আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী বলেছেন, সর্বাত্মক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনের একমাত্র পথ হলো সামগ্রিক উন্নয়নের ধারায় ‘আরও শক্তিশালী ইরান’ গড়ার কৌশল অব্যাহত রাখা। একইসঙ্গে তিনি জনগণ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ইরানের জাতীয় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, ৪ নভেম্বর উপলক্ষে দেওয়া এই বার্তায় তিনি দিনটিকে ‘সত্যের পক্ষের শক্তির সঙ্গে অসত্যের পক্ষের শক্তির মুখোমুখি অবস্থানের প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। -- পার্সটুডে
বার্তায় মুজতাবা খামেনেয়ী বলেন, বিভিন্ন সময়ে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের প্রকাশ্য শত্রুতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের বিরোধের প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষায়, এখন শুধু ১৩ অবন নয়, বরং প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ঘণ্টাই ‘মহাশয়তান’-এর বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সময়ে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী নীতির প্রতিটি পর্যায়ে ইরানের জনগণের দৃঢ় সংকল্প ও বাস্তব পরিস্থিতির শক্ত দেয়ালের মুখে পড়তে হয়েছে শত্রুপক্ষকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অভিযোগ
বার্তায় ১৯৫৩ সালের ২৮ মোরদদ অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ইসলামি বিপ্লবের আগের ও পরের বিভিন্ন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি।
মুজতাবা খামেনেয়ী অভিযোগ করেন, ইরানের তেলসহ জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সভাক প্রতিষ্ঠা, স্বৈরশাসনকে সহযোগিতা এবং ইসলামি বিপ্লব ঠেকাতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে ওয়াশিংটন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, অভ্যুত্থানকারী ও মোনাফেকিনদের সমর্থন, ইরাকের বাথ সরকারকে সহযোগিতা, যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অস্থিরতা সৃষ্টিতে সহায়তা এবং জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
তাঁর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বহু বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে।
হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, যুক্তরাষ্ট্রের অপরাজেয় শক্তির ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। একইসঙ্গে প্রমাণ হয়েছে, নিজস্ব জনগণের পরিবর্তে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল সরকারগুলো কতোটা দুর্বল।
তিনি দাবি করেন, তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তাঁর মতে, নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তিনি ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনের ঐক্য ও কর্মকাণ্ডকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আশাব্যঞ্জক সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার আশা করা ভুল
মুজতাবা খামেনেয়ী বলেন, যারা এখনো মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে কিংবা দলীয় ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে দেশটির নীতি বদলাবে, অথবা আমেরিকাকে কিছু ছাড় দিয়ে ইরানের প্রতি শত্রুতা বন্ধ করা সম্ভব-তাঁরা ভুল করছেন।
তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের জনগণের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আদায় করা। শত্রুর কাছে সামান্যতম আত্মসমর্পণমূলক মনোভাবও শহীদদের রক্ত ও জনগণের আত্মত্যাগে অর্জিত বিশাল অর্জনকে ধ্বংস করতে পারে।
‘আরও শক্তিশালী ইরান’ গড়ার আহ্বান
তিনি বলেন, সর্বাত্মক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনের একমাত্র পথ হলো ‘আরও শক্তিশালী ইরান’ গড়ার কৌশল অব্যাহত রাখা। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সামাজিক সমন্বয়ই সাফল্যের প্রধান ভিত্তি।
তিনি জনগণের প্রতি সরকারের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, বস্তুগত ও নৈতিক অগ্রগতি এবং দেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের আরও আন্তরিক ও নিবেদিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তরুণ প্রজন্মকে বিশেষ আহ্বান
ইরানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর মতে, হতাশা ও অসম্ভবের ধারণাকে পরাজিত করে ‘আশা ও আমরা পারব’-এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য জ্ঞান, তাকওয়া, দক্ষতা, নৈতিকতা, দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি।
পরিশেষে মুজতাবা খামেনেয়ী আশা প্রকাশ করেন, মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ইরানের জনগণ দ্রুতই বিজয়, সমৃদ্ধি ও সর্বাত্মক উন্নয়ন অর্জন করবে এবং ‘মহাশয়তান’-এর আধিপত্যের পতন ত্বরান্বিত হবে।