মাসের শুরুতে বেতন হাতে এলে মনে হয়—এই মাসে নিশ্চয়ই কিছু টাকা জমাতে পারব। কিন্তু মাস শেষ হতে হতে দেখা যায়, হিসাব মিলছে না। টাকা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! বাসা ভাড়া, বাজার, বিল, স্কুল খরচ—সব মিলিয়ে হাতে আর কিছুই থাকে না। অনেকেই তাই বলেন, ‘আমাকে দিয়ে আর সঞ্চয় হবে না!’
কিন্তু আসলে তা নয়। কিছু কৌশল মেনে চললে একটু একটু করে ভালো পরিমাণ টাকা জমানো সম্ভব।
চলুন জেনে নিই সহজ কিছু উপায়, যেগুলো মানলে মাস শেষে আপনার হাতে কিছু টাকা থাকবে।
আগে জানুন টাকা কোথায় খরচ হয়
সঞ্চয়ের প্রথম কাজ হলো নিজের খরচের খাতগুলো জানা। এক মাসের জন্য ছোট করে নোট করুন—কোথায় কত খরচ হচ্ছে। মোবাইল রিচার্জ, চা-নাশতা, অনলাইন কেনাকাটা সবই লিখে রাখুন। এজন্য মোবাইলের নোটপ্যাড, খাতা কিংবা কোনো অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
অনেকেই অবাক হয়ে দেখেন, মাসে চা-নাশতা, অনলাইন অর্ডার বা রিকশা ভাড়াতেই কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। যখন খরচের খাতগুলো চিহ্নিত হবে, তখন কোথায় কাটছাঁট করা যায়, সেটিও সহজে বোঝা যাবে। অনেক সময় দেখা যাবে, ছোট ছোট খাতে বড় অঙ্ক খরচ হয়ে যাচ্ছে।
বেতন পেলেই সঞ্চয় আলাদা করে রাখুন
অনেকেই বলেন, ‘মাস শেষে যা থাকবে, তা জমাব।’ কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, মাস শেষে দেখা যায়, হাতে আর কিছুই থাকে না। তাই বেতন পাওয়ার দিনই অন্তত ১০ শতাংশ টাকা আলাদা করে রাখুন। সম্ভব হলে ২০ শতাংশ।
ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী আরমান হোসেন বলেন, আগে মাস শেষে যা থাকত, তা জমাতাম। প্রায় কিছুই জমত না। এখন বেতন পাওয়ার দিনই একটি আলাদা অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিই। ফলে সঞ্চয় অনেক সহজ হয়ে গেছে।
টাকা জমানোর এটা একটা ভালো কৌশল। তাই এই কৌশলে অভ্যস্ত হতে পারেন।
হুট করে কেনাকাটা বন্ধ করুন
অনলাইনে কিছু দেখলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেললেন—এটা অনেকেরই অভ্যাস।
কিন্তু পরে দেখা যায়, ওই জিনিসটা আসলে দরকারই ছিল না। এ ধরনের তাৎক্ষণিক কেনাকাটা অনেকের বাজেট নষ্ট করে।
তাই কোনো বড় কেনাকাটার আগে অন্তত এক দিন অপেক্ষা করুন। অনেক সময় দেখা যাবে, পরদিন আর জিনিসটি কেনার ইচ্ছাই নেই।
বিদ্যুৎ ও পানি, দুটোই বাঁচান
বিদ্যুৎ খরচ কমানো মানেই শুধু বিল কমানো নয়, পরিবেশও রক্ষা।
অপ্রয়োজনীয় লাইট বন্ধ রাখা, ব্যবহার না করলে চার্জার খুলে রাখা, পুরোনো বেশি বিদ্যুৎ খরচ করা যন্ত্রপাতির বদলে সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে।
এসব অভ্যাস মাস শেষে ভালো অঙ্কের টাকা বাঁচাতে পারে।
বাইরে খাওয়ার অভ্যাস কমান
একদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়া বড় কিছু না মনে হলেও, মাস শেষে হিসাব করলে বড় অঙ্ক হয়ে যায়।
তাই নিয়মিত ঘরের খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ঘরের খাবার কেবল সস্তা নয়, স্বাস্থ্যকরও।
বাইরে খেতে ইচ্ছে হলে, মাসে এক-দু’দিন যেতে পারেন। কিন্তু সেটা যেন অভ্যাস না হয়ে যায়।
বাজারে তালিকা নিয়ে যান
ছাড় মানেই সাশ্রয় নয়। অনেকেই কেবল অফার দেখে এমন জিনিস কিনে ফেলেন, যার আসলে প্রয়োজন নেই।
তাই কেনাকাটার আগে তালিকা তৈরি করুন। তালিকার বাইরে কিছু কিনতে হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটি কি সত্যিই দরকার?
অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করুন
অনেকের মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড বা অনলাইন সেবার সঙ্গে নানা সাবস্ক্রিপশন চালু থাকে। বিভিন্ন ওটিটির সাবস্ক্রিপশন নেওয়া থাকে, অথচ দেখাই হয় না।
এসব খাতে মাসে ২০০, ৩০০ বা ৫০০ টাকা করে কাটতে কাটতে বছরের শেষে বড় অঙ্ক হয়ে যায়।
তাই যেগুলো নিয়মিত ব্যবহার করেন না, সেগুলো বন্ধ করে দিন।
বাড়তি আয়ের উপায় খুঁজুন
শুধু খরচ কমালেই হবে না, আয় বাড়ানোর চেষ্টাও করতে হবে।
অনেকে অবসরে অনলাইনে কাজ করেন, টিউশনি করান, হোমমেড খাবার বিক্রি করেন বা ছোটখাটো ব্যবসা করেন।
খুলনার গৃহিণী নুসরাত জাহান ঘরে তৈরি কেক বিক্রি করেন। তিনি বলেন, শখের কাজ থেকেই শুরু করেছিলাম। এখন প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা আলাদা আয় হচ্ছে, যা সরাসরি সঞ্চয়ে চলে যায়।
ব্যবহার না করা জিনিস বিক্রি করুন
বাড়িতে এমন অনেক জিনিস থাকে, যা বছরের পর বছর ব্যবহারই হয় না। পুরোনো আসবাব, ইলেকট্রনিকস বা অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে বিক্রি করে অতিরিক্ত কিছু টাকা পাওয়া যেতে পারে।
সঞ্চয়কে অভ্যাস বানান
সঞ্চয় একদিনে হয় না। প্রতি মাসে অল্প অল্প করে জমতে জমতেই বড় অঙ্ক তৈরি হয়। হয়তো আজ এক হাজার টাকা জমাতে পারছেন। কয়েক মাস পর তা দুই হাজার হবে। তারপর আরও বেশি।
গুরুত্বপূর্ণ হলো শুরু করা এবং নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া।
মনে রাখুন
সঞ্চয় করার জন্য বড় আয় দরকার হয় না, প্রয়োজন ছোট ছোট ভালো অভ্যাস। খরচ একটু কমানো, একটু পরিকল্পনা করা ও নিয়মিত সঞ্চয় করা, এই তিনটি কাজই ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করে। মনে রাখবেন, মাস শেষে কত আয় করলেন তা নয়, কতটা জমাতে পারলেন সেটাই আসল কথা।
সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, উইকিহাউ, মাই মানি