ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হতে যাওয়া ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে আগ্রহ ও কূটনৈতিক তৎপরতা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১১টি দেশের শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এজেন্ডায় না থাকলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রভাব এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে তার সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানের কারণে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনই দিল্লিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করে কোনো জোরালো যৌথ বিবৃতি দেওয়া ব্রিকসের পক্ষে কঠিন হবে, কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে জোটের অভ্যন্তরীণ সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও ব্রিকসের চ্যালেঞ্জ
বাণিজ্য ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ওপর বিশ্ববাজারের নির্ভরতা কমানো বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ নিয়ে ব্রিকসের পদক্ষেপে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, মার্কিন ডলারকে প্রতিস্থাপন করার মতো নতুন কোনো বিকল্প মুদ্রা আনার চেষ্টা করা হলে ব্রিকস দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ব্রিকস বিস্তৃত হলেও জোটটির অভ্যন্তরে ঐক্যমত গড়ে তোলা এখন তুলনামূলক কঠিন। বিশেষ করে আয়োজক দেশ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির দ্বারপ্রান্তে থাকায় এমন কোনো যৌথ বিবৃতিতে সই করবে না যা ওয়াশিংটনকে সরাসরি অসন্তুষ্ট করে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোও ইরান কেন্দ্রিক কোনো কঠোর অবস্থান সমর্থন করা থেকে বিরত থাকতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক শক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির বিপরীতে ব্রিকস নিজেদের বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
জনসংখ্যা: বিশ্ব মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এই জোটভুক্ত দেশগুলোতে।
জিডিপি: বৈশ্বিক মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে ব্রিকস।
বাণিজ্য: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে।
সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রার মাধ্যমে পারস্পরিক বাণিজ্য পরিচালনা সহজ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে, যা বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়া ও ইরানের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। পাশাপাশি, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর তহবিল বিস্তার এবং গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার জোরদার করাই এই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।
দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি ও ভারতের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি এই সম্মেলন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা দুই দেশের সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মোদীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার চলমান ভূরাজনীতিতে নিজের বৈশ্বিক অবস্থান ও নেতৃত্বকে নতুন করে জানান দেওয়ার জন্য স্বাগতিক দেশ ভারতের কাছে এই সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ইনকিলাব