মানুষের জীবন গুনাহ, দুশ্চিন্তা ও নানা পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে হৃদয়ের প্রশান্তি, আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো জিকির। জিকির শুধু ঠোঁটের উচ্চারণ নয়; এটি মুমিনের হৃদয়ের জীবন, আত্মার প্রশান্তি এবং ইমানের আলো।
অনেক ইবাদত আছে, যা করতে শারীরিক শক্তি, সময় কিংবা সম্পদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কিছু আমল রয়েছে, যা অল্প সময়েই বান্দাকে এনে দেয় বিশাল প্রতিদান। তেমনই এক মহামূল্যবান আমল হলো— প্রতিদিন ১০০ বার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এই মহান জিকির পাঠ করা—
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাই’ইন কাদির।’
অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তারই, সমস্ত প্রশংসাও তার। আর তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।’
এই জিকিরের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সুসংবাদ দিয়েছেন, যা একজন মুমিনের হৃদয়কে আশায় ভরিয়ে দেয়। হাদিসের আলোকে এই জিকিরের মর্যাদা—
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَالَ: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ؛ كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ، وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَةُ حَسَنَةٍ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَةُ سَيِّئَةٍ، وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنَ الشَّيْطَانِ يَوْمَهُ ذٰلِكَ حَتَّى يُمْسِيَ، وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذٰلِكَ
‘যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার বলবে— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন কাদির’, তার জন্য ১০ জন দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব লেখা হবে, ১০০টি নেকি লেখা হবে, ১০০টি গুনাহ মাফ করা হবে এবং সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটি তার জন্য শয়তান থেকে সুরক্ষা হবে। আর কেউ তার চেয়ে উত্তম আমল নিয়ে আসতে পারবে না, তবে সে ব্যক্তি ছাড়া যে এর চেয়ে বেশি আমল করেছে।’ (বুখারি ৩২৯৩; মুসলিম ২৬৯১)
এই জিকিরের অসাধারণ ফজিলত
১. ১০ জন দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব
ইসলামের যুগে দাস মুক্ত করা ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ব্যয়বহুল ইবাদত। অথচ আল্লাহর রহমতে একটি সহজ জিকিরের মাধ্যমে বান্দা সেই মহৎ সওয়াব লাভ করতে পারে। এটি প্রমাণ করে— আল্লাহ তার বান্দার জন্য জান্নাতের পথ কত সহজ করে দিয়েছেন।
২. ১০০ নেকি লেখা হয়
প্রতিটি জিকির আল্লাহর কাছে মূল্যবান। এই জিকিরের মাধ্যমে অল্প সময়েই একজন মুমিন তার আমলনামা নেকিতে ভরিয়ে তুলতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
‘যে একটি নেক আমল নিয়ে আসবে, সে তার দশগুণ প্রতিদান পাবে।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৬০)
৩. ১০০ গুনাহ মাফ করা হয়
মানুষ ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহর রহমত অসীম। এই জিকির গুনাহ মাফের অন্যতম সহজ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
‘যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তওবা করে, সে যেন গুনাহহীন ব্যক্তির মতো।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫০)
৪. শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা
শয়তান প্রতিনিয়ত মানুষকে গুনাহের দিকে আহ্বান করে। কিন্তু আল্লাহর জিকির মুমিনের জন্য এক শক্তিশালী ঢাল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নির্ধারণ করি, আর সে-ই হয় তার সঙ্গী।’ (সুরা আয-যুখরুফ: আয়াত ৩৬)
অতএব, জিকির মানুষকে শুধু সওয়াবই দেয় না; বরং আত্মাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকেও রক্ষা করে।
৫. শ্রেষ্ঠ আমলকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া
এই জিকির পাঠকারী ব্যক্তি এমন মর্যাদা লাভ করে যে, অন্য কেউ তার সমপরিমাণ বা বেশি জিকির না করলে তার চেয়ে উত্তম আমল নিয়ে আসতে পারবে না।
এটি বুঝিয়ে দেয়— আল্লাহর কাছে জিকিরের মর্যাদা কত মহান। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ؟ ذِكْرُ اللَّهِ
‘আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের রবের কাছে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে পবিত্র? তা হলো আল্লাহর জিকির।’ (তিরমিজি ৩৩৭৭)
কেন এই জিকির এত শক্তিশালী?
এই জিকিরের প্রতিটি বাক্য তাওহিদের ঘোষণা—
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ — আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ — তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই।
لَهُ الْمُلْكُ — সমগ্র রাজত্ব তাঁর।
وَلَهُ الْحَمْدُ — সমস্ত প্রশংসা তাঁরই।
وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ — তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
এই জিকির মানুষের অন্তরকে আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে এবং দুনিয়ার ভয়-চিন্তা কমিয়ে দেয়।
আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময় বড় বড় আমলের সুযোগ পাই না। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসীম দয়ায় এমন কিছু আমল দিয়েছেন, যা সহজ হলেও প্রতিদান অসীম। প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় বের করে যদি আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে ১০০ বার এই জিকির পাঠ করি, তবে আমাদের আমলনামা নেকিতে ভরে উঠবে, গুনাহ মাফ হবে এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা লাভ করব ইনশাআল্লাহ।
হয়তো এই ছোট্ট জিকিরই কেয়ামতের দিন আমাদের নাজাতের কারণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি জিকির করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের অন্তরকে তার স্মরণে জীবন্ত রাখুন। আমিন।