নীল আকাশের বুক চিরে যখন উড়োজাহাজ ভেসে চলে দূর দেশে— তখনও থেমে থাকে না একজন মুমিনের ইবাদত। সময় থামে না, দায়িত্ব থামে না, আর নামাজ— সেটি তো আল্লাহর সাথে বান্দার চিরন্তন সংযোগ। তাই সফর হোক কিংবা স্থিরতা— প্রতিটি ওয়াক্তই ডাকে এক অমলিন আহ্বানে— ‘এসো, তোমার রবের দিকে…’
আকাশপথে নামাজ আদায়ের বিধান
অন্যান্য সময়ের মতো আকাশপথে ভ্রমণের সময়ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় হলে নামাজ আদায় করা ফরজ। হজের উদ্দেশ্যে কিংবা অন্য কোনো ভ্রমণে আকাশপথে যারা সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যাবেন, নামাজের সময়সূচি দেখে উড়োজাহাজে ওঠার আগে বা উড়োজাহাজ অবতরণের পর ওয়াক্তের মধ্যে নামাজ আদায় করা সম্ভব হলে আগে বা পরে নামাজ আদায় করে নিন। কিন্তু যদি নামাজের ওয়াক্তের পুরোটাই বিমানে অতিবাহিত হয়, তাহলে উড়োজাহাজেই নামাজ আদায় করুন।
দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ থাকলে
উড়োজাহাজে যদি নামাজের জায়গা থাকে এবং কিবলামুখী হয়ে, দাঁড়িয়ে, রুকু ও সিজদা করে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়, তাহলে অন্য সময়ের মতই কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে, রুকু ও সিজদা করে নামাজ আদায় করতে হবে।
দাঁড়ানো সম্ভব না হলে
উড়োজাহাজে যদি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে বসে রুকু-সিজদাসহ নামাজ আদায় করবেন। বিমানে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে রুকু-সিজদাসহ নামাজ আদায় করলে পরবর্তী সময়ে তা পুনরায় পড়তে হবে না।
কিবলামুখী হওয়া বা সিজদা সম্ভব না হলে
বিমানে যদি কিবলামুখী হওয়া এবং রুকু ও সিজদা করাও সম্ভব না হয়, তাহলে যেভাবে সম্ভব বসে বা ইশারায় নামাজ আদায় করে নেবেন। এ ক্ষেত্রে বিমান থেকে অবতরণের পর সতর্কতামূলক ওই ফরজ নামাজ আবার পড়ে নেবেন।
কিবলার দিক নির্ণয়
বিমানে কিবলার দিক নির্ণয়ের জন্য বিমানের তথ্য পরিষেবা বা কম্পাস ব্যবহার করবেন। কাবার বরাবর ওপরের দিকে পুরো বায়ুমণ্ডলই কেবলা। তাই মাটিতে যেভাবে কাবার দিকে ফিরে কিবলামুখী হন, বিমানেও সেভাবেই কাবার দিকে ফিরে কিবলামুখী হবেন— আলাদা কোনো নিয়ম নেই।
সফরে কসর নামাজের বিধান
হজযাত্রীরাসহ যারা অন্য কোথাও বিমানে ভ্রমণ করেন তখন উড়োজাহাজে কসর নামাজ পড়বেন। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের জন্য বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের দূরত্ব যেহেতু ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটারের অনেক বেশি, তাই বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়ার পথে উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময় আপনি মুসাফির গণ্য হবেন।
তাই আপনাকে নামাজ কসর করতে হবে। অর্থাৎ— জোহর, আসর ও ইশা: ৪ রাকাতের বদলে ২ রাকাত পড়তে হবে। ফজর: ২ রাকাত (অপরিবর্তিত) থাকবে। মাগরিব: ৩ রাকাত (অপরিবর্তিত) থাকবে।
অনেকে মনে করেন কসর করা ঐচ্ছিক—এই ধারণা ঠিক নয়। সফর অবস্থায় ইচ্ছাকৃত কসর না করা গুনাহের কাজ। তাই ইচ্ছাকৃত কসর বাদ দিয়ে পূর্ণ নামাজ পড়া যাবে না।
হাদিসের দলিল
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: فَرَضَ اللَّهُ الصَّلَاةَ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ ﷺ فِي الْحَضَرِ أَرْبَعًا، وَفِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ (صحيح مسلم، ٦٨٧)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন— ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীর (সা.) জবানে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত এবং সফর অবস্থায় দুই রাকাত নামাজ ফরজ করেছেন।’ (মুসলিম ৬৮৭)
ভুলক্রমে পূর্ণ নামাজ পড়লে করণীয়
মুসাফির ব্যক্তি যদি ভুল করে চার রাকাত বিশিষ্ট কোনো ফরজ নামাজ কসর না করে চার রাকাতই পড়ে নেয়, তাহলে দেখতে হবে—
সে দুই রাকাতের পর বৈঠক করেছে কি না। যদি বৈঠক করে থাকে তবে তার নামাজ আদায় হয়ে যাবে। প্রথম দুই রাকাত ফরজ, শেষ দুই রাকাত নফল গণ্য হবে।
নামাজের ভেতরেই ভুল মনে পড়লে শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে।
হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন— ‘কোনো মুসাফির ভুলে জোহরের নামাজ চার রাকাত পড়ে ফেললে সাহু সিজদা করবে।’ (মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ২/৫৪১)
যদি নামাজের মধ্যে মনে না পড়ে এবং সাহু সিজদা না দেয়, তবুও নামাজ হয়ে যাবে, পুনরায় পড়তে হবে না।
বৈঠক না করলে
যদি চার রাকাত বিশিষ্ট কোনো ফরজ নামাজ চার রাকাত পড়ে এবং মাঝের বৈঠকও করতে ভুলে যায়, তাহলে তার ফরজ বাতিল হয়ে ওই নামাজ নফল হয়ে যাবে। তাকে পুনরায় ওই ফরজ নামাজ আদায় করতে হবে। (আদ-দুররুল মুখতার: ২/১২৮)
আকাশের উচ্চতায় পৌঁছালেও একজন মুমিনের হৃদয় থাকে সিজদার নিচেই। উড়োজাহাজ বদলায়, সময় বদলায়— কিন্তু নামাজের আহ্বান বদলায় না। তাই সফরের ক্লান্তি নয়, ইবাদতের সৌন্দর্যই হোক আমাদের সঙ্গী। যেখানে থাকি— মাটিতে বা আকাশে— আমাদের সিজদা যেন ঠিকই পৌঁছে যায় আরশের মালিকের দরবারে।