শিরোনাম
◈ সাকিব আল হাসানকে দলে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি ◈ শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশকে ভারত সবসময় সমর্থন করবে: প্রণয় ভার্মা ◈ পোস্টাল ব্যালট সংরক্ষণ-গণনা নিয়ে ইসির পরিপত্র জারি ◈ আইসিসি আমাদের অনুরোধে সাড়া দেয়নি, কিছু করার নেই: বিসিবি  ◈ আইসিসি প্রকাশ করল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন সূচি, বাংলাদেশকে নিয়ে দিলো বার্তা ◈ বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসতে পারবে না : হর্ষবর্ধন শ্রিংলা (ভিডিও) ◈ নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে আইজিপির নির্দেশ ◈ সাফ ফুটসালের শেষ ম্যাচে নেপালের কাছে পরা‌জিত বাংলা‌দেশ ◈ আচরণবিধি লঙ্ঘন, সারজিস আলম ও নওশাদকে শোকজ ◈ ‘বাংলাদেশের প্রতি অবিচার করেছে আইসিসি’

প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:২৩ দুপুর
আপডেট : ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৩:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে এন‌সি‌পি ও নাগ‌রিক ক‌মি‌টির দুই নেতা কীভাবে টিভি লাইসেন্স পেলেন?

এল আর বাদল : নতুন দুটি টেলিভিশন চ্যানেল অনুমোদন পাওয়ার পর অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশে আগের সরকারগুলো যেভাবে 'দলীয় বিবেচনায়' টেলিভিশন লাইসেন্সের অনুমোদন দিতো এবার অন্তর্বর্তী সরকারও তাই করেছে।

এবার যে দুজনের নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তাদের একজন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেতা, যিনি দলটিতে যোগ দেওয়ার আগে একটি পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন।

অন্যজন এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নেই, তবে এনসিপি গঠনের আগে এর উদ্যোক্তারা যে জাতীয় নাগরিক কমিটি করেছিলেন তাতে জড়িত ছিলেন তিনি। একটি পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তার। ------ বি‌বি‌সি বাংলা

তারা দুজনই অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, তারা আইন ও নিয়ম মেনেই লাইসেন্স পেয়েছেন এবং তাদের উদ্যোগের সঙ্গে বিনিয়োগকারী ও পেশাদার লোকজন সম্পৃক্ত আছেন।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল এবং বেসরকারি টেলিভিশনের লাইসেন্স পর্যালোচনার দায়িত্ব ওই কমিশনই পালন করবে বলে মতামত দিয়েছিলো।

কিন্তু তা না করে সরকার বিগত সরকারের মতো করেই নিজেদের ঘনিষ্ঠদের টিভি লাইসেন্স দিয়েছে বলে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা এ বিষয়ে (লাইসেন্স দেওয়া) সেরা চর্চা কেমন হতে পারে তারই সুপারিশ করেছিলেন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে বিবেচনায় নিয়ে টেলিভিশন লাইসেন্স বা অনুমোদনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরির সুযোগ সরকারের ছিল।

কিন্তু সেটি না করে সরকার এই বার্তাই কি দিলো কি না যে আমরা কর্তৃত্ববাদের পতন চাই, কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতিই টিকিয়ে রাখতে চাই," বলেছেন তিনি।

সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অবশ্য রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একই সঙ্গে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, "সরকার যেহেতু কোনো মিডিয়া বন্ধ করছে না, ফলে ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মিডিয়া দিয়ে মন্ত্রণালয় চাচ্ছে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে।

এবার কারা লাইসেন্স পেলেন

এবার টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্সের খবর গণমাধ্যমে আসার পরেই আলোচনা হচ্ছে, যাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তাদের কোন বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে এবং চ্যানেল পরিচালনার মতো বিশাল আর্থিক সক্ষমতা তাদের আছে কি-না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে লাইসেন্স পেয়ে আলোচনায় আসা এনসিপির নেতা আরিফুর রহমান তুহিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দলটি গঠিত হওয়ার আগেই '৩৬ মিডিয়া লিমিটেড' নামক কোম্পানির পক্ষে তিনি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলেন।

তিনি বলেছেন, লাইসেন্স কখনো ব্যক্তির হয় না, কোম্পানির পক্ষ থেকে একজন আবেদন করে এবং তার নামে হয়।

"আমরা জানুয়ারিতে কোম্পানি খুলেছি। এখানে অর্থলগ্নীকারী ব্যক্তিরাও আছেন। বোর্ড মনে করেছে পরিবর্তনের একটা সময় এসেছে। বোর্ড বললো- আপনি যেহেতু ১০ বছর ধরে সাংবাদিক, আপনি কোম্পানির পক্ষে আবেদন করেন। আমাকে সাংবাদিক হিসেবেই আবেদনের জন্য মনোনীত করেছেন তারা," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তাদের প্রস্তাবিত 'নেক্সট টেলিভিশনকে' লাইসেন্সের পাশাপাশি তরঙ্গ বরাদ্দ ও যন্ত্রপাতি আমদানির অনাপত্তিপত্রও দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।

'লাইভ টিভি' নামে আরেকটি টিভির লাইসেন্স পাওয়া আরিফুর রহমান বলছেন, তারা দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন।

"আমাদের কোম্পানিতে বিভিন্ন পেশার লোক আছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছু আমরা করিনি। আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিনিয়োগকারী, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞদের একত্র করে কোম্পানি গঠন ও আবেদনের বিষয়ে আমি সমন্বয়ের কাজ করেছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

জানা গেছে, গত জুন মাসে আবেদন করে গত মাসের শেষ দিকেই লাইসেন্সের অনুমোদন পেয়েছে মি. রহমানের এই কোম্পানিটি।

তবে দুটি কোম্পানিতেই বিনিয়োগকারী হিসেবে বিএনপির সাথে জড়িত কয়েকজন আছেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, এবার এটা প্রত্যাশিত ছিল যে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে এবং দেশে প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতার জন্য যেটি জরুরি ছিল। কিন্তু যেভাবে সরকার লাইসেন্স দিলো তাতে আগের সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি হলো," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। 

লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া কী

বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনের অনুমোদন দেয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। লাইসেন্সের জন্য তাদের কাছেই আবেদন করতে হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ সালে করা জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় সম্প্রচার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল এবং এক্ষেত্রে সম্প্রচার বিষয়ক লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সুপারিশ করার কথা সম্প্রচার কমিশনের।

ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার বা সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে।

কিন্তু সেই সরকার পরে আর এই ধরনের কোনো কমিশন গঠন করেনি। আবার এ মুহূর্তে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনও নেই। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আইনটি করতে পারলে তারাই বেশি খুশি হতেন।

জানা গেছে, বেসরকারি মালিকানায় স্যাটেলাইট টিভির লাইসেন্সের আবেদনকারীকে তার আবেদনের সঙ্গে যেসব কাগজপত্র জমা দিতে হয় সেগুলো হলো–– জাতীয় পরিচয়পত্র, আর্টিক্যাল অব মেমোরেন্ডাম, সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন, ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর সার্টিফিকেট, ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট, প্রজেক্ট প্রপোজাল ও চ্যানেল চালানোর মতো সামর্থ্য আছে উল্লেখ করে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা।

বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেছেন এমন কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, আবেদনকারীকে প্রথমে একটি কোম্পানি গঠন করতে হয় এবং একটি বাণিজ্যিক স্পেসে অস্থায়ী কার্যালয় নিতে হয়।

এরপর ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর সার্টিফিকেটসহ দরকারি কাগজপত্র ও বিনিয়োগ প্রস্তাবনা নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়।

মন্ত্রণালয় তা যাচাই বাছাই করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠায়। জননিরাপত্তা বিভাগ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে কোম্পানি, আবেদনকারী ও কোম্পানির অন্যদের বিষয়ে তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠায় মন্ত্রণালয়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেই রিপোর্ট আবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। রিপোর্টে ইতিবাচক সুপারিশ এলে তথ্য মন্ত্রণালয় সার্বিক বিষয় মূল্যায়ন করে অস্থায়ী অনাপত্তিপত্র দেয় আবেদনকারীকে।

এর তরঙ্গ বরাদ্দের জন্য বিটিআরসিতে আবেদন করেন আবেদনকারী। বিটিআরসির টেকনিক্যাল কমিটি সেটি মূল্যায়ন করে। তারাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে থাকে।

এরপর কমিশন তরঙ্গ বরাদ্দের অনুমতি পাওয়ার পর যেতে হয় স্যাটেলাইট কর্তৃপক্ষের কাছে। তাদের অনুমতি পাওয়ার পর যন্ত্রপাতি আমদানির লাইসেন্স নিতে হয় চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে।

পরে আবার যন্ত্রপাতি আমদানির সময়েও কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হয়। মূলত, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি পাওয়ার আগেই কোম্পানিগুলো চ্যানেলের জন্য লোকবল নিয়োগ ও স্টেশন তৈরির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে থাকে।

লাইসেন্স বিক্রি বাণিজ্য

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিভিশন লাইসেন্স বিক্রি বাণিজ্যও গত দুই দশকে বার বার আলোচনায় এসেছে। লাইসেন্স ব্যবসা বা মালিকানা হস্তান্তর নিয়ে বাণিজ্যের একটি চিত্র উঠে এসেছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে।

এতে বলা হয়, "লাইসেন্স নেওয়ার সময় সবাই হলফনামায় আর্থিক সামর্থ্য ও চ্যানেল প্রতিষ্ঠায় সক্ষমতার কথা বলেছেন। তাদের অনেকেই আবার লাইসেন্স নিয়ে পরে উচ্চমূল্যে মালিকানা বিক্রি করেছেন। এভাবে লাভবান হয়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া অনেক টেলিভিশন মালিক। এমনকি বিক্রির আগে সরকারের অনুমতিও নেওয়া হয়নি"।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, "একাত্তর টিভির লাইসেন্স অর্ধেক বিক্রি করা হয়েছিলো মেঘনা গ্রুপের কাছে। আর সময় টিভির লাইসেন্স বিক্রি হয়েছিলো সিটি গ্রুপের কাছে। চ্যানেল নাইনের ৮৫ শতাংশ মালিকানা ২২ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিলো এনটিভির সাবেক এক কর্মকর্তার কাছে।"

এছাড়া, বিএনপি আমলে মোসাদ্দেক আলী ফালুর আরটিভির মালিকানা পরে চলে গিয়েছিলো আওয়ামী লীগের মোর্শেদুল আলমের কাছে।

বিএনপির সাবেক এমপি মুশফিকুর রহমানের দেশটিভির লাইসেন্স কিনে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী ও আসাদুজ্জামান নুর।

তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য

এনসিপি নেতা আরিফুর রহমান তুহিন ও সাবেক নাগরিক কমিটির সদস্য আরিফুর রহমানকে লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন সরকারের তথ্য উপদেষ্ঠা মাহফুজ আলম।

রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। বরং, সরকার যেহেতু কোনো মিডিয়া বন্ধ করছে না, ফলে ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মিডিয়া দিয়ে মন্ত্রণালয় চাচ্ছে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে। মন্ত্রণালয় মনে করে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে নতুন মিডিয়া আসুক," বলেন তিনি।

মি. আলম আরও বলেন, "এটা নতুন করে আইনের মাধ্যমে করতে পারলে আমরা খুশি হতাম।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়