সাথে ডাকসু ভিপির সাক্ষাৎ, রাজনীতিতে নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা বা বিভাজন থাকাটা গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য ◈ বিমানের রেকর্ড মুনাফা: আয় ১১ হাজার কোটি ছাড়াল, লাভ বেড়েছে ১৭৮ শতাংশ ◈ বিটিআরসি ভবনে হামলা, আটক ৩০

প্রকাশিত : ০২ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:০৯ রাত
আপডেট : ০২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মানবাধিকার সংগঠনের চোখে বাংলাদেশে 'মব সন্ত্রাস' উদ্বেগজনক, থামছে না কেন

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতা সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যা বা হামলার ঘটনা 'উদ্বেগজনক হারে' বেড়েছে। দেশটির বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে।

অর্ন্তবর্তী সরকারের গত এক বছরে মব সৃষ্টি করে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

দেশটির অন্তত তিনটি মানবাধিকার সংগঠন ২০২৫ সালের অর্থাৎ গত এক বছরের যে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, মব ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাস বছরজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

সংগঠনগুলো বলছে, গত বছরের তুলনায় দ্বিগুনেরও বেশি হারে বেড়েছে এই মব ভায়োলেন্স।

যদিও এই অপরাধে নিহত ও আহতের ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

এসব সংগঠন বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও মবের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এই মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের প্রেশার গ্রুপ নামে অভিহিত করার মতো বক্তব্যও এসেছে।

সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন সরকার মব ভায়োলেন্স থামাতে পারছে না?

এই অপরাধ প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

অন্তর্বর্তী সরকারই মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না- এমন অভিযোগও করছেন তারা।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বা এমএফএস এর প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান বলছেন, "মব ভায়োলেন্স থামাতে সরকারের কোনো উদ্যোগই নেই। এগুলো বন্ধ করার কী উদ্যোগ তারা নিয়েছে? তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) চায় না বলেই উদ্যোগ নেই।"

'মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যার হার বেড়েছে তিনগুণ'
২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স ' ডমিনেন্ট অ্যান্ড ডেডলি ট্রেন্ড বা প্রকট এবং প্রাণঘাতী ট্রেন্ড ' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত এক বছরের মানবাধিকার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংগঠনটি বলেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিং বা গণপিটুনির ঘটনা তিনগুন বেড়েছে।

মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যার হার বেড়েছে তিনগুণ ।

মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে ২০২৪ সালে ১২৬ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে, আর কেবল গত বছরই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০ জনে।

সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী মি. রহমান বলছেন, "এমন পরিস্থিতি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন। মব জাস্টিসের ঘটনাগুলোতে মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে বৃদ্ধি করে।"

এই মানবাধিকার কর্মীর দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে একেক সরকারের সময় একেক রকম অবস্থা দেখা যাচ্ছে।

" আগেতো শেখ হাসিনার সরকার অস্বীকার করতো আর এই সরকারের কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে ওনারা বলে, জানি না, জেনে জানাবো" বলেন মি. রহমান।

মব ভায়োলেন্স থামাতে সরকারের উদ্যোগ না নেওয়ার দুটো কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

" একটা কারণ হলো ওনারা চায় না। এই সরকারের ভেতরে (উপদেষ্টামণ্ডলি) এরকম কেউ কেউ আছে, কোনো উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে যারা ডিসকারেজ বা অনুৎসাহিত করে " দাবি করেন এই মানবাধিকার কর্মী।

তিনি এ-ও দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের ব্যক্তিগত উদ্যোগতো নেই, আবার সামষ্টিক উদ্যোগও নেই।

'পুরোনো নিপীড়ন পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে'
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

গত বছর রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় রূপলাল দাস এবং প্রদীপ দাসকে ভ্যানচোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে এই মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনেউল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর মব করে গণপিটুনিতে ঢাকাসহ আট বিভাগে ১৯৭ জন নিহত হয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৮।

আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বরং পুরোনো নিপীড়ন পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে চলছে। এটি সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের।

আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির বার্ষিক মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলেছে, মব সহিংসতা ও গণপিটুনীতে গত বছর ১৬৮ জন নিহত হয়েছে।

এদিকে, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী সাইদুর রহমান অভিযোগ করেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যেই কেউ না কেউ মব উস্কানিদাতাদের প্রশ্রয় দিতে পারেন।

" এ ধরনের মব ভায়োলেন্সে যারা বাইরে থেকে উস্কানি দেয় তাদের সাথে উপদেষ্টা পরিষদের কেউ না কেউ থাকতে পারেন। না হলে তারা থামাতো বলে বিশ্বাস আমার " বলেন মি. রহমান।

ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি পুলিশের
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে গত বছরের পাঁচই সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর যখন 'নুরাল পাগলার মাজারে' হামলা হয়, তখন পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু তারা হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

ফলে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্ষম করে তোলার মতো ক্যাপাসিটি বা সক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের নেই বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ সাইদুর রহমান।

এদিকে, কেন মব ভায়োলেন্স থামানো যাচ্ছে না- এমন বিষয়ে জানতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের মোবাইলে ফোন করা হলে রিসিভ করেননি তারা।

তবে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সহকারি মহা-পরিদর্শক এনামুল হক সাগরের বলেছেন, মব সন্ত্রাসের প্রতিটি ঘটনাকে পুলিশ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।

মব সন্ত্রাসকে একটি হঠাৎ সৃষ্ট, আবেগনির্ভর, সমষ্টিগত ক্ষেত্র বিশেষে পরিকল্পিত সহিংসতা উল্লেখ করে মি. হক বলেন, " অনেক ক্ষেত্রে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি এবং তাৎক্ষণিক জনরোষ পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। তবুও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করে না।"

পুলিশের উপস্থিতিতে মব সহিংসতা ঘটলেও তৎপরতা নেই কেন, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, " তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"

মব সহিংসতা রোধে পুলিশের প্রয়োজনীয় আইনগত ও অপারেশনাল সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

" ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল, বিট পুলিশিং জোরদার, দ্রুত রেসপন্স টিম মোতায়েন, গুজব প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং এবং মব সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান " বলেন পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মি. হক।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়